ইন দা আরলি আওয়ার্সঃ রিফ্লেকশন অন স্পিরিচুয়াল এন্ড সেলফ ডেভেলপমেন্ট//১

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

অনুবাদ: ফয়সাল তারিক

মূল: খুররম মুরাদ

অনুবাদকের কথা

গত কয়েক বছরের মধ্যে পড়া বইগুলোর মধ্যে দু’টো বই পড়ে আফসোস করেছি এজন্য যে, কেন আরো আগে বই দু’টো পড়ার সুযোগ পাইনি। তার মধ্যে একটা হলো শায়খ আল কারদাওয়ি’র লেখা ‘প্রায়োরিটিজ অফ ইসলামিক মুভমেন্ট ইন দা কামিং ফেইজ’ আর আরেকটা হলো উস্তাদ খুররম মুরাদের ‘ইন দা আরলি আওয়ার্সঃ রিফ্লেকশন অন স্পিরিচুয়াল এন্ড সেলফ ডেভেলপমেন্ট’।

আল কারাদাওয়ি’র বইটি বিআইআইটি বাংলায় অনুবাদ করেছে। উস্তাদ খুররম মুরাদের বইটি আমার চোখে কোথাও পড়েনি।

অনেকটা শখের বশবর্তী হয়েই অনুবাদ শুরু করেছিলাম এবং যথারীতি অসমাপ্ত প্রজেক্টের লিস্টে আরেকটি এন্ট্রি বেড়েছে। আমার ভাষা জ্ঞান খুবই দুর্বল, তারপরও প্রথম অধ্যায় অনুবাদের চেষ্টা করেছি। মূল বই পড়ে যে মজা পেয়েছি, অনুবাদ তার ধারে কাছেও যায়নি, যাওয়ার কথাও না অবশ্য। অনুবাদ কর্মটি যদি পাঠকের জীবনের পবিত্র পরিবর্তনে এতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে, তবেই স্বার্থক হব। আপনাদের উত্তম দো’আসমূহে ভুলবেন না আমাদের।

………………………………………

প্রথম অধ্যায়ঃ আত্মগঠন প্রক্রিয়া

স্রষ্টার পথ তখনই মানুষের সামনে উদ্ভাসিত হয় যখন মানুষ তার জীবনে স্রষ্টাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে অনুভব করে এবং সে অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করতে চেষ্টা করে। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘কেউ যদি জানতে চায় আল্লাহর কাছে তার অবস্থান কি, তাহলে সে যেন চিন্তা করে তার জীবনে আল্লাহর অবস্থান কোথায়।’ (হাকীম)। আত্মগঠন এর কাছাকাছি কোরআনিক পরিভাষা হচ্ছে ‘তাজকিয়া’। এর অর্থ ‘পরিশুদ্ধি’। অর্থাৎ সব ধরনের সামঞ্জস্যহীন, অনাকাঙ্খিত বিষয়গুলো পরিহার করে চলা। এর মানে এটাও হতে পারে যে, সেসব গুণাবলী অর্জন ও পরিচর্যা করা, যা ব্যক্তি জীবনকে উন্নত ও সুষমামণ্ডিত করে।

জীবনের লক্ষ্যঃ

পার্থিব ও পরকালীন জীবনের সুখ ও সাফল্য নির্ভর করে ‘তাজকিয়া’ তথা ব্যক্তিত্বের পরিশুদ্ধি ও যথাযথ পরিচর্যার উপর। কুরআন অনুযায়ী প্রকৃত সাফল্য শুধু তাদের জন্য যারা নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করে।

قَدۡ أَفۡلَحَ مَن زَكَّٮٰهَا

‘নিঃসন্দেহে সফল হয়ে গেছে সেই ব্যক্তি যে নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে ।’ (৯১:৯)

রক্ত-মাংসের শরীর টুকুই মানুষের সব নয়। বরং এর সাথে হৃদয়-মন, অনুভুতি-চেতনা, চরিত্র-ব্যবহার ইত্যাদির সমন্বয়েই ব্যক্তি মানুষ গঠিত। ব্যক্তিত্বের এই উপাদানগুলোর যথাযথ পরিচর্যা ও গঠনের মাধ্যমেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। যখন লক্ষ্য আকাংক্ষিত হয় তখন তা অর্জনের প্রক্রিয়া এবং সে জন্য যাবতীয় কাজ করাটাও আকাংখায় পরিণত হয়। এটা মানব প্রকৃতির অংশ। সুতরাং জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্যের প্রকৃত রূপ ভালভাবে অনুভব ও উপলব্ধি করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বাসীদের জীবনের পরম লক্ষ্য হচ্ছে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন ও জান্নাত লাভ করা। আমাদের মহান সৃষ্টিকর্তাই আমাদের জন্য এ লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

فَإِنَّ ٱلۡجَنَّةَ هِىَ ٱلۡمَأۡوَىٰ

‘তার ঠিকানা হবে জান্নাত।’ (৭৯:৪১)

وَإِنَّ ٱلدَّارَ ٱلۡأَخِرَةَ لَهِىَ ٱلۡحَيَوَانُ

‘আর আসল জীবনের গৃহ তো হচ্ছে পরকালীন গৃহ ৷'(২৯:৬৪)

أَصۡحَـٰبُ ٱلۡجَنَّةِ هُمُ ٱلۡفَآٮِٕزُونَ

‘সফলকাম তারাই যারা জান্নাতে যাবে ৷’ (৫৯:২০)

যদিও একটা আরেকটার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত তারপরেও স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের প্রচেষ্টা জান্নাত পাওয়ার চেষ্টার থেকে অগ্রগন্য। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টার মাধ্যমেই জান্নাত পাওয়া সম্ভব। আর যখন আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারব, তখন আমাদেরকে জান্নাত উপহার দেয়া হবে। কোরআনে বলা হয়েছেঃ

وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَشۡرِى نَفۡسَهُ ٱبۡتِغَآءَ مَرۡضَاتِ ٱللَّهِ‌ۗ وَٱللَّهُ رَءُوفُۢ بِٱلۡعِبَادِ

অন্যদিকে মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অভিযানে যে নিজের প্রাণ সমর্পণ করে ৷ এই ধরনের বান্দার ওপর আল্লাহ অত্যন্ত স্নেহশীল ও মেহেরবান ৷ (২:২০৭)

إِنَّ ٱللَّهَ ٱشۡتَرَىٰ مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَنفُسَهُمۡ وَأَمۡوَٲلَهُم بِأَنَّ لَهُمُ ٱلۡجَنَّةَ‌

প্রকৃত ব্যপার এই যে, আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন৷ (৯:১১১)

পরকালে জান্নাতের বিকল্প হচ্ছে জাহান্নাম বা প্রজ্জলিত আগুনের শাস্তি পাওয়া। কোরআনে বলা হয়েছেঃ

وَفِى ٱلۡأَخِرَةِ عَذَابٌ۬ شَدِيدٌ۬ وَمَغۡفِرَةٌ۬ مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٲنٌ۬

‘আখেরাত এমন স্থান যেখানে রয়েছে কঠিন আযাব, আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি৷’ (৫৭:২০)

সুতরাং জাহান্নাম তাদের জন্য যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও জান্নাত পাওয়ার থেকে পার্থিব জীবনের সাচ্ছন্দ্য অর্জন এবং তা উপভোগ করাকেই জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারন করে নিয়েছে। কি সেই বস্তু যা মানুষকে এইরকম ভয়াবহ দুর্ভোগের মধ্যে নিক্ষেপ করে? একই আয়াতের পরবর্তী অংশেই এর উত্তর দেয়া হয়েছেঃ

وَمَا ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَآ إِلَّا مَتَـٰعُ ٱلۡغُرُورِ

‘পার্থিব জীবন প্রতারণার উপকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (৫৭:২০)

পার্থিব সম্পদের মোহ আসলে একটা মরিচিকা। আপনার মৃত্যুর সময় এগুলি কোনই কাজে আসবেনা। এই বিশ্বের সবকিছুই নশ্বর। শুধুমাত্র মহান আল্লাহ এবং তার গুনাবলী চিরন্তন। এজন্যি কোরআনে উপদেশ দেয়া হয়েছেঃ

سَابِقُوٓاْ إِلَىٰ مَغۡفِرَةٍ۬ مِّن رَّبِّكُمۡ وَجَنَّةٍ عَرۡضُہَا كَعَرۡضِ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أُعِدَّتۡ لِلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ‌ۚ ذَٲلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُ‌ۚ وَٱللَّهُ ذُو ٱلۡفَضۡلِ ٱلۡعَظِيمِ

‘দৌড়াও এবং একে অপরের চেয়ে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা করো – তোমার রবের মাগফিরাতের দিকে এবং সে জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের মত৷তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে সে লোকদের জন্য যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের প্রতি ঈমান এনেছে৷ এটা আল্লাহর অনুগ্রহ৷ যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন৷ আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল।’ (৫৭:২১)

পার্থিব জীবনের সকল প্রচেষ্টা একমাত্র জান্নাত অর্জনের জন্যই হওয়া উচিৎ। সর্ব শক্তিমান আল্লাহ কোরআনে প্রতিজ্ঞা করেছেনঃ

كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوۡنَ أُجُورَڪُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ‌ۖ فَمَن زُحۡزِحَ عَنِ ٱلنَّارِ وَأُدۡخِلَ ٱلۡجَنَّةَ فَقَدۡ فَازَ‌ۗ وَمَا ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَآ إِلَّا مَتَـٰعُ ٱلۡغُرُورِ

‘অবশেষে প্রত্যেক ব্যক্তিকে মরতে হবে এবং তোমরা সবাই কিয়ামতের দিন নিজেদের পূর্ণ প্রতিদান লাভ করবে৷ একমাত্র সেই ব্যক্তিই সফলকাম হবে, যে সেখানে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাবে এবং যাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে ৷ আর এ দুনিয়াটা তো নিছক একটা বাহ্যিক প্রতারণার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়৷’ (৩:১৮৫)

জান্নাতের লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ।

আত্মগঠনের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে জান্নাত অর্জনের জন্য একাগ্রচিত্তে মনোনিবেশ করা। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি জীবনের গন্ত্যবের ব্যাপারে অনিশ্চিৎ, পার্থিব জীবন না পরকালীন জীবন-এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দোদুল্যমান, তার অবস্থা দুই নৌকায় পা দেওয়া ব্যক্তির মত যে অচিরেই ভারসাম্যহীন অবস্থায় পতিত হবে। আমরা বাস্তবে যে সব জটিলতার মুখোমুখি হই তার অনেকগুলোরই মুল কারন হচ্ছে আমাদের লক্ষ্যের প্রতি দায়বদ্ধতার ঘাটতি এবং জীবনের চুড়ান্ত ও প্রকৃত লক্ষ্যের দিকে একাগ্রচিত্ত না থাকার ব্যর্থতা। যদি আপনি জান্নাত অর্জনকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসাবে গ্রহন করেন তাহলে বাকী আর সবকিছুই করা আপনার পক্ষে সম্ভব।

জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্য হিসাবে জান্নাতকে অত্যন্ত সচেতনতার সাথে নির্ধারন করা উচিৎ কেননা এজন্য অতীতের সাথে সব সম্পর্ক সম্পুর্ণরুপে ছিন্ন করতে হতে পারে। এই নতুন লক্ষ্যকে জীবনের চুড়ান্ত লক্ষ্য হিসাবে গ্রহন করা মানে একটি পরিপূর্ণ নতুন জীবন পদ্ধতি গ্রহন করা। একটি সম্পূর্ণ নতুন ভ্রমন শুরু করা।

এই নতুন যাত্রার শপথের শুরুতেই অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে স্মরন করুন জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তিসমুহের কথা যা আপনি যেকোন মুল্যে এড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্মরন করুন, জান্নাতের অসংখ্য নিআমতের কথা যার জন্য আপনি প্রানান্তকর চেষ্টা করার শপথ নিয়েছেন। নিজেকে আরও স্মরন করিয়ে দিন সূদীর্ঘ যাত্রাপথের উল্লেখযোগ্য বিরতিস্থান ও মাইলফলকগুলোর কথা। কল্পনা করুন মৃত্যু খুব কাছেই। কল্পনা করুন মৃত্যুদুত ঘোষনা করছেন ‘পৃথিবীতে তোমার সময় শেষ। এখন তোমাকে অবশ্যই আমাকে অনুসরন করতে হবে অন্তহীন গন্তব্যের পথে।’ কল্পনা করুন সেই মূহুর্ত, যখন আপনি বিচারদিনে আপনার স্রষ্টার সামনে চুড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় দন্ডয়মান। সেই সাথে অনুভব করার চেষ্টা করুন বিচারের রায়ের পরিনতিসমুহের কথা। যখন দুই রাকাত নামাজ পড়া শেষ হবে তখন আরেকবার মনে মনে উচ্চারন করে নিন যে এখন থেকে আপনার সকল প্রচেষ্টা হবে একমাত্র জান্নাত লাভের উদ্দেশ্যে। দয়াময় আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে সাহায্য প্রার্থনা করে বলুনঃ

‘হে আল্লাহ আমি তোমার দয়া প্রার্থী। আর প্রার্থী সেই সব কথা ও কাজের যা তোমার দয়ার নিকটবর্তী করে। হে আল্লাহ আমি এমন বিশ্বাস চাই যা কখনো নিঃশেষ হবে না, এমন করুনা চাই যা কখনো ফুরিয়ে যাবে না। এমন সন্তোষ চাই যা কমে যাবে না। আর চাই জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান যা তোমার নবী মুহাম্মাদের (সাঃ) সাহচার্য দ্বারা সম্মানিত।’

অভ্যাস ও তৎপরতার উন্নতি একটি জীবন-বিস্তৃত প্রক্রিয়া হলেও তা অর্জনের আকাংখায় উজ্জীবিত হওয়া এক মুহুর্তেই সম্ভব। এই তীব্র আকাংখাই আপনার জীবনের লক্ষ্য তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জনকে ত্বরান্বিত করবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s