সূরা আলে ইমরান: ১৪ থেকে ১৭ নং আয়াত

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

اَعُوْذُ بِاللهِ مِن الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ

১। আয়াত:

(14) زُيٍِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِيْنَ وَالْقَنَاطِيْرِ الْمُقَنَطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ط ذلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ج وَاللهُ عِنْدَه حُسْنُ الْمَآبِ০

(15) قُلْ أَؤُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرٍ مِّنْ ذلِكُمْ ط لِلَّذِيْنَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِى مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا وَأَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ وَّرِضْوَانٌ مِّنَ اللهِ ط وَاللهُ بَصِيْرٌ بِالْعِبَادِ০

(16) الَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ০

(17) الصَّابِرِيْنَ وَالصَّادِقِيْنَ وَالْقَانِتِيْنَ وَالْمُنْفِقِيْنَ وَالْمُسْتَغْفِرِيْنَ بِالأَسْحَارِ০

২। ভাবানুবাদ:

১৪. মানুষের জন্য আকর্ষণীয় জিনিস, যেমন, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, সোনা-রূপার স্তূপ, চিহ্নিত ঘোড়া (অর্থাৎ সেরা ঘোড়া), গৃহ পালিত পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি ভালোবাসাকে সুশোভিত করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো দুনিয়ার জীবনের সামগ্রী মাত্র। আর আল্লাহর নিকটই রয়েছে উত্তম আবাস।

১৫. বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবো এগুলোর চেয়েও উত্তম জিনিসের কথা? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট জান্নাত, যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমান, যেখানে তারা থাকবে চিরদিন, পাবে পবিত্রা স্ত্রী, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সব কিছু দেখে থাকেন।’

১৬. যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, অবশ্যই আমরা ঈমান এনেছি, আপনি আমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচান।’

১৭. আর এরা ছবর অবলম্বনকারী, সত্যনিষ্ঠ, আনুগত্যপরায়ণ, ইনফাককারী এবং রাতের শেষ ভাগে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।’

৩। পরিপ্রেক্ষিত:

হিজরী দ্বিতীয় সনে বদর প্রান্তরে ঈমানের বলে বলীয়ান তিন শত তেরো জন মুসলিমের এক হাজার মুশরিক যোদ্ধার ওপর বিজয় লাভ গোটা আরব উপদ্বীপে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। সকলে অনুভব করে, আলমাদীনা আলমুনাওয়ারা-তে এক ব্যতিক্রমধর্মী শক্তি সুসংহত হয়েছে। এই শক্তির উত্থানের মাঝে তারা নিজেদের পতনের আলামত দেখতে পায়।

মাক্কা থেকে হিজরাত করে এসে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করা কালে অন্যদের মত আলমাদীনার উপকণ্ঠে বসবাসরত ইয়াহুদী গোত্রগুলোর সাথেও চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্তানুযায়ী বহিরাক্রমণ কালে আলমাদীনার নিরাপত্তার জন্য তাদেরও ভূমিকা পালন করার কথা। কিন্তু বদর যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় লাভের পর ইয়াহুদীরা গোপনে মাক্কা ও অন্যান্য অঞ্চলের মুশরিক শক্তির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে আলমাদীনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে। অথচ এরা দাবি করতো, এরা আত্-তাওরাতের অনুসারী এবং একত্ববাদী। একত্ববাদী হয়ে মুশরিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার তো কোন সুযোগ ছিলো না।

ইয়াহুদী গোত্রগুলোর অন্যতম ছিলো বানু কাইনুকা। এই গোত্রটি ইসলাম ও মুসলিমদের দুশমনিতে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলো। সেই জন্যই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই গোত্রটির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে তাদেরকে আলমাদীনা থেকে বের করে দেন। এতে অন্য ইয়াহুদী গোত্রগুলো আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

বদর প্রান্তরে পরাজিত হয়ে মাক্কার মুশরিকরা প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছিলো। ইয়াহুদী গোত্রগুলো এতে পেট্রোল ঢেলে দেয়। ফলে হিজরী তৃতীয় সনে তিন হাজার মুশরিক যোদ্ধা আলমাদীনা আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসে।

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক হাজার যোদ্ধা নিয়ে উহুদের দিকে অগ্রসর হন। পথিমধ্য থেকে মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনু উবাই তিন শত সংগী নিয়ে পেছনে ফিরে যায়।

উহুদ প্রান্তরে তিন হাজার মুশরিক যোদ্ধার মুখোমুখি হন সাত শত জন মুসলিম। আল্লাহর মেহেরবানীতে এবারও মুসলিমরাই বিজয়ী হন। কিন্তু একটি কৌশলগত পাহাড়ী পথ পাহারায় নিয়োজিত বেশির ভাগ তীরন্দাজ তাঁদের অবস্থান স্থল ত্যাগ করায় যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভীষণভাবে আহত হন। বহু মুজাহিদ আহত হন। শহীদ হন সত্তর জন।

এই বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে নাযিল হয় তিনটি ভাষণ। হিজরী নবম সনে নাযিলকৃত একটি ভাষণকেও প্রাসংগিকতার কারণে এই ভাষণগুলোর সাথে জুড়ে দেওয়া হয়।

এই চারটি ভাষণের সমষ্টির নাম সূরা আলে ইমরান।

প্রথম ভাষণটি এই সূরার প্রথম আয়াত থেকে বত্রিশ নম্বর আয়াত পর্যন্ত বিস্তৃত। বদর যুদ্ধের অব্যবহিত পরে এই ভাষণটি নাযিল হয়েছে বলে প্রখ্যাত তাফসীরকারদের মত।

দ্বিতীয় ভাষণটি তেত্রিশ নম্বর আয়াত থেকে একাত্তর নম্বর আয়াত পর্যন্ত বিস্তৃত। হিজরী নবম সনে দক্ষিণ আরবের নাজরান অঞ্চল থেকে একটি খৃস্টান প্রতিনিধি দলের আগমন উপলক্ষে এই ভাষণটি নাযিল হয়।

তৃতীয় ভাষণটি বাহাত্তর নম্বর আয়াত থেকে একশত বিশ নম্বর আয়াত পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি বদর ও উহুদ যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে নাযিল হয়।

চতুর্থ ভাষণটি একশত একুশ নম্বর আয়াত থেকে দুই শত নম্বর আয়াত (অর্থাৎ শেষ আয়াত) পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ভাষণটি উহুদ যুদ্ধের পর নাযিল হয়।

এই সূরায় মূলতঃ দু’টি দলকে সম্বোধন করা হয়েছে। একটি দলে রয়েছে ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ।

অপর দলটিতে রয়েছেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতি ঈমান আনয়নকারী মুসলিমগণ।

প্রথম দলটিকে বলা হয়েছে, অতীতে নবীগণ যে দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই দ্বীনেরই ধারক-বাহক। অতএব তাদের কর্তব্য হচ্ছে বাঁকাপথে না চলে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কর্তৃক উপস্থাপিত সত্য-সঠিক পথের অনুসারী হওয়া।

দ্বিতীয় দলটিকে অর্থাৎ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুসারীদেরকে বলা হয়েছে যে তাঁদেরকে পৃথিবীর সর্বোত্তম জাতির মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে এবং গোটা পৃথিবীর সমাজ ও সভ্যতার ইছলাহ সাধনের দায়িত্ব তাঁদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। আর যেসব নৈতিক চারিত্রিক দুর্বলতার কারণে অতীতে বহু জাতি অধপতনের শিকার হয়েছে, তাঁদেরকে সেসব দুর্বলতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।

আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে- সূরা আলে ইমরানের ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭ নাম্বার আয়াত। এ আয়াতগুলো এ সূরার প্রথম ভাষণটির অংশবিশেষ।

৪। ব্যাখ্যা:

১৪ নাম্বার আয়াত

زُيٍِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِيْنَ وَالْقَنَاطِيْرِ الْمُقَنَطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ط ذلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ج وَاللهُ عِنْدَه حُسْنُ الْمَآبِ০  ‘মানুষের জন্য আকর্ষণীয় জিনিস, যেমন, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, সোনা-রূপার স্তূপ, চিহ্নিত ঘোড়া (অর্থাৎ সেরা ঘোড়া), গৃহ পালিত পশু এবং ক্ষেত-খামারের প্রতি ভালোবাসাকে সুশোভিত করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এগুলো দুনিয়ার জীবনের সামগ্রী মাত্র। আর আল্লাহর নিকটই রয়েছে উত্তম আবাস।

এ আয়াতের প্রথমাংশে যেসব জিনিস মানুষকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে সেগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর আয়াতের শেষাংশে ০ذلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ج وَاللهُ عِنْدَه حُسْنُ الْمَآبِ (এগুলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামগ্রী মাত্র। আর আল্লাহর নিকটই রয়েছে উত্তম আবাস।) বলে মানুষকে দুনিয়ার ওপর আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেবার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে।

সূরা আল ‘আনকাবূতের ৬৪ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

وَمَا هذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا اِلاَّ لَهْوٌ وَلَعِبٌ ج وَاِنَّ الدَّارَ الاخِرَةَ لَهِىَ الْحَيَوَانُ ج

‘আর দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। আসল জীবনের ঘর তো হলো আখিরাতের ঘর।’

সূরা আলে ইমরানের ১৮৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا اِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُوْرِ০

‘আর দুনিয়ার জীবন তো ছলনার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।’

সূরা আল মুনাফিকুনের ৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

يآ اَيُّهَا الَّذِيْنَ امنُوْآ لاَتُلْهِكُمْ اَمْوَالَكُمْ وَلاَ اَوْلاَدَكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللهِ ج وَمَنْ يَّفْعَلْ ذلِكَ فَأُولِئِكَ هُمُ الْخَاسِرُوْنَ০

‘ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, তোমাদের অর্থ-সম্পদ এবং তোমাদের সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে না রাখে। যারা এমনটি করবে তারা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’

সূরা আত্-তাওবাহর ২৪ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

قُلْ اِنْ كَانَ اَبَاؤُكُمْ وَاَبْنَاؤُكُمْ وَاِخْوَانُكُمْ وَاَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيْرَتُكُمْ وَاَمَوْالُ نِ اقْتَرَفْتُمُوْهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا اَحَبَّ اِلَيْكُمْ مِنَ اللهِ وَرَسُوْلِه وَجِهَادٍ فِىْ سَبِيْلِه فَتَرَبَّصُوْا حَتّى يَأْتِىَ اللهُ بِاَمْرِه ط وَاللهُ لاَ يَهْدِى الْقَوْمَ الْفَاسِقِيْنَ০

‘তাদেরকে বল, তোমাদের আব্বা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের উপার্জিত অর্থ-সম্পদ, তোমাদের ঐ ব্যবসা যার মন্দার আশংকা তোমরা কর, তোমাদের পছন্দের ঘর-বাড়ি যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফায়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। আর আল্লাহ ফাসিকদেরকে সঠিক পথের দিশা দেন না।’

সূরা সাবা’র ৩৭ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

وَ مَا اَمْوَالُكُمْ وَلاَ اَوْلاَدُكُمْ بَالَّتِىْ تُقَرِّبُكُمْ عِنْدَنَا زُلْفى اِلاَّ مَنْ امَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولئِكَ لَهُمْ جَزَاءُ الضِّعْفِ بِمَا عَمِلُوْا وَهُمْ فِى الْغُرُفَاتِ امِنُوْنَ০

‘তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন নয় যে, এগুলো তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে, তবে যারা ঈমান আনে এবং আমালুছ ছালিহ করে তারা এমন লোক

যাদের জন্য রয়েছে তাদের কর্মের দ্বিগুণ প্রতিদান এবং তারা সুউচ্চ প্রাসাদে নিরাপদে

অবস্থান করবে।’

সূরা আলআ’লা-র ১৬ ও ১৭ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا০ وَالاخِرَةُ خَيْرٌ وَابْقى০

‘বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছো। অথচ উত্তম ও স্থায়ী হচ্ছে আখিরাত।’

স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং আত্মীয়-স্বজনের প্রতি মানুষের অন্তরে থাকে গভীর অনুরাগ। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য সম্পদের প্রতি মানুষ দারুণ আকর্ষণ অনুভব করে থাকে। একটি সীমা পর্যন্ত এই অনুরাগ ও আকর্ষণ আপত্তিকর নয়। কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে গেলেই ঘটে বিপত্তি। তখন মানুষ দুনিয়া-প্রীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আর দুনিয়া-প্রীতি মানুষকে আখিরাতমুখী হতে দেয় না। সেই জন্যই আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন মানুষকে দুনিয়ার জীবনের প্রকৃত অবস্থা বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যাতে মানুষ দুনিয়ার জীবনের গোলক ধাঁধাঁয় পড়ে প্রতারণার শিকারে পরিণত না হয়।

১৫ নাম্বার আয়াত

قُلْ أَؤُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرٍ مِّنْ ذلِكُمْ ط لِلَّذِيْنَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِى مِنْ تَحْتِهَا الأَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا وَأَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ وَّرِضْوَانٌ مِّنَ اللهِ ط وَاللهُ بَصِيْرٌ بِالْعِبَادِ০

‘বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে জানিয়ে দেবো এগুলোর চেয়ে উত্তম জিনিসের কথা? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমান, যেখানে তারা থাকবে চিরদিন, পাবে পবিত্রা স্ত্রী, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সব কিছু দেখে থাকেন।’

এই আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে, দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ ও সামগ্রীর চেয়ে অনেক বেশি উত্তম সম্পদ রয়েছে আখিরাতে। আর আয়াতের দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে যে, সেই উত্তম সম্পদ হচ্ছে জান্নাত, যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবহমান এবং যা তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

যাঁরা জান্নাতে প্রেরিত হবেন তাঁরা অনন্ত কালের জন্য সেখানে স্থায়িত্ব লাভ করবেন।

সেখানে তাঁরা পবিত্রা স্ত্রী পাবেন। সর্বোপরি তাঁরা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের সন্তোষ লাভ করে ধন্য হবেন।

এই আয়াতের শেষাংশে                                                     وَاللهُ بَصِيْرٌ بِالْعِبَادِ

(আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে দেখে থাকেন) কথাটি যুক্ত করে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন যেন এই ইংগিত দিলেন যে, তিনি অপাত্রে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ দান করেন না। তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি প্রখর দৃষ্টি রাখেন। তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাঁরা তাঁকে ভয় করে তাঁদের চিন্তা-চেতনা, ইচ্ছা-সংকল্প ও কর্মকাণ্ডকে পরিশীলিত করে নেন এবং তিনি তাঁদেরকেই পুরস্কৃত করে থাকেন।

১৬ নাম্বার আয়াত

الَّذِيْنَ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ০

‘যারা বলে, হে আমাদের রব, অবশ্যই আমরা ঈমান এনেছি, আপনি আমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচান।’

এই আয়াতে যাঁরা আল্লাহকে ভয় করে চলে তাঁদের একটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই লোকগুলো আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে গুনাহ মাফের জন্য এবং তাঁদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাবার জন্য বিনীতভাবে দু’আ করতে থাকেন।

১৭ নাম্বার আয়াত

الصَّابِرِيْنَ وَالصَّادِقِيْنَ وَالْقَانِتِيْنَ وَالْمُنْفِقِيْنَ وَالْمُسْتَغْفِرِيْنَ بِالأَسْحَارِ০

‘এরা ছবর অবলম্বনকারী, সত্যনিষ্ঠ, আনুগত্যপরায়ণ, ইনফাককারী এবং রাতের শেষ ভাগে ক্ষমা প্রার্থনাকারী।’

এই আয়াতে তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তিদের আরো পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

• তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তিগণ ছবর অবলম্বনকারী হয়ে থাকেন।

ছবর অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন আলকুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এই গুণে গুণান্বিত হওয়ার জন্য মুমিনদেরকে তাকিদ করেছেন।

সূরা আলবাকারা-র ১৫৩ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

يآَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوا اسْتَعِيْنُوْا بِالصَِّبْرِ وَالصَّلوةِ ط اِنَّ اللهَ مَعَ الصَّابِرِيْنَ০

‘ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, ছবর ও ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ছবর অবলম্বনকারীদের সংগে আছেন।’

সূরা আলবাকারা-র ১৫৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيٍٍْئٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصِ مِّنَ الاَمْوَالِ وَالاَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ط

وَبَشِّرِ الصَّابِرِيْنَ০

‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি ও ক্ষুধা-অনাহার দ্বারা এবং তোমাদের মাল, জান ও আয়-রোজগারের লোকসান ঘটিয়ে। এমতাবস্থায় যারা ছবর অবলম্বন করবে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও।’

সূরা আয্-যুমার-এর ১০ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

اِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرِيْنَ اَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍِ ০

‘ছবর অবলম্বনকারীদেরকে পূর্ণভাবে অগণিত পুরস্কার দেওয়া হবে।’

সূরা আলবাকারা-র ১৭৭ নাম্বার আয়াতের অংশবিশেষে মুত্তাকী ব্যক্তিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

وَالصَّابِرِيْنَ فِى الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِيْنَ الْبَاْسَ ط

‘আর এরা অভাব-অনটন, বিপদ-মুসীবত এবং হক ও বাতিলের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ছবর অবলম্বনকারী।’

• তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তিগণ সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকেন।

সত্যনিষ্ঠার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

اَلصِّدْقُ طُمَانِيَةٌ وَالْكَذِبَ رِيْبَةٌ০

‘সত্যনিষ্ঠা অবশ্যই প্রশান্তি-নিশ্চিন্ততা সৃষ্টি করে। আর মিথ্যা সন্দেহ-সংশয়-অনিশ্চয়তা

সৃষ্টি করে।’

[আবু মুহাম্মাদ হাসান ইবনু আলী (রা), জামে আত-তিরমিযী]

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

اِنَّ الصَّدْقَ يَهْدِىْ اِلَى الْبِرِّ وَاِنَّ الْبِرَّ يَهْدِىْ اِلَى الْجَنَّةِ০

‘নিশ্চয়ই সত্য পুণ্যের পথ দেখায়। আর পুণ্য জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।’

[আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রা), ছাহীহ মুসলিম, ছাহীহ আলবুখারী]

সূরা আত্ তাওবাহ-র ১১৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন মুমিনদেরকে সত্যনিষ্ঠা অবলম্বনের তাকিদ দিয়ে বলেন,

ياَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا التَّقُوا اللهَ وَكُوْنُوْا مَعَ الصَّادِقِيْنَ০

‘ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আল্লাহকে ভয় করে চল এবং সত্যনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত

হয়ে যাও।’

সূরা আলহাজের ৩০ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

وَاجْتَنِبُوْا قَوْلَ الزُّوْرِ০

‘তোমরা মিথ্যা কথা পরিহার কর।’

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কবীরা গুনাহগুলোর মধ্য থেকে মারাত্মক কবীরা গুনাহগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেছেন,

اَلاَ اُنَبِّئُِكُمْ بِاَِكْبَرِ الْكَبَائِرَ قُلْنَا بَلى يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ اَلاِشْرَاكُ بِاللهِ وَعُقُوْقُ الْوَالِدَيْنِ وَكَانَ مُتَّكِِِئًا فَجَلَسَ فَقَالَ اَلاَ وَقَوْلُ الزُّوْرِ০

‘সাবধান, আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গুনাহগুলোর মধ্য থেকে মারাত্মক কবীরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করবো?’ আমরা বললাম, ‘হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সাথে শিরককরণ, আব্বা-আম্মার অবাধ্যতা” (অতপর হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসে) তিনি বলতে থাকলেন, ‘সাবধান, এবং মিথ্যা কথন।’

[আবু বাকরা (রা), ছাহীহ মুসলিম, ছাহীহ আলবুখারী]

সূরা আলফুরকানের ৭২ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন তাঁর বিশিষ্ট বান্দাদের যেসব বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন তার একটি হচ্ছে-

وَالَّذِيْنَ لاَ يَشْهَدُوْنَ الزُّوْرَ০

‘এরা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না।’

সূরা আলআহযাবের ৩৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন যাঁরা তাঁর ক্ষমা ও বিরাট পুরস্কার লাভ করে ধন্য হবেন তাঁদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন,

وَالصَّادِقِيْنَ وَالصَّادِقَاتِ০

‘এরা সত্যবাদী-সত্যনিষ্ঠ পুরুষ এবং সত্যবাদী-সত্যনিষ্ঠ নারী।’

• তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তিগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি আনুগত্যশীল হয়ে থাকেন।

সূরা আন্ নূরের ৫১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

اِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِيْنَ اِذَا دُعُوْا اِلَى اللهِ وَرَسُوْلِه لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ اَنْ يَّقُوْلُوْا سَمِعْنَا وَاَطَعْنَا ط وَاُولئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ০

‘মুমিনদের কোন কিছু ফায়সালা করার ব্যাপারে যখন তাদেরকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান জানানো হয় তখন তারা এই কথাই বলে, ‘আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম’ আর এই সব লোকই সফলকাম।’

সূরা আলে ইমরানের ৩১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِىْ يُحْبِبْكُمُ اللهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ  ط وَاللهُ غَفُوْرُ رَّحِيْمٌ০

‘তাদেরকে বলে দাও, তোমরা যদি আল্লাহর প্রতি সত্যি ভালোবাসা পোষণ কর, তাহলে আমার অনুসরণ কর। এতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন। এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়াবান।’

সূরা আল আহযাবের ২১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِىْ رَسُوْلِ اللهِ اُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللهَ وَالْيَوْمِ الاخِرَ.

‘প্রকৃতপক্ষে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি আশাবাদী তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের জীবনে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’

সূরা আল আহযাবের ৩৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন তাঁর ক্ষমা ও বিরাট পুরস্কার পেয়ে যাঁরা ধন্য হবেন তাঁদের একটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,

وَالْقَانِتِيْنَ وَالْقَانِتَاتِ.

‘এরা (আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের) প্রতি আনুগত্যশীল পুরুষ ও আনুগত্যশীল নারী।’

• তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তিগণ আল্লাহর পথে অকাতরে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে থাকেন।

আলকুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন মুমিনদেরকে ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহর তাকিদ করেছেন।

সূরা আল হাদীদের ১১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

مَنْ ذَا الَّذِىْ يُقْرِضُ اللهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضعِفَه لَه وَلَه اَجْرٌ كَرِيْمٌ০

‘কে আছে আল্লাহকে করযে হাসানা দেবে যা তিনি বহু গুণ বাড়িয়ে তাকে ফেরত দেবেন? আর তার জন্য রয়েছে সর্বোত্তম প্রতিদান।’

সূরা আলবাকারা-র ২৫৪ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

ياَيُّهَا الَّذٍيْنَ امَنُوْا اَنْفِقُوْا مِمَّا رَزَقْنكُمْ مِنْ قَبْلِ اَنْ يَاْتِىَ يَوْمٌ لاَ بَيْعٌ فِيْهِ وَلاَ خُلَّةٌ وَلاَ شَفَاعَةٌ০

‘ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আমি তোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে

ইনফাক কর সেই দিনটি আসার পূর্বে যে দিন কোন বেচাকেনা, কোন বন্ধুত্ব ও কোন সুপারিশ চলবে না।’

সূরা আলে ইমরানের ৯২ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتّى تُنْفِقُوْا مِمَّا تُحِبُّوْنَ.

‘তোমরা প্রকৃত পুণ্য লাভ করতে পারবে না যেই পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তুগুলো আল্লাহর পথে ব্যয় না করবে।’

এই সব আয়াতের দাবি পূরণের জন্য খাঁটি মুমিনগণ অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করে থাকেন।

সূরা আল আহযাবের ৩৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন তাঁদেরকে,

اَلْمُصَدِّقِيْنَ وَالْمُصَدِّقَاتِ.

(ইনফাককারী পুরুষ ও ইনফাককারী মহিলা) বলে উল্লেখ করেছেন।

অর্থাৎ তাঁরা আল্লাহর পথে অকাতরে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেন। সমাজের অভাবী ব্যক্তিদের প্রতি তাঁদের সহযোগিতার হাত প্রসারিত হয়। আর আল্লাহর দীনের আওয়াজ বুলন্দ করার কাজে তাঁরা উদারভাবে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে থাকেন।

সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ নাম্বার আয়াতে এই ধরনের ব্যক্তিদের পরিচয় তুলে ধরে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

اَلَّذِيْنَ يُنْفِقُوْنَ فِى السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكظِمِيْنَ الْغَيْظَ وَالْعَافِيْنَ عَنِ النَّاسِ ط

‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় (আল্লাহর পথে) অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে, যারা ক্রোধ দমন করে এবং যারা লোকদের দোষ-ত্রুটি মাফ করে দেয়।’

• তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তিগণ শেষ রাতে আল্লাহর নিকট প্রার্থনাকারী হয়ে থাকেন।

সূরা আন্ নিসা-র ১০৬ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

وَاسْتَغْفِرِ اللهَ ط اِنَّ اللهَ كَانَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا০

‘আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াবান।’

সূরা আন্ নাছর-এর ৩ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ ط اِنَّه كَانَ تَوَّابًا০

‘তোমার প্রভুর প্রশংসা সহকারে তাঁর তাসবীহ কর এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি বেশি বেশি তাওবা কবুলকারী।’

সূরা আলআনফাল-এর ৩৩ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَاَنْتَ فِيْهِمْ وَمَا كَانَ اللهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ০

‘আল্লাহ এমন নন যে, তুমি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায় তিনি তাদের ওপর আযাব নাযিল করবেন। আর আল্লাহ এমন নন যে, লোকেরা ক্ষমা চাইতে থাকবে, আর তিনি তাদেরকে

শাস্তি দেবেন।’

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

اَيُّهَا النَّاسُ اَفْشُوا السَّلاَمَ وَاَطْعِمُوا الطَّعَامَ وَصَلُّوْا بِالَّيْلِ وَالنَّاسُِ نِيَامٌ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلاَمٍ.

‘ওহে লোকেরা, সালামের প্রসার ঘটাও, (অভাবীদেরকে) আহার করাও, রাতে যখন

লোকেরা ঘুমায় সেই সময় ছালাত আদায় কর। তাহলে তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।’

[আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রা), জামে আত্তিরমিযী]

সূরা আস্-সাজদাহ-র ১৬ নাম্বার আয়াতে খাঁটি মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

تَتَجَافى جُنُوْبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا ز وَّمِمَّا رَزَقْنهُمْ يُنْفِقُوْنَ০

‘তাঁদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়ে থাকে এবং ভয় ও আশা নিয়ে তারা তাদের রবের নিকট দু’আ করতে থাকে। আর আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে তারা ইনফাক করে।’সূরা আয্-যারিয়াতের ১৫ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে মুত্তাকী মুহসিন ব্যক্তিদের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

اِنَّ الْمُتَّقِيْنَ فِىْ جَنّتٍ وَّعُيُوْنٍ০ اخِذِيْنَ مَآ اتهُمْ رَبُّهُمْ ط اِنَّهُمْ كَانُوْا قَبْلَ ذلِكَ مُحْسِنِيْنَ০ كَانُوْا قَلِيْلاً مِّنَ الَّيْلِ مَا يَهْجَعُوْنَ০ وَبِالاَسْحَارِهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ০ وَفِىْ اَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُوْمِ০

‘মুত্তাকী ব্যক্তিরা সেদিন বাগান ও ঝর্ণাসমূহের মধ্যে থাকবে। তাদের রব তাদেরকে যা দেবেন তা তারা খুশি হয়ে নিতে থাকবে। তারা সে দিনটি আসার আগে (অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে) মুহসিন হিসেবে জীবন যাপন করেছে। রাতে তারা কমই ঘুমাতো। শেষ রাতে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতো। আর তাদের অর্থ-সম্পদে সাহায্যপ্রার্থী ও বঞ্চিতদের হক স্বীকৃত ছিলো।’

৫। শিক্ষা

যেসব তাকওয়াবান ব্যক্তি- (১) সব সময় আল্লাহর কাছে মাগফিরাত চাইতে থাকেন, (২) প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে ছবর অবলম্বন করেন, (৩) সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন, (৪) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে অটল থাকেন, (৫) আল্লাহর পথে অকাতরে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতে থাকেন এবং (৬) বিশেষ করে শেষ রাতে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন, আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন তাঁদের জন্য অতুলনীয়-অফুরন্ত নিয়ামতে ভরপুর জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন।

একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন,

اَعْدَدْتُ لِعِبَادِىَ الصَّالِحِيْنَ مَا لاَ عَيْنٌ رَأَتْ وَلاَ اُذُنٌ سَمِعَتْ وَ لاَ خَطَرَ عَلى قَلْبِ بَشَِرٍ.

‘আমি আমার ছালিহ বান্দাদের জন্য এমন সব নিয়ামত মওজুদ করে রেখেছি যা কোন চোখ কখনো দেখেনি, যার কথা কোন কান কখনো শোনেনি এবং যার ধারণা কোন হৃদয়ে কখনো উদিত হয়নি।’ [আবু হুরাইরা (রা), ছাহীহ মুসলিম, ছাহীহ আলবুখারী]

জান্নাতের সামগ্রীর তুলনায় দুনিয়ার সামগ্রী অতি তুচ্ছ, অতি নগণ্য।

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللهِ جَنَاحَ بَعُوْضَةٍ مَا سَقى كَافِرًا مِنْهَا شِرْبَةَ مَاءٍ.

‘আল্লাহর নিকট দুনিয়ার মূল্য যদি একটি মশার ডানার মূল্যের সমান হতো, তাহলে তিনি কোন কাফিরকে এত্থেকে এক চুমুক পানিও পান করতে দিতেন না।’

[সাহল ইবনু সা’দ (রা), জামে আততিরমিযী]

অতএব এই নগণ্য দুনিয়াকে নয়, আখিরাতের অনন্ত জীবনে মহামূল্যবান জান্নাত প্রাপ্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমাদের চিন্তা-চেতনা, কামনা-বাসনা এবং যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s