সূরা আল-বাকারা আয়াত ১৫৩-১৫৭

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

اَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ .

১। আয়াত

-153ياَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوا اسْتَعِيْنُوْا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةِ ط اِنَّ اللهَ مَعَ الصَّابِرِيْنَ 0

-154وَلاَ تَقُوْلُوْا لِمَنْ يُّقْبَلُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ اَمْوَاتٌ ط بَلْ اَحْيَاءٌ وَّلكِنْ لاَ تَشْعُرُوْنَ 0

-155وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الاَمْوَالِ وَالاَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ط وَبَشَّرِ الصَّابِرِيْنَ 0

-156اَلَّذِيْنَ اِذَآ اَصَابَتْهُمْ مُّصِيْبَةٌ لا قَالُوْآ اِنَّا لِلّهِ وَاِنَّآ اِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ 0

-157اُولئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ قف وَاُولئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْنَ 0

২। ভাবানুবাদ

১৫৩. ‘ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, ছবর ও ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ছবর অবলম্বনকারীদের সংগে আছেন।

১৫৪. আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে তোমরা ‘মৃত’ বলো না। তারা তো আসলে জীবিত। কিন্তু তোমরা তা অনুধাবন করতে পার না।

১৫৫. এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি, ক্ষুধা-অনাহার এবং অর্থ-সম্পদ, জান ও আয়-উপার্জনের নোকসান ঘটিয়ে পরীক্ষা করবো। এমতাবস্থায় যারা ছবর অবলম্বন করবে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও।

১৫৬. যারা তাদের ওপর কোন মুছীবাত আপতিত হলে বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।’

১৫৭. তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে বিপুল অনুগ্রহ ও রাহমাত। আর এরাই সঠিক পথের পথিক।’

৩। পরিপ্রেক্ষিত

নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তেরোটি বছর মাক্কায় ইসলামের দা‘ওয়াত পেশ করেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। সত্য-সন্ধানী কিছু সংখ্যক লোক তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে তাঁর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হন। কিন্তু মুশরিক নেতাদের দাপটের কারণে মাক্কার অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেনি। এই দিকে ইয়াসরিবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় ইয়াসরিবে ইসলামী দা‘ওয়াতের প্রসার ঘটে।

এমতাবস্থায় আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর অনুসারীদেরকে ইয়াসরিবে হিজরাত করার নির্দেশ দেন।

৬২২ খৃস্টাব্দে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইয়াসরিব পৌঁছেন। ইয়াসরিবে গড়ে তোলেন ছোট্ট একটি রাষ্ট্র। তখন থেকে ইয়াসরিব হয় আল মাদীনা।

মাদানী যুগের একেবারে গোড়ার দিকে সূরা আল বাকারা-র বৃহত্তর অংশ নাযিল হয়। সুদ নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়েছিলো মাদানী যুগের শেষ দিকে। এই আয়াতগুলোকেও এই সূরায় শামিল করা হয়। আবার, যেই আয়াতগুলো দিয়ে এই সূরাটির সমাপ্তি টানা হয়েছে সেই আয়াতগুলো মাক্কী যুগের শেষভাগে মি‘রাজের সময় নাযিল হয়েছিলো। বিষয় বস্ত্তর সামঞ্জস্যের কারণে সেই আয়াতগুলো এই সূরায় সংযুক্ত করা হয়।

হিজরাতের পূর্বে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দা‘ওয়াতী তৎপরতা পরিচালিত হয়েছে মুশরিকদের মধ্যে। হিজরাতের পর আরেক শ্রেণীর লোক তাঁর সামনে আসে। এরা ছিলো ইয়াহুদী।

আলমাদীনার উপকণ্ঠে তাদের বিভিন্ন গোত্র বসবাস করতো। এরা আত্তাওরাতের অনুসারী বলে দাবি করতো। আসলে তারা আত্তাওরাতকে বিকৃত করে ফেলেছিলো। আত্তাওরাতে তারা মানুষের কথা মিশিয়ে নিয়েছিলো। আত্তাওরাতের যেই সব আয়াত তখনো অবিকৃত ছিলো সেইগুলোকে তারা নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা দ্বারা বিকৃত করে ফেলেছিলো। এরা ছিলো আসলে বিকৃত মুসলিম।

ইসলামী দা‘ওয়াত মাদানী যুগে প্রবেশ করার পর আরেক শ্রেণীর মানুষের আবির্ভাব ঘটতে শুরু করে। এরা ছিল মুনাফিক।

এদের কেউ কেউ ইসলামের সত্যতা স্বীকার করতো, কিন্তু এর প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে দ্বন্দ্ব-প্রতিদ্বন্দ্বে নিয়োজিত হতে তারা প্রস্তুত ছিলো না।

এদের কেউ কেউ ইসলাম ও জাহিলিয়াতের মাঝে দোদুল্যমান অবস্থায় ছিলো।

এদের কেউ কেউ আসলে ইসলামকে অস্বীকারই করতো, কিন্তু ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মুসলিমদের দলে প্রবেশ করতো।

এদের কেউ কেউ একদিকে মুসলিমদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতো, অন্যদিকে ভালো সম্পর্ক রাখতো ইসলামের দুশমনদের সাথে। শেষাবধি যারাই বিজয়ী হোক না কেন, এতে যেনো তাদের স্বার্থ হানি না ঘটে সেই বিষয়ে তারা ছিলো খুবই সজাগ।

সূরা আলবাকারা নাযিলের সময় বিভিন্ন ধরনের মুনাফিকের আত্মপ্রকাশ ঘটতে শুরু করেছিলো মাত্র, তাই এই সূরাতে তাদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য পেশ করা হয়েছে।

সংগে সংগে মুমিনদের চিন্তা-চেতনা, কামনা-বাসনা এবং আমল-আখলাক পরিশীলিত করার জন্য বিভিন্ন ছবক দেওয়া হয়েছে।

৪। ব্যাখ্যা

১৫৩নাম্বারআয়াত

-153ياَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوا اسْتَعِيْنُوْا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةِ ط اِنَّ اللهَ مَعَ الصَّابِرِيْنَ 0

‘ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, ছবর ও ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। অবশ্যই আল্লাহ ছবর অবলম্বনকারীদের সংগে আছেন।’

আলমাদীনা রাষ্ট্রে উত্তরণের মাধ্যমে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন মুমিনদেরকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দেন। এর মাধ্যমে তাঁদেরকে যে বিরাট রকমের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে ইংগিতে সেই কথা তাঁদেরকে জানিয়ে দেন। সমাজ-সভ্যতার ইছলাহ করতে অগ্রসর হলে তাঁদেরকে যে বড়ো রকমের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হবে সেই কথা তাঁদেরকে জানিয়ে দেন। আর এই চ্যালেঞ্জ মুকাবিলার জন্য তাঁদেরকে ছবর ও ছালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার আহবান জানান।

r ছবর অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। মুমিনদেরকে এই গুণে গুণান্বিত হওয়ার জন্য আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বারবার তাকিদ করেছেন। আলহাদীসেও এই বিষয়ে তাকিদ রয়েছে।

রোগ-ব্যাধির কষ্ট বরদাশত করার নাম ছবর।

দুঃখ-বেদনায় ভেংগে না পড়ার নাম ছবর।

অনভিপ্রেত কথা ও আচরণে উত্তেজিত না হওয়ার নাম ছবর।

পাপের পথে গিয়ে লাভবান হওয়ার চেয়ে পুণ্যের পথে থেকে ক্ষতিকে মেনে নেওয়ার নাম ছবর।

মিথ্যা প্রচারণার মুখে অবিচলিত থাকার নাম ছবর।

ভীতিপ্রদ পরিস্থিতিতেও সঠিক পথে দৃঢ়পদ থাকার নাম ছবর।

লক্ষ্য হাছিলের জন্য দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার নাম ছবর।

লক্ষ্য অর্জন বিলম্বিত হচ্ছে দেখে হতাশ বা নিরাশ না হওয়ার নাম ছবর।

বিরোধিতার বীরোচিত মুকাবিলার নাম ছবর। ইত্যাদি।

সূরা আল মুদ্দাস্সির-এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবী হিসেবে তাঁর কর্তব্য কী তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ময়দানে তিনি তখনো নামেননি। কিন্তু আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন এই সূরারই সপ্তম আয়াতে এই কথাও তাঁকে অগ্রিম জানিয়ে দিলেন যে এই কর্তব্য পালন করতে গেলে তাঁকে বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে। সেই অবস্থার সম্মুখীন হয়ে তাঁকে কর্তব্য কর্মে দৃঢ় পদ থাকতে হবে।

وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ ০

[এবং তোমার রবের খাতিরে ছবর অবলম্বন কর।]

ছবর অবলম্বনের তাকিদ দিয়ে সূরা আল মুয্যাম্মিল-এর ১০ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

وَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُوْنَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيْلاً ০

‘ওরা যেইসব কথা বলে বেড়াচ্ছে তার মুকাবিলায় ছবর অবলম্বন কর এবং ভদ্রভাবে তাদেরকে এড়িয়ে চল।’

সূরা আল মা‘আরিজ-এর ৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

فَاصْبِرْ صَبْرًا جَمِيْلاً ০

‘অতএব তুমি ছবর অবলম্বন কর, সুন্দর ছবর।’

সূরা ইউনুস-এর ১০৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

وَاتَّبِعْ مَا يُوْحَى إِلَيْكَ وَاصْبِرْ حَتَّىَ يَحْكُمَ اللهُ ج وَهُوَ خَيْرُ الْحَاكِمِيْنَ০

‘এবং তোমার প্রতি যা ওহী করা হয় তা মেনে চল এবং আল্লাহ ফায়সালা না করে দেওয়া পর্যন্ত ছবর অবলম্বন কর। আর তিনিই তো সর্বোত্তম ফায়সালাকারী।’

একই রূপ তাকিদ দিয়ে সূরা তা-হা-এর ১৩০ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

فَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُوْلُوْنَ وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ غُرُوبِهَا ج وَمِنْ آنَاء اللَّيْلِ فَسَبِّحْ وَأَطْرَافَ النَّهَارِ لَعَلَّكَ تَرْضٰى০

‘অতএব ওরা যা কিছু বলে বেড়াচ্ছে তাঁর মুকাবিলায় তুমি ছবর অবলম্বন কর, আর সুর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ কর, রাতের বেলায়ও তাসবীহ কর এবং দিনের প্রান্তে। আশা করা যায় তুমি খুশি হবে।

সূরা আল আহকাফ-এর ৩৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُوْلُوْا الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ وَلاَ تَسْتَعْجِلْ لَّهُمْ ০

‘অতএব তুমি ছবর অবলম্বন কর যেমন করেছিলো দৃঢ়সংকল্প রাসূলগণ, আর তাদের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করো না।’

সূরা আলে ইমরানের ২০০ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

ياَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوا صْبِرُوْا وَصَابِرُوْا وَرَابِطُوْا وَاتَّقُوا اللهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ 0

‘ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, ছবর অবলম্বন কর, বাতিলের মুকাবিলায় দৃঢ়পদ থাক, সদা সতর্ক থাক, এবং আল্লাহকে ভয় করে চল। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।’

এ হচ্ছে ছবর অবলম্বনের তাকিদ সম্বলিত বহু সংখ্যক আয়াতের মাত্র কয়েকটি।

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,

وَمَا اُعْطِىَ اَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَاَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ 0

[আবু সায়ীদ আল খুদরী (রা) ছাহীহ মুসলিম, ছাহীহ আলবুখারী।]

‘ছবরের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত আর কিছু কাউকে দেওয়া হয়নি।’

সূরা আয্যুমার-এর ১০ নাম্বার আয়াতে ছবর অবলম্বনকারীদের প্রতিদান সম্পর্কে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

اِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرِيْنَ اَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍِ 0

‘ছবর অবলম্বনকারীদেরকে অগণিত পুরস্কার পূর্ণভাবে দেওয়া হবে।’

এই আয়াতের শেষাংশে-

اِنَّ اللهَ مَعَ الصَّابِرِيْنَِ 0

কথাটি জুড়ে দিয়ে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন ছবর নামক গুণটির মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে এই বাক্যাংশের মাধ্যমে তিনি মুমিনদের মনে নিশ্চিন্ততার আমেজ সৃষ্টি করেছেন।

r আরেকটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ছালাত। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যার অনুশীলন মুমিনদের মাঝে অনুপম নৈতিক শক্তি সৃষ্টি করে। সেই জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুওয়াত প্রদানের সংগে সংগেই জিবরাঈল (আ) কে পাঠিয়ে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন তাঁকে ছালাত আদায়ের পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। মাক্কী ও মাদানী যুগে নাযিলকৃত বহু আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন ছালাতের তাকিদ দিয়েছেন। আলোচ্য আয়াতটিতেও আমরা একই রূপ তাকিদ দেখতে পাই।

১৫৪নাম্বারআয়াত

وَلاَ تَقُوْلُوْا لِمَنْ يُّقْتَلُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ اَمْوَاتٌ ط بَلْ اَحْيَاءٌ وَّلكِنْ لاَ تَشْعُرُوْنَ 0

‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না। তারা তো আসলে জীবিত। কিন্তু তোমরা তা অনুধাবন করতে পার না।’

আল্লাহর পথে নিহত হওয়াকে ইসলামী পরিভাষায় শাহাদাত বলা হয়। যিনি আল্লাহর পথে নিহত হন, তাঁকে বলা হয় শহীদ।

শাহাদাত বরণ মৃত্যু বটে, কিন্তু অসাধারণ মৃত্যু, মহিমান্বিত মৃত্যু। সেই জন্য আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন শহীদদেরকে ‘মৃত’ বলে আখ্যায়িত করতে নিষেধ করেছেন।

সূরা আলে ইমরানের ১৬৯ থেকে ১৭১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন শহীদদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,

وَلاَ تَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ قُتِلُوْا فِىْ سَبِيْلِ اللهِ اَمْوَاتًا ط بَلْ اَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُوْنَ 0

فَرِحِيْنَ بِمَآاتـهُمُ اللهُ مِنْ فَضلِه لا وَيَسْتَبْشِرُوْنَ بِالَّذِيْنَ لَمْ يَلْحَقُوْا بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ لا
اَلاَّ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَهُمْ يَحْزَنُوْنَ 0 يَسْتَبْشِرُوْنَ بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللهِ وَفَضْلٍ لا وَّ اَنَّ اللهَ لاَ يُضِيْعُ
اَجْرَ الْمُؤْمِنِيْنَ 0

‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে তোমরা মৃত মনে করো না। বরং তারা জীবিত। তাদের রবের কাছ থেকে তারা রিযক পাচ্ছে। আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতে তারা খুশি ও তৃপ্ত। আর তারা এই বিষয়েও নিশ্চিত, যেই সব মুমিন তাদের পেছনে এখনো দুনিয়ায় রয়ে গেছে, তাদের জন্য কোন ভয় ও দুঃখের কারণ নেই। তারা আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করে আনন্দিত এবং তারা জানতে পেরেছে, অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের পুরস্কার নষ্ট করেন না।’

শহীদের মর্যাদা সম্পর্কে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,

مَا اَحَدٌ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ يُحِبُّ اَنْ يَّرْجِعَ اِلَى الدُّنْيَا وَلَهُ مَا عَلَى الاَرْضِ مِنْ شَيْءٍ الاَّ الشَّهِيْدُ يَتَمَنّى اَنْ يُّرْجِعَ اِلَى الدُّنْيَا فَيُقْتَلَ عَشَرَ مَرَّاتٍ لِمَا يَرى مِنَ الْكَرَامَةِ 0

[আনাস (রা), ছাহীহ মুসলিম, ছাহীহ আলবুখারী]

‘জান্নাতে প্রবেশ করার পর দুনিয়ার সমস্ত সামগ্রী তার জন্য নির্ধারিত হলেও কোন ব্যক্তি পৃথিবীতে ফিরে আসতে চাইবে না। কিন্তু শহীদ এর ব্যতিক্রম। তাকে যেই মর্যাদা দেওয়া হবে তা দেখে সে দশবার পৃথিবীতে এসে শহীদ হওয়ার আকাংখা ব্যক্ত করবে।’

শাহাদাত লাভের পর পরই যাঁরা আল্লাহ রাববুল ‘আলামীনের সান্নিধ্যে এমনভাবে সমাদৃত হন, তাঁদেরকে ‘মৃত’ বলা আসলেই শোভনীয় নয়।

১৫৫নাম্বারআয়াত

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الاَمْوَالِ وَالاَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ط
وَبَشَّرِ الصَّابِرِيْنَ 0

‘এবং আমি অবশ্যই ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি, ক্ষুধা-অনাহার এবং অর্থ-সম্পদ, জান ও আয়-উপার্জনের নোকসান ঘটিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো। এমতাবস্থায় যারা ছবর অবলম্বন করবে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও।’

এই আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন তাঁর একটি শাশ্বত বিধানের কথা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর সেটি হচ্ছে : যাঁরা আল্লাহ রাববুল ‘আলামীনের প্রতি নিখাদ ঈমান আনার ঘোষণা দেবেন, তাঁদেরকে তিনি অবশ্যই পরীক্ষার সম্মুখীন করবেন।

সূরা আল‘আনকাবূতের ২ ও ৩ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

اَحَسِبَ النَّاسُ اَنْ يُّتْرَكُوْآ اَنْ يَّقُوْلُوْآ امَنَّا وَهُمْ لاَ يُفْتَنُوْنَ 0 وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللهُ الَّذِيْنَ صَدَقُوْا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِيْنَ 0

‘লোকেরা কি মনে করেছে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এই কথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? অথচ তাদের পূর্ববর্তীদেরকে আমি
পরীক্ষা করেছি। আল্লাহকে তো জানতে হবে- ঈমানের দাবিতে কারা সত্যবাদী আর
কারা মিথ্যাবাদী।’

পরবর্তীকালে অবতীর্ণ সূরা মুহাম্মাদ-এর ৩১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتّى نَعْلَمُ الْمُجَاهِدِيْنَ مِنْكُمْ وَالصَّابِرِيْنَ 0

‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো যাতে আমি জেনে নিতে পারি তোমাদের মধ্যে কারা ‘মুজাহিদীন’ এবং কারা ‘ছাবেরীন।’

সূরা আলে ইমরানের ১৪২ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللهُ الَّذِيْنَ جهَدُوْا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِيْنَ 0

‘তোমরা কি ভেবেছো এমনিতেই জান্নাতে চলে যাবে, অথচ আল্লাহ এখনো দেখেননি তোমাদের মধ্য থেকে কারা জিহাদ করে এবং কারা ছবর অবলম্বনকারী?’

সূরা আত্ তাওবা-র ১৬ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تُتْرَكُوْا وَلَمَّا يَعْلَمَ اللهُ الَّذِيْنَ جهَدُوْا مِِنْكُمْ وَلَمْ يَتَّخِذُوْا مِنْ دُوْنِ اللهِ وَلاَ رَسُوْلِه وَلاَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَلِيْجَةٌ ج وَاللهُ خَبِِيْرٌم بِمَا تَعْمَلُوْنَ 0

‘তোমরা কি ভেবেছো যে তোমাদেরকে এমনিতেই ছেড়ে দেওয়া হবে অথচ আল্লাহ এখনো দেখেননি যে তোমাদের মধ্য থেকে কারা জিহাদে নিবেদিত হয় এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরকে ছাড়া আর কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে না। আর তোমরা যা কিছু কর সেই সম্পর্কে আল্লাহ খবর রাখেন।’

সূরা আলবাকারা-র ২১৪ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةّ وَلَمَّا يَاْتِكُمْ مَّثَلُ الَّذِيْنَ خَلَوْ مِنْ قَبْلِكُمْ ط مَسَّتْهُمُ الْبَاسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوْا حَتّى يَقُوْلَ الرَّسُوْلُ وَالَّذِيْنَ امَنُوْا مَعَه مَتى نَصْرُ اللهِ ط اَلاَ اِنَّ نَصْرَ
اللهِ قَرِيْبٌ 0

‘তোমরা কি ভেবেছো যে এমনিতেই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ এখনো তোমাদের ঐরূপ অবস্থা আসেনি যেমনটি এসেছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর।

তাদের ওপর কঠিন অবস্থা আপতিত হয়েছে, মুছীবাত এসেছে এবং তাদেরকে কাঁপিয়ে দেওয়া হয়েছে যেই পর্যন্ত না রাসূল ও তাঁর সংগীরা বলে ওঠেছে, ‘কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য!’ তখন তাদেরকে বলা হয়েছে, ‘ওহে, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটেই।’

সূরা আলে ইমরানের ১৪৬ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

وَكَاَيِّنْ مِّنْ نَبِىٍّ قَتَلَ لا مَعَه رِبِّيُّوْنَ كَثِيْرٌ ج فَمَا وَهَنُوْا لِمَآ اَصَابَهُمْ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ وَمَا ضَعُفُوْا وَمَا اسْتَكَانُوْا ط وَاللهُ يُحِبُّ الصَّابِرِيْنَ 0

‘কত নবী গত হয়ে গেছে যারা লড়াই করেছে, তাদের সাথে মিলে লড়াই করেছে বহু আল্লাহওয়ালা লোক। আল্লাহর পথে যতো মুছীবাতই তাদের ওপর আপতিত হয়েছে তারা হতাশ হয়নি, দুর্বলতা দেখায়নি এবং বাতিলের নিকট মাথা নত করেনি। এমন ছবর অবলম্বনকারীদেরকেই আল্লাহ ভালোবাসেন।’

ঈমানের দাবি হচ্ছে, আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিবেদিত হওয়া এবং এই সংগ্রাম চালাতে গিয়ে যতো প্রকারের বাধাই আসুক না কেন তার মুকাবিলায় দৃঢ়পদ থাকা।

এই সংগ্রাম চালাতে গিয়ে মুমিনদেরকে অনিবার্যভাবে ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, কখনো কখনো অবস্থা এমন সংগীন হতে পারে যে অনাহারে থাকতে হবে, কখনো কখনো বাগ-বাগিচা, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, ঘরদোরের ওপর হামলা হতে পারে, কখনো কখনো ইসলাম বিদ্বেষীদের হাতে আপনজন ও সহকর্মীদের কেউ কেউ প্রাণ হারাতে পারেন এবং কখনো কখনো আয়-উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এমন সব কঠিন পরিস্থিতিতেও যাঁরা ছবর অবলম্বন করতে পারবেন, তাঁদেরকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন।

১৫৬নাম্বারআয়াত

اَلَّذِيْنَ اِذَآ اَصَابَتْهُمْ مُّصِيْبَةٌ لا قَالُوْآ اِنَّا لِلّهِ وَاِنَّآ اِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ 0

‘যারা তাদের ওপর কোন মুসীবাত আপতিত হলে বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে।’

ঈমানের পরীক্ষায় দৃঢ়পদ মুমিন যাঁরা তাঁদের মনোভংগি এই আয়াতটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

এই সব মুমিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে হিম্মতহারা হন না, লক্ষ্যচুত হন না, কক্ষচ্যুত হন না, দিশেহারা হন না।

জান-মাল যিনি দিলেন তাঁর জন্য সব কিছু বিলিয়ে দিতে পারাতেই যেনো তাঁদের আনন্দ।

আলোচ্য আয়াতের মর্মকথারই প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই সূরা আলআন‘আমের ১৬২ নাম্বার আয়াতে। এই আয়াতে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বলেন,

قُلْ اِنَّ صَلاَتِىْ وَنُسُكِىْ وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِىْ لِلّهِ رَبِّ الْعلَمِيْنَ 0

‘বল : আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু একমাত্র আল্লাহ রাববুল ‘আলামীনের জন্য।’

১৫৭নাম্বারআয়া

اُولئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ قف وَاُولئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْنَ 0

‘তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে বিপুল অনুগ্রহ ও রাহমাত। আর এরাই সঠিক পথের পথিক।’

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন জানিয়ে দিলেন যে যেই সব মুমিন ছবর ও ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চান, শহীদদের মর্যাদা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পোষণ করেন, আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালাতে গিয়ে জান-মাল-আয়-উপার্জনের ক্ষতির শিকার হন এবং বিপদ-মুসীবাতে দৃঢ়পদ থাকেন তাঁদের প্রতি আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন তাঁর অপার অনুগ্রহ বর্ষণ করতে থাকেন। তদুপরি এই বৈশিষ্টমন্ডিত মুমিনদেরকে তিনি সঠিক পথের পথিক বলে ঘোষণা করেছেন।

৫। শিক্ষ

১। সমাজ ও সভ্যতার ইছলাহ বা পরিশুদ্ধি করতে গেলে মুমিনদেরকে অবশ্যই বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হবে।

এমতাবস্থায় তাঁদেরকে ছবর ও ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে থাকতে হবে।

২। আল্লাহর পথে যাঁরা শহীদ হন তাঁদেরকে ‘মৃত’ বলে আখ্যায়িত করা যাবে না।

৩। আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি, ক্ষুধা-অনাহার এবং অর্থ-সম্পদ, জান ও আয়-উপার্জনের নোকসান ঘটিয়ে মুমিনদেরকে পরীক্ষা করবেন।

এমতাবস্থায় যাঁরা দৃঢ়তা-অটলতা-অবিচলতা অবলম্বন করবেন, তাঁদের জন্যই রয়েছে আল্লাহর বিপুল অনুগ্রহ ও রাহমাত।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s