ইসলামী শিক্ষা

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

এ.কে.এম. নাজির আহমদ

শিক্ষা

শিক্ষা মানে জ্ঞান-চর্চা।

দৃশ্যমান জীবকুলের মধ্যে একমাত্র মানুষেরই জ্ঞান-চর্চা প্রয়োজন।

অন্যান্য জীবের জন্য সহজাত জ্ঞানই (সহজাত বুদ্ধি, সহজাত প্রবৃত্তি) যথেষ্ট।

তাদেরকে মানুষের মতো জ্ঞান-চর্চা করতে হয় না। প্রয়োজন পড়ে না।

জ্ঞানেরদুটোভাগ

জ্ঞান প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত।

এক. পরিবেশ-পরিমণ্ডলের জ্ঞান।

অর্থাৎ মানুষের চারপাশে বিদ্যমান বস্তু ও জীবজগতের জ্ঞান।

দুই. নীতি-জ্ঞান।

অর্থাৎ ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়,  কর্তব্য ও অ-কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান।

দুটোজ্ঞানইমানুষেরপ্রয়োজন

পরিবেশ-পরিমণ্ডলের জ্ঞান না হলে মানুষের চলে না।

তেমনিভাবে নীতি-জ্ঞান না হলেও মানুষের চলে না। দু’টো জ্ঞান যুগপৎ মানুষের প্রয়োজন।

মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত দু’টো জ্ঞানের একটি চর্চা করে এবং অপরটিকে উপোক্ষা করে মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ সাধন সম্ভব নয়।

মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ নির্ভর করে উভয়বিধ জ্ঞানের সমন্বিত চর্চার ওপর।

জ্ঞানেরউৎস

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন জ্ঞানময় সত্তা।

তিনিই সকল জ্ঞানের উৎস।

আল্লাহ মানুষের পরিবেশ-পরিমণ্ডলের জ্ঞানের উৎস।

আল্লাহ মানুষের নীতি-জ্ঞানের উৎস।

আল্লাহ প্রথম মানুষ আদমকে (আ) সৃষ্টি করে তাঁর পরিবেশ-পরিমণ্ডলের সকল কিছুর নাম-পরিচয় জানিয়ে দেন।

وَعَلَّمَ ادَمَ الاَسْمَاءَ كُلَّهَا…

সূরা আল বাকারা ॥ ৩১

“এবং তিনি আদমকে সকল কিছুর নাম-পরিচয় জানিয়েছেন।”

এই সবকিছু সম্পর্কে আদমকে (আ) এতোখানি ব্যাপক জ্ঞান দেয়া হয়েছিলো যতোখানি জ্ঞান আর কোন সৃষ্টিকে দেয়া হয়নি। সেই জন্যই তো জ্ঞান প্রতিযোগিতায় আদম (আ) ফেরেশতাদের ওপরে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।

আল্লাহ রাব্বুল’আলামীন প্রথম মানুষ আদম (আ) ও তাঁর স্ত্রীকে কিছুকালের জন্য একটি বাগানে অবস্থান করতে দেন। সেখানে ছিলো নানা প্রকারের খাদ্য, ফলফলাদি ও পানীয়র প্রাচুর্য। তাঁদেরকে পরানো হয়েছিলো আরামদায়ক পোশাক। আবার রোদ থেকে বাঁচার জন্য তাদেরকে দেয়া হয়েছিল চমৎকার গৃহ।

এই সম্পর্কে আলকুরআনে আল্লাহ বলেন,

اِنَّ لَكَ اَلاَّ تَجُوْعَ فِيْهَا وَلاَتَعْرى. وَاِنَّكَ لاَتَظْمَؤُا فِيْهَا وَلاَتَضْحى.

সূরা তা-হা ॥ ১১৯

“এখানে তুমি অভুক্ত থাকছো না, উলংগ থাকছো না, পিপাসার্ত থাকছো না এবং রৌদ্রকিষ্ট হচ্ছো না।”

অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীনের প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপনায় আদম (আ) ও তাঁর স্ত্রী অন্ন, বস্ত্র, পানীয় ও বাসস্থান লাভ করেন। এই জন্য তাঁদেরকে কোন পরিশ্রম করতে হয়নি। আবার, এইসব নিয়ামাতের কোন্টি খেতে হবে এবং কোন্টি পান করতে হবে, কোন্টি পরতে হবে এবং কোন্টিতে বাস করতে হবে সেই জ্ঞানও তাঁদেরকে দেয়া হয়েছিলো।

পরিবেশ-পরিমণ্ডলের এই জ্ঞানই প্রথম জ্ঞান যা মানুষকে দেয়া হয়েছিলো।

উল্লেখ্য যে “রৌদ্রকিষ্ট হচ্ছো না” কথাটি আমাদের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করতে পারে যে আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন আদমকে (আ) যেই জান্নাত বা বাগানটিতে থাকতে দিয়েছিলেন সেটি এই সৌরজগতেরই  কোথাও অবস্থিত যেখানে সূর্যের কিরণ পড়ে থাকে। আবার, এই কথাও আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে মহাবিশ্বের সূর্য (তথা তারকা) তো একটি নয়, কোটি কোটি। কাজেই এখানে যেই সূর্য কিরণের দিকে ইংগিত করা হয়েছে তা আমাদের অতি চেনা সূর্যের কিরণ এমনটি নিশ্চিত করে বলার কোন সুযোগ নেই।

আরো উল্লেখ্য যে, পরিবেশ-পরিমণ্ডলের যেই মৌলিক জ্ঞান আদমকে (আ) দেয়া হয়েছিলো সেই জ্ঞানকে পরিবর্ধিত করার যোগ্যতাও তাঁকে দেয়া হয়েছিলো। আর এই যোগ্যতাই বংশানুক্রমে আদম-সন্তানেরা লাভ করেছে।

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন আদমকে (আ) ও তাঁর স্ত্রীকে জান্নাত বা বাগানে অবস্থান করতে দিয়ে বলেছিলেন,

يادَمُ اسْكُنْ اَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلاَ مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا, وَلاَتَقْرَبَا هذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُوْنَا مِنَ الظَّالِمِيْنَ.

সূরা আল বাকারা ॥ ৩৫

“ওহে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী এই বাগানে বসবাস করতে থাক, যেখান থেকে ইচ্ছা তৃপ্তিসহকারে খাদ্য গ্রহণ করতে থাক। তবে এই যে গাছটি, এর কাছেও ঘেঁষো না। যদি ঘেঁষ তাহলে তোমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।”

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন আদম (আ) ও তাঁর স্ত্রীকে জান্নাতে ঘুরে ফিরে বেড়াতে বলেন, তৃপ্তি সহকারে ফলফলাদি খাদ্য গ্রহণ করতে বলেন, আর নিষেধ করে দেন একটি গাছের নিকটবর্তী হতে, এর ফল খেতে। আল্লাহ আরও জানিয়ে দেন, যদি তাঁরা আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা লংঘন করেন তাহলে তাঁরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, আল্লাহর বিরাগভাজন হবেন।

অর্থাৎ আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন আদম (আ) ও তাঁর স্ত্রীকে এই জ্ঞান দিলেন যে, আল্লাহর নির্দেশ মানা তাঁদের ইতিবাচক কর্তব্য এবং আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা থেকে বিরত থাকা তাঁদের নেতিবাচক কর্তব্য।

আর এটাই আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন কর্তৃক মানুষকে দেয়া প্রাথমিক নীতি-জ্ঞান।

অর্থাৎ মানুষের পরিবেশ-পরিমণ্ডলের জ্ঞান ও নীতি-জ্ঞান এই উভয়বিধ জ্ঞানের উৎস আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন।

عَلَّمَ الاِنْسَانَ مَالَمْ يَعْلَمْ.

সূরা আল ’আলাক ॥ ৫

“তিনি (আল্লাহ) মানুষকে শিখিয়েছেন যা সে জানতো না।”

জ্ঞানেরবিস্তৃতি

পৃথিবীতে আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীনের প্রতিনিধিরূপে সুমহান কর্তব্য পালনের জন্যই মানুষের সৃষ্টি। প্রথম মানুষ আদমকে (আ) সৃষ্টি করার প্রাক্কালে আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন ফেরেশতাদেরকে তাঁর অভিপ্রায় জানাতে গিয়ে ঘোষণা করেন,

اِنِّىْ جَاعِلٌ فِى الاَرْضِ خَلِيْفَةً.

সূরা আল বাকারা ॥ ৩০

“নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে যাচ্ছি।”

কিছুকালের জন্য আদম (আ) ও তাঁর স্ত্রীকে জান্নাতে রাখা হয়। ইবলীসের প্ররোচনায় ভবিষ্যতে তাঁরা কিভাবে বিপদগ্রস্ত হবেন, সেই সম্পর্কে তাঁদেরকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান দেয়া হয়। অতপর তাঁদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় পৃথিবীতে নেমে পড়তে। এই নির্দেশ ইবলীসের জন্যও প্রযোজ্য ছিলো।

জান্নাতে থাকাকালে আদম (আ) ইবলীসের প্ররোচনায় প্রতারিত হয়ে হোঁচট খেয়েছেন। সেই ইবলীসও নামছে পৃথিবীতে। ফলে আদম (আ) সম্ভাব্য বিপদের আশংকায় ভীত হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন আদম (আ) ও তাঁর স্ত্রীকে জানিয়ে দেন,

فَاِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّىْ هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَاىَ فَلاَ خَوْف عَلَيْهِمْ وَلاَهُمْ يَحْزَنُوْنَ.

আল বাকারা  ॥ ৩৮

“অতপর আমার নিকট থেকে তোমাদের নিকট হিদায়াত আসবে, যারা তা অনুসরণ করে চলবে তাদের কোন ভয় ও দুঃখ-বেদনার কারণ থাকবে না।”

فَاِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّىْ هُدًى فَمَنِ التَّبَعَ هُدَاىَ فَلاَيَضِلُّ وَلاَيَشْقى.

সূরা তা-হা ॥ ১২৩

“অতপর আমার নিকট থেকে তোমাদের নিকট হিদায়াত আসবে, যেই ব্যক্তি তা মেনে চলবে সে পথভ্রষ্ট হবে না, দুর্ভাগ্য পীড়িতও হবে না।”

পৃথিবীতে আসার পর আদম (আ) ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীনের নির্দেশনামা  পেতে থাকেন।

কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি বহু সংখ্যক ছেলে ও মেয়ে সন্তান লাভ করেন। একটি পরিবার থেকে গড়ে ওঠে অনেকগুলো পরিবার। এইভাবে পৃথিবীর অংগনে মানব সমাজের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে।

আর আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীনও ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, কর্তব্য-অকর্তব্য সম্পর্কিত জ্ঞান বিস্তৃতি আকারে নাযিল করতে থাকেন।

পৃথিবীর অংগনে মানুষের সংখ্যা যতোই বাড়তে থাকে, ততোই বড় হতে থাকে তাদের চাহিদার ফিরিস্তি।

অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের মধ্যেই তাদের চাহিদা সীমাবদ্ধ রইলো না। শিক্ষা চিকিৎসা, ভাব প্রকাশের সুযোগ, সৌন্দর্য উপকরণ, নিরাপত্তা, যুলুমের  প্রতিকার, বাহন ইত্যাদিও চাহিদার তালিকায় সংযোজিত হলো।

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন মানুষের চাহিদা পূরণের জন্যই বহুবিধ সম্পদ দিয়ে পৃথিবীকে ভরপূর করেছেন। আল্লাহ বলেন,

وَاتكُمْ مِّنْ كُلِّ مَاسَأَلْتُمُوْهُ ج وَاِنْ تَعُدُّوْا نِعْمَتَ اللهِ لاَتُحُصُوْهَا.

সূরা ইবরাহীম ॥ ৩৪

“তোমরা যা চাও (অর্থাৎ তোমাদের চাহিদা পূরণের জন্য যা প্রয়োজন) তা সবই তিনি আমি তোমাদেরকে দিয়েছেন। আর তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামাতগুলো গণনা করতে চাও, তা করা তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”

পৃথিবীতে আছে বায়ু সম্পদ, মাটি ও শিলা সম্পদ, পানি সম্পদ, উদ্ভিদ সম্পদ, প্রাণী সম্পদ, খনিজ সম্পদ, তাপ ও বিদ্যুৎ সম্পদ ইত্যাদি।

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য সম্পদ আহরণ, রূপান্তরিতকরণ, বিনিময়করণ এবং ভোগ-ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান-বুদ্ধি ও কর্মমতাও দান করেছেন।

মানুষের কোন কোন চাহিদা আপনা আপনি পূরণ হয়। কোন কোন চাহিদা মানুষ একক প্রচেষ্টায় পূরণ করতে পারে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক চাহিদা পূরণের জন্য মানুষকে অপরাপর মানুষের সহযোগিতা নিতে হয়। প্রকৃত পক্ষে মানুষের বহুবিধ চাহিদা পূরণের জন্য পরিবার, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সংস্থা এবং রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।

এখানেই আসে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, অধিকার, দায়িত্ব এবং কর্তব্যের স্বরূপ নির্ধারণ ও নিশ্চিত করণের জন্য বিধান তৈরির প্রশ্ন। পারস্পরিক সম্পর্ক, অধিকার, দায়িত্ব এবং কর্তব্যের স্বরূপ নির্ধারণ খুবই জটিল বিষয়।

কোন্টি ভালো, কোন্টি মন্দ, কোন্টি ন্যায়, কোন্টি অন্যায়, কোন্টি করা উচিত, কোন্টি করা উচিত নয় তা  নির্ণয় করা মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভবপর নয়। সেই জন্যই এই সব জটিল বিষয়ের সমাধান বের করার ভার আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন মানুষের ওপর ন্যস্ত করেননি। বরং তিনি নিজেই নির্ভুল, ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণকর সমাধান মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন। যুগেযুগে নবী রাসূলগণ সেই সমাধান মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

لَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيْزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ج وَاَنْزَلْنَا الْحَدِيْدَ فِيْهِ بَأْسٌ شَدِيْدٌ وَّمَنَافِعٌ لِلنَّاسِ.

সূরা আল হাদীদ ॥ ২৫

“আমি আমার রাসূলদেরকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদিসহ পাঠিয়েছি। তাঁদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব (মানুষের শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা) ও মীযান (সুসামঞ্জস্য ও ভারসাম্য নিশ্চিতকারী মানদণ্ড) যাতে মানুষ ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আর নাযিল করেছি লোহা (রাষ্ট্রশক্তি ও সামরিক শক্তি) যার মাঝে রয়েছে বিরাট শক্তি ও মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ।”

উল্লেখ্য যে, নবী-রাসূলগণ এই সমাধান মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তাঁরা প্রথমে সংগঠন ও পরে রাষ্ট্র গঠনের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন যাতে মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হতে পারে।

জ্ঞানচর্চারভিত্তি

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি নাযিলকৃত আল কুরআনে সর্ব প্রথম যেই নির্দেশ দিয়েছেন তা হচ্ছে “ইকরা”। অর্থাৎ “পড়” বা “জ্ঞান-চর্চা কর।”

আর এই নির্দেশের সাথে “বিইস্মিকাল্লাযি খালাকা” বাক্যাংশ জুড়ে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মানুষের কাছে এই কথা স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন যে, জ্ঞান-চর্চা হতে হবে আল্লাহকেন্দ্রিক। কেননা, একমাত্র আল্লাহকেন্দ্রিক জ্ঞান-চর্চাই মানুষের জন্য কল্যাণকর। তার মানে, আল্লাহবিমুখ জ্ঞান-চর্চা কিছুতেই মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। অতএব মানুষের কর্তব্য হচ্ছে, আল্লাহর হিদায়াতকে জ্ঞান-চর্চার ভিত্তি বানানো।

জ্ঞান-চর্চার গুরুত্ব

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন বলেন,

اَلَمْ تَرَ اَنَّ اللهَ اَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً ج فَاَخْرَجْنَا بِه ثَمَرَاتٍ مُّخْتَلِفًا اَلْوَانُهَا ط وَمِنَ الْجِبَالِ جُدَدٌم بَيْضٌ وَّحُمْرٌ مُّخْتَلِفٌ اَلْوَانُهَا وَغَرَابِيْبُ سُوْدٌ. وَمِنَ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالاَنْعَامِ مُخْتَلِفُ اَلْوَانُه كَذلِكَ ط اِنَّمَا يَخْشى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمؤُاط اِنَّ اللهَ عَزِيْزٌ غَفُوْرٌ.

সূরা ফাতির ॥ ২৭, ২৮

“তুমি কি দেখছো না আল্লাহ আসমান থেকে পানি বর্ষাণ। অতপর আমি এর সাহায্যে নানা রঙের ফল বের করি। পাহাড়ের মধ্যেও রয়েছে নানা রঙেরÑ সাদা, লাল, কালো রেখা। মানুষ, জীব-জন্তু ও গৃহপালিত পশুগুলোরও রয়েছে নানা রঙ। আসল ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানবান ব্যক্তিরাই আল্লাহকে ভয় করে। আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, ক্ষামাশীল।”

এখানে আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন আসমান থেকে পানি বর্ষণ, এর সাহায্যে নানা রকমের ফলোৎপাদন, পাহাড়ের রঙ বৈচিত্র এবং মানুষ-জন্তুজানোয়ার-গৃহপালিত পশুর বর্ণ বৈচিত্রের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অনুরূপ আরো বহু আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন পৃথিবী ও মহাবিশ্বে বিরাজমান বহু সংখ্যক সৃষ্টির দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যাতে তারা ঐগুলো নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে। কেননা, চিন্তা-গবেষণা করে মানুষ যখন ঐগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় তখনই তো বলতে বাধ্য হয় :

رّبَّنَا مَاخَلَقْتَ هذَا بِاطِلاً.

“ওহে আমাদের রব, আপনি তো এটি নিরর্থক সৃষ্টি করেননি।”

সূরা আলে ইমরান ॥ ১৯১

মানুষ মুক্ত মন নিয়ে আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টিগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করলে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে এই সব কিছুর পেছনে এক মহা শক্তিধর, মহাজ্ঞানী ও মহাপারদর্শী সত্তা বিরাজমান।

আর যেই সব ব্যক্তি চিন্তা-গবেষণা করে আল্লাহর শক্তিমত্তা, বিজ্ঞতা ও পারদর্শিতা সম্পর্কে অবহিত হন, এটাই স্বাভাবিক যে, তাঁরাই আল্লাহকে বেশি ভয় করেন।

আল্লাহ বলেন,

شَهِدَ اللهُ اَنَّه لاَاِلهَ اِلاَّ هُوَ لا وَالّمَلاَئِكَةُ وَاُولُوْ الّعِلْمِ قَاْئِمِاً بِالْقِسْطِ ط لاَاِلهَ اِلاَّ هُوَ الْعَزِيْزُ الْحَكِيْمُ.

সূরা আলে ইমরান ॥ ১৮

“আল্লাহ নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আর ফেরেশতা ও জ্ঞানবান ব্যক্তিরা, যারা ন্যায়পরতার ওপর প্রতিষ্ঠিত, এই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে সেই পরাক্রমশালী মহাবিজ্ঞ সত্তা ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।”

ফেরেশতাগণ হচ্ছেন আল্লাহর বিশাল বিশ্ব সাম্রাজ্যের সর্বত্র নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারী। প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তারা সাক্ষ্য দেন যে এই বিশ্ব-সাম্রাজ্যে আল্লাহ ছাড়া আর কারো বিধান চলে না এবং আল্লাহ ছাড়া কোথাও আর এমন কোন শক্তি নেই যার কাছ থেকে বিধান গ্রহণ করা যায়।

মানুষের মধ্যে যাঁরা সৃষ্টি জগতের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করার মতো জ্ঞানের অধিকারী তাঁদেরও সাক্ষ্য এটাই যে মহাবিশ্বের মালিক, বিধানদাতা ও ব্যবস্থাপক একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন।

অর্থাৎ বিশ্ব-জাহান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান মানুষকে আল্লাহর একমাত্র ইলাহ (সার্বভৌম বিধানদাতা) হওয়া সম্পর্কে নিঃসংশয় করে তোলে।

অন্যত্র আল্লাহ বলেন,

وَيَرَى الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ الَّذِىْ اُنْزِلَ اِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ هُوَ الْحَقُّ لا وَيَهْدِىْ اِلى صِرَاطِ الْعَزِيْزِ الْحَمِيْد.

সূরা সাবা ॥ ৬

“এবং জ্ঞানবান লোকেরা ভালো করেই বুঝে যে, যা কিছু তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে তা পুরোপুরি সত্য এবং তা প্রশংসিত মহাপরাক্রমশালী সত্তার পথ দেখায়।”

অর্থাৎ সঠিক অর্থে যাঁরা জ্ঞানবান তাঁরা সহজেই বুঝে নেন যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি নাযিলকৃত আল কুরআন নির্ভুল জ্ঞানে পরিপূর্ণ। মানুষের কর্তব্য এই নির্ভুল জ্ঞানকেই জীবনে চলার পথের পাথেয় বানানো। কারণ এই নির্ভুল জ্ঞানের অনুসরণই মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার উপায়।

আল্লাহ আরো বলেন ,

يَرْفَعِ اللهُ الَّذِيْنَ امَنُوْا مِنْكُمْ لا وَالَّذِيْنَ اُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجتٍ ط

সূরা আল মুজাদালাহ ॥ ১১

“তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা অতীব উন্নত মর্যাদার অধিকারী।”

অর্থাৎ যেই সব ব্যক্তি খাঁটি ঈমানের অধিকারী হওয়ার সাথে সাথে আল কুরআনে উপস্থাপিত  জ্ঞানেও পারদর্শিতা অর্জন করেন তাঁদের মর্যাদা বিরাট। তাঁরা নিজেরা তো কল্যাণ পেয়েই থাকেন, তাঁদের নিকট থেকে সঠিক জ্ঞান হাছিল করে উপকৃত হয় আরো অনেক মানুষ।

জ্ঞানবিতরণেরউপায়

জ্ঞান বিতরণের দুইটি প্রধান উপায় হচ্ছে বাক শক্তি ও কলম।

আল্লাহ বলেন,

خَلَقَ الاِنْسَانَ. عَلَّمَهُ الْبَيَانَ.

সূরা আর রাহমান ॥ ৩, ৪

“তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।

তিনি মানুষকে কথা বলা শিখিয়েছেন।”

অর্থাৎ আল্লাহ মানুষকে বাকশক্তি দান করেছেন। এই বাক-শক্তির সাহায্যে একজন মানুষ অপরাপর মানুষের কাছে জ্ঞান বিতরণ করে থাকেন।

অন্যত্র আল্লাহ বলেন ,

اَلَّذِىْ عَلَّمَ بِالْقَلَمِ.

সূরা আল ’আলাক ॥ ৪

“যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।”

অর্থাৎ আল্লাহ মানুষকে কলমের ব্যবহার শিখিয়েছেন যার সাহায্যে একজন জ্ঞানী মানুষ জ্ঞানের কথা লিপিবদ্ধ করেন এবং অপরাপর মানুষের কাছে লিপিবদ্ধভাবে সেই জ্ঞান পৌঁছিয়ে দেন।

জ্ঞান বিতরণের এই দুইটি উপায়  খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইটি উপায় আল্লাহর দান, আল্লাহর মহা অনুগ্রহ।

  শিক্ষাব্যবস্থা

কোন মানবগোষ্ঠী তাদের বংশধরদেরকে জ্ঞান-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার লক্ষে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা প্রদানের জন্য যেই ব্যবস্থা গড়ে তোলে তাকেই বলা হয় শিক্ষাব্যবস্থা।

দূরদর্শী  শিক্ষাব্যবস্থা

পৃথিবীর জীবন মানব জীবনের একটি স্বল্প পরিসর অধ্যায়। পৃথিবীর জীবন মৃত্যুযুক্ত জীবন। এরপর মানুষকে প্রবেশ করতে হয় জীবনের আরেকটি অধ্যায়ে। জীবনের সেই অধ্যায়ের নাম আখিরাত।

আখিরাতের জীবন মৃত্যুহীন জীবন, অনন্ত জীবন। সেই জীবনে যারা কষ্টের মধ্যে পড়বে তারা চরমভাবে ব্যর্থ। সেই জীবনে যারা সুখ লাভ করবেন, তাঁরাই কামিয়াব।

অনন্ত জীবনে সুখী হবেন তাঁরাই যাঁরা পৃথিবীর জীবনে আল্লাহর অনুগত বান্দা ও নিষ্ঠাবান প্রতিনিধি রূপে তাঁদের কর্তব্য পালন করতে থেকে মৃত্যু বরণ করেন।

অতএব যেই শিক্ষাব্যবস্থা। শুধু পৃথিবীর জীবনের কল্যাণই নয়, আখিরাতের জীবনের সীমাহীন কল্যাণ লাভের জন্যও মানুষকে তৈরি করে এবং মানুষের মাঝে সর্বাবস্থায় আখিরাতকে প্রাধান্য দেবার, আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেবার মন-মানসিকতা সৃষ্টি করে সেই শিক্ষা ব্যবস্থাই দূরদর্শী শিক্ষাব্যবস্থা।

 শিক্ষা ব্যবস্থারলক্ষ্য

পূর্বোক্ত আলোচনার নিরিখে শিক্ষাব্যবস্থার ল্যকে নিুরূপে সংজ্ঞায়িত করা যায় :

শিক্ষর্থীদের মাঝে আখিরাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জীবন গড়ার দৃঢ় মনোভংগি, পার্থিব উপায়-উপকরণসমূহ ব্যবহারের দতা এবং সমাজ ও সভ্যতায় অবদান রাখার মতো যোগ্যতা সৃষ্টিই শিা ব্যবস্থার ল্য।

শিক্ষারউপকরণ

১.      আল কুরআন

আলকুরআনে রয়েছে আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী, শক্তিমত্তা ও অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান।

এতে রয়েছে বিশ্বজাহান সম্পর্কে জ্ঞান।

এতে রয়েছে আল্লাহর বহুসংখ্যক সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান।

এতে রয়েছে মানুষ সৃষ্টির সূচনা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞান।

এতে রয়েছে পৃথিবীর অংগনে মানুষের কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান।

এতে রয়েছে মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে মৌলিক দিক নির্দেশনা।

এতে রয়েছে কোন জাতির উত্থান সম্পর্কে জ্ঞান।

এতে রয়েছে আল্লাহর নাফরমান জাতিগুলোর ধ্বংস-প্রাপ্তির বিবরণ।

এতে রয়েছে মহাবিশ্বের ধ্বংস-প্রাপ্তি এবং নতুন বিন্যাসে নতুন মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান।

এতে রয়েছে মানব জীবনের অনন্ত অধ্যায় সম্পর্কে জ্ঞান।

আলকুরআন জ্ঞানের বিশাল খনি।

মহামহিম আল্লাহ মানুষের কল্যাণের জন্যই এই বিশাল জ্ঞান-ভাণ্ডার নাযিল করেছেন।

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

… وَفَضْلُ كَلاَمِ اللهِ عَلى سَائِرِ الْكَلاَمِ كَفَضْلِ اللهِ عَلى خَلْقِه.

আবু সায়ীদ (রা)।

জামে আত্ তিরমিযী।

“এবং সমগ্র সৃষ্টির ওপর আল্লাহর যেমন শ্রেষ্ঠত্ব, সমস্ত কালামের ওপর আল্লাহর কালামেরও তেমনি শ্রেষ্ঠত্ব।”

অতএব আলকুরআনই হতে হবে জ্ঞান-চর্চার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

২.      আস্ সুন্নাহ

আলকুরআনের সূরা আল জুমুআর ২ নাম্বার আয়াতে এবং সূরা আলে ইমরানের ১৬৪  নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা) বড়ো বড়ো দু’টো কাজ উল্লেখ করেছেন এইভাবে :

وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ…

“এবং যাতে সে তাদেরকে “আলকিতাব” শিা দেয়, আর শিা দেয় “আলহিকমাত”।

এখানে “আলকিতাব” মানে আলকুরআন।

মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্যতম প্রধান কাজ ছিলো আল কুরআনেরই জ্ঞান সুস্পষ্টভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা।

তদুপরি আল কুরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপস্থাপন করাও তাঁর কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। আর আলকুরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও তাঁর মনগড়া ছিলো না। এই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীনই তাঁকে শিখিয়েছেন। এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

ثُمَّ اِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَه.

সূরা আল কিয়ামাহ ॥ ১৯

“অতপর এর অর্থ বুঝিয়ে দেয়া আমার দায়িত্ব।”

“আলহিকমাত” মানে “আস্ সুন্নাহ” অর্থাৎ আল কুরআনের প্রায়োগিক রূপ।

মুহাম্মাদুর  রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে আল কুরআনের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, এর বিভিন্ন বিধানের তাৎপর্য বুঝিয়ে দিয়েছেন, সেই নিরিখে একদল মানুষ গড়ে তুলেছেন এবং বিনির্মাণ করেছেন একটি অনুপম সমাজ।

তিনি তাহারাত, ছালাত, ছাওম, যাকাত, হাজ, দাওয়াত, পরিবার গঠন, রাষ্ট্রগঠন, শিক্ষা সম্প্রসারণ, আইন প্রণয়ন, বিচার-ফায়সালাকরণ, দণ্ডদান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, ভূমি ব্যবস্থা বিন্যস্তকরণ, সামরিক শক্তি অর্জন, যুদ্ধ পরিচালনা, সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে আলকুরআনে প্রদত্ত মূলনীতিগুলো বাস্তবায়ন করে আলকুরআনের প্রায়োগিক রূপ দেখিয়ে গেছেন।

অতএব আলকুরআনের পর আস্ সুন্নাহ-ই হতে হবে জ্ঞান-চর্চার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

৩.     অন্যান্য পাঠ্য পুস্তক

আলকুরআন ও আস্সুন্নাহর জ্ঞানের আলোকে জীবন দর্শন, ইতিহাস, ভূ-বিজ্ঞান, নভোবিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ধনবিজ্ঞান, ধন বিনিময়বিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, সমরবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের ওপর রচিত হতে হবে পাঠ্য-পুস্তক। প্রত্যেকটি পুস্তকের অন্তর্নিহিত ভাবধারা হতে হবে আল্লাহকেন্দ্রিকতা।

এইভাবে রচিত পাঠ্য পুস্তক হতে হবে জ্ঞান-চর্চার তৃতীয় উপকরণ।

৪.      ওডিও  ভিডিও উপকরণ

বিভিন্ন বিষয়কে অধিকতর সহজবোধ্য ও সুস্পষ্ট করে তোলার জন্য তৈরি হতে হবে নানা প্রকারের ওডিও ভিডিও উপকরণ। এইসব উপকরণ তৈরির সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে আলকুরআন ও আস্ সুন্নাহর নির্দেশিত সীমারেখা অতিক্রম করা না হয়।

এইভাবে তৈরি ওডিও  ভিডিও উপকরণ হতে হবে জ্ঞান-চর্চার চতুর্থ উপকরণ।

পারিবারিক শিক্ষা

“হোম স্কুলিং” বা গৃহে শিক্ষাদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই সম্পর্কে আলকুরআনের সূরা আল আহযাবের ৩৪ নাম্বার আয়াতে আমরা চমৎকার দিক-নির্দেশনা পাই।

আল্লাহ বলেন,

وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلى فِىْ بُيُوْتِكُنَّ مِنْ ايتِ اللهِ وَالْحِكْمَةِ ط

“আল্লাহর আয়াত” ও “আলহিকমাতের” যেইসব কথা তোমাদের গৃহে শুনানো হয় সেইগুলো স্মরণ রাখ, অন্যদের নিকট বর্ণনা কর।”

এই আয়াতটিতে নবী পতনীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর তাঁরাই তো ছিলেন আদর্শ পরিবারের সদস্যা। তাঁদেরকে আলকুরআন ও আস্সুন্নাহর জ্ঞান স্মরণ রাখা এবং অন্যদের নিকট তা বিতরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মহিলা অংগনে তাঁরাই ছিলেন শিকিা। বহু সংখ্যক মহিলা তাঁদের কাছ থেকে জ্ঞান হাছিল করেছেন। পর্দার বাইরে থেকে বহু সংখ্যক পুরুষও তাঁদের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করেছেন।

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সন্তানদেরকে সুশিতিরূপে গড়ে তোলার জন্য সাহাবীদেরকে তাকিদ করেছেন।

আল্লাহর রাসূলের (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাহাবীদের এক একটি বাড়িও এক একটি শিক্ষালয়ের মতো ছিলো। তাঁদের সন্তানেরা তাঁদের গৃহে তাঁদের কাছ থেকে, বিশেষ করে তাঁদের স্ত্রীদের কাছ থেকে, জ্ঞান অর্জন করতো।

প্রকৃতপে গৃহ-ই হওয়া চাই শিশুদের প্রাথমিক জ্ঞান হাছিলের আলয়।

কচি বয়সে শিশুদেরকে আম্মার সান্নিধ্য বঞ্চিত করে ফেলা সমীচীন নয়। সুপর্দ করা উচিত নয় ভাড়াটে আম্মার হাতে। আর এটা অনস্বীকার্য যে আম্মার চেয়ে বেশি আন্তরিক, বেশি যতœশীল, বেশি নিঃস্বার্থ ও বেশি দায়িত্বশীল শিক্ষীকা আর কেউ হতে পারেন না। এমন শিক্ষের এহেসিক্ত সান্নিধ্যেই শিশুরা সুষ্ঠুভাবে পেতে পারে তাদের অতীব প্রয়োজনীয় প্রাথমিক জ্ঞান।

প্রথম কয়েকটি বছর শিশুদেরকে আম্মার সান্নিধ্যে জ্ঞান চর্চার সুযোগ দেয়াই বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা

শিশুরা যখন বাল্যে উপনীত হয় তখন তাদেরকে জ্ঞান অর্জনের জন্য পাঠাতে হয় উপযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তখন তাদেরকে পরিবার বহির্ভূত শিকদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। জ্ঞান-চর্চার বিষয়ও হয় প্রসারিত।

  শিক্ষার স্তর

পৃথিবীর জীবনে মানুষের অবস্থানকাল খুবই সংপ্তি। অতএব কর্মজীবনের জন্য শিার্থীদেরকে তৈরি করতে লম্বা সময় নেয়া বিজ্ঞজনোচিত কাজ নয়। সেই জন্যই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাঁচ পাঁচটি বছর মেয়াদী তিনটি স্তরে সীমাবদ্ধ থাকা বাঞ্ছনীয়। এরপর আসবে স্পেশালাইজেশনের পর্যায়। মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা যেই বিষয়ে ভালো করার সম্ভাবনা, তাদেরকে সেই বিষয়ে স্পেশাল শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে তারা সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ রূপে গড়ে ওঠতে পারে।

  নারী শিক্ষা

পরিবার মানব সভ্যতার প্রথম বুনিয়াদ।

পরিবার একটি জাতির আদর্শিক দুর্গ।

কোন জাতির অন্য সব দুর্গ তছনছ হয়ে গেলেও পরিবার দুর্গগুলো যদি টিকে থাকে তাহলে সেই জাতি আবার স্বকীয়তা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

পরিবার পরবর্তী জেনারেশনকে গড়ে তোলার সবচে বেশি কার্যকর ত্রে।

সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন দুধের কৌটা পাঠান না। তিনি আম্মার বুকে দুধের ঝর্ণা সৃষ্টি করেন।

পরিবার পরিসরে আম্মার বুকের দুধ পান করে সন্তানেরা সবলদেহী ও রোগ প্রতিরোধ মতাসম্পন্নরূপে গড়ে ওঠে।

আম্মার বুকের দুধ পানকারী সন্তানেরা কৌটার দুধ পানকারী সন্তানের চেয়ে বেশি মেধাবী হয়ে থাকে।

আম্মার দুধ পান করতে পারাটা সন্তানের অধিকার। আর দু’বছর পর্যন্ত সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো আম্মার কর্তব্য।

অর্থাৎ পরবর্তী জেনারেশনকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা ও অবদান বিরাট।

নারীরা যাতে তাঁদের সুদূর প্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে পারেন সেই জন্য তাঁদেরকে সুশিক্ষত করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

সু-স্ত্রী, সু-জননী, সু-গৃহিনী, সু-আত্মীয়া এবং সু-প্রতিবেশিনী রূপে কর্তব্য পালন করতে হলে তাঁদের অবশ্যই উন্নত মানের শিা চাই।

নারীরা দৈহিক শক্তির দিক থেকে পুরুষদের সমক নন। দৈহিক শক্তির এই তারতম্য আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। এর মানে হচ্ছে, যেইসব কাজ কঠোর পরিশ্রম দাবি করে সেইসব কাজ আল্লাহ নারীর ওপর চাপাতে চান না।

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন সমাজ ভাংগা ও গড়ার প্রত্যক্ষ দায়িত্ব পুরুষদের ওপর ন্যস্ত করেছেন। আর যেইসব পুরুষেরা সমাজ ভাংগা ও গড়ার ক্ষেত্রে লড়াকুর ভূমিকা পালন করবেন তাঁদেরকে গড়ার দায়িত্ব দিয়েছেন নারীকে।

সমাজ ভাংগা ও গড়ার প্রথম শ্রেণীর লড়াকু ব্যক্তি ছিলেন নবী-রাসূলগণ। তাঁদের সকলেই ছিলেন পুরুষ। আবার এই লড়াকু ব্যক্তিদেরকে লালন পালন করে যাঁরা সমাজ অংগনে উপহার দিয়েছেন তাঁরা ছিলেন নারী। আর নারী যাতে এই সুমহান কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারেন সেই জন্যই আল্লাহ বলেন,

وَقَرْنَ فِىْ بُيُوْتِكُنَّ.

সূরা আল আহযাব ॥ ৩৩

“তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান কর।”

অনেকেই নারীদের গৃহকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকাকে নারীদের জন্যে অবমাননার বিষয় বলে মনে করেন।

আসলে গৃহ পরিসরে অবস্থান করেই সমাজ ও সভ্যতায় নারী যেই সুদূর প্রসারী ফলপ্রসূ ও মূল্যবান অবদান রাখেন তা বুঝতে হলে গভীর চিন্তা প্রয়োজন। সূক্ষ্ম জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরাই এর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেন, স্থুলবুদ্ধিসম্পন্ন লোকদের পে তা উপলব্ধি করা আদৌ সম্ভবপর নয়।

গৃহ-বহির্ভূত কাজের জন্য উপযুক্ত ঐসব নারী যাদের সন্তান হয় না অথবা যাঁরা সন্তান হওয়ার বয়স পেরিয়ে গেছেন।

হাঁ, আরেক ধরনের নারী বাইরের কাজে অংশ নিতে পারেন। তাঁরা হচ্ছেন ঐসব নারী যাঁরা জন্ম-নিয়ন্ত্রণ উপরকণ ব্যবহার করেন, যাতে সন্তান জন্ম নিয়ে তাঁদের বাইরের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে।

কিন্তু জন্ম নিয়ন্ত্রণ নারীদের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য্যরে জন্য তিকর। তদুপরি জন্ম নিয়ন্ত্রণ মানব বংশ বৃদ্ধির লক্ষে আল্লাহর সৃষ্টি পরিকল্পনায় অনভিপ্রেত হস্তপেক্ষ।

পৃথিবীব্যাপী গৃহ-বহির্ভূত অংগনে কর্মরত নারীদের অবস্থা এই কথারই স্যা বহন করে যে নারীরা তাঁদের স্বাভাবিক কর্মত্রে থেকে বেরিয়ে এসে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ক্ষতিগ্রস্তই হয়ে থাকেন।

নারী ও পুরুষের গঠন-প্রকৃতির পার্থক্য, দৈহিক শক্তির তারতম্য, তাঁদের স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্রের দাবি ইত্যাদি দিক বিবেচনা করে তাঁদের জন্য পৃথক পাঠ্য বিষয় নির্ধারণ করাই বিজ্ঞতার দাবি।

তদুপরি ‘আলহিজাবের’ নির্দেশ কার্যকর করার জন্য সহ-শিক্ষা নয়, পৃথক শিক্ষার ব্যবস্থা করাও বিজ্ঞতার দাবি।

নারীদেরকে আলকুরআন ও আস্সুন্নাহর জ্ঞানের সাথে সাথে বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষ করে জীবনদর্শন, ইতিহাস, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, ধাত্রীবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, গার্হস্থ্য অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান দান করা প্রয়োজন।

সর্বজনীনশিক্ষা

শিক্ষা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন।

যাঁদের জ্ঞান নেই তাঁদের কর্তব্য জ্ঞানবান ব্যক্তিদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। যাঁরা জ্ঞানবান তাঁদের কর্তব্য যাঁদের জ্ঞান নেই তাঁদের কাছে জ্ঞান বিতরণ করা।

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন কর্তৃক নাযিলকৃত সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল কুরআনে প্রদত্ত সর্ব প্রথম নির্দেশই হলো “ইক্রা” অর্থাৎ পড় বা জ্ঞান-চর্চা কর।

সূরা আয্যুমারের ৯ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেন,

قُلْ هَلْ يَسْتَوِى الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لاَيَعْلَمُوْنَ.

“বল, যারা জানে আর যারা জানেনা তারা কি সমান?”

অর্থাৎ সমান নয়।

অতএব সকলেরই উচিত জ্ঞান অর্জনের জন্য চেষ্টা করা।

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

طَلَبُ العِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلى كُلِّ مُسْلِمٍ.

আবদুল্লাহ (রা), আবু হুরাইরা (রা.)।

মুসনাদে ইমাম আবু হানীফা (রহ)।

“সকল মুসলিমের জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করা ফারয।”

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْانَ وَعَلَّمَهُ.

উসমান ইবনু আফফান (রা)।

ছাহীহ আল বুখারী, জামে আত তিরমিযী, ছাহীহ মুসলিম, সুনানু আন নাসায়ী, সুনানু ইবনু মাজাহ, সুনানু আবীদাউদ।

“তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে আলকুরআন শেখে এবং অপরকে তা শেখায়।”

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

مَنْ سَلَكَ طَرِيْقًا يَّلْتَمِسُ فِيْهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيْقًا اِلَى الْجَنَّةِ.

আবু হুরাইরা (রা)।

ছাহীহ মুসলিম।

“যেই ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য পথ চলে, আল্লাহ তার জান্নাতে যাবার পথ সহজ করে দেন।”

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

مَنْ خَرَجَ فِىْ طَلَبِ الْعِلْمِ كَانَ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ حَتّى يَرْجِعَ.

আনাস ইবনু মালিক (রা)

জামে আত তিরমিযী।

“যেই ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য পথে বের হয়, ফিরে না আসা পর্যন্ত সে আল্লাহর পথে অবস্থান করতে থাকে।”

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

… اِنَّ اللهَ وَمَلئِكَتَهُ وَاَهْلَ السَّموتِ وَالاَرْضِ حَتّى النَّمْلَةَ فِىْ جُحْرِهَا وَحَتّى الْحُوْتَ لَيُصَلُّوْنَ عَلى مُعَلِّمِى النَّاسِ الْخَيْرِ.

আবু উমামাহ (রা)।

জামে আত তিরমিযী।

“… অবশ্যই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, আসমান ও পৃথিবীর অধিবাসীবৃন্দ, এমন কি গর্তের পিঁপড়া, এমনকি পানির মাছ ঐ ব্যক্তির জন্য দুআ করতে থাকে যেই ব্যক্তি লোকদেরকে কল্যাণকর জ্ঞান শিক্ষা দেয়।”

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

بَلَّغُوْا عَنِّىْ وَلَوْ ايَةً.

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা)।

ছাহীহ আল বুখারী।

“আমার কাছ থেকে একটি কথা শিখে থাকলেও তা লোকদের নিকট পৌঁছাও।”

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

نَضّرَ اللهُ اِمْرَءً سَمِعَ مِنَّا شَيْئًا فَبَلَّغَهُ كَمَا سَمِعَهُ.

আবদুল্লাহ ইবনু মাস’উদ (রা)।

জামে আত তিরমিযী।

“আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে তরতাজা করেন যেই ব্যক্তি আমাদের কাছ থেকে কোন জ্ঞানের কথা শুনে তা হুবহু অন্যের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়।”

আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

مَن سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ فَكَتَمَهُ اُلْجِمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِلِجَامٍ مِّنَ النَّارِ.

আবু হুরাইরা (রা)।

জামে আত তিরমিযী, সুনানু আবী দাউদ।

“যেই ব্যক্তিকে কোন ইল্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় আর সে তা গোপন রাখে, কিয়ামাতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরানো হবে।”

এইভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে জ্ঞান অর্জন এবং জ্ঞান বিতরণের তাকিদ করেছেন। আল্লাহর রাসূলের (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শাসনকালে প্রতিটি মাসজিদও ছিলো জ্ঞান-চর্চাকেন্দ্র।

আল খুলাফাউর রাশিদূনের শাসনকালে শিক্ষার আরো বিস্তৃতি ঘটে।

সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে শিক নিযুক্ত হন। বলিষ্ঠ প্রয়াস চালানো হয় যাতে একজন ব্যক্তিও জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত না থাকেন।

আসহাবে রাসূলের কর্মধারাকে নানাভাবে মূল্যায়ন করা যায়। এক মূল্যায়নে বলা যায়, তাঁরা ছিলেন ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবাহিনী।

সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান ছিলো অসাধারণ।

শিক্ষা লাভ মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। কোন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া চাই যাতে একজন মানুষও এই অধিকারবঞ্চিত না থাকেন।

অবৈতনিকশিক্ষা

নতুন প্রজন্ম একটি পরিবারের জন্য আপদ নয়, সম্পদ।

নতুন প্রজন্ম একটি দেশের জন্যও আপদ নয়, সম্পদ।

অতএব নতুন প্রজন্মের মেধার বিকাশসাধন, তাদের মাঝে দতা সৃষ্টি, তাদের চরিত্র গঠন এবং তাদেরকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে গড়ে তোলা যেমনি পরিবারের কর্তব্য, তেমনি কর্তব্য রাষ্ট্রের।

আগামী দিনগুলোতে যারা বর্তমান প্রজন্মের স্থলাভিষিক্ত হবে তাদেরকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা বর্তমান প্রজন্মের অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্তব্য।

নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের থাকে বিরাট ভূমিকা।

জ্ঞান কোন পণ্য নয়।

অতএব শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করে তাদের কাছে জ্ঞান বিক্রয় করা অন্যায়।

বর্তমান প্রজন্মের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করা নতুন প্রজন্মের অধিকার।

আর নতুন প্রজন্মকে জ্ঞান-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা বর্তমান প্রজন্মের কর্তব্য।

আর এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকাই হবে প্রধান।

রাষ্ট্র শিকদের বেতন দেবে।

রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষার উপকরণ দেবে। রাষ্ট্র কাক্সিত শিক্ষাব্যবস্থা উদ্ভাবন করে শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে শিক্ষা লাভের সুযোগ করে দেবে।

অর্থাৎ শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ অবৈতনিক।

 শিক্ষ রিক্রুটমেন্ট

শিক রিক্রুটমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সঠিক মানের শিক্ষক রিক্রুটেড না হলে শিক্ষাঙ্গনে নানাবিধ অনাকাক্সিত পরিস্থিতির উদ্ভব অবশ্যম্ভাবী।

আদর্শ শিক্ষাঙ্গন গড়ে তুলতে হলে চাই আদর্শ শিক। একজন আদর্শ শিক্ষক হবেন আলকুরআন ও আস্ সুন্নাহর জ্ঞান-সমৃদ্ধ।

তিনি হবেন অনাবিল চরিত্রের অধিকারী।

তাঁর ব্যবহার হবে অমায়িক।

তাঁকে হতে হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারদর্শী।

শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনি হবেন সহনশীল।

তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রুচিশীল।

তাঁর মেজাযে থাকবে ভারসাম্য।

সকল শিক্ষার্থীর প্রতি তিনি সমান দৃষ্টি দেবেন।

কারো প্রতি তিনি পপাতিত্ব করবেন না।

কারো প্রতি তিনি বৈরী মনোভাবাপন্ন হবেন না।

তাঁকে হতে হবে মনোবিজ্ঞানী।

তাঁকে হতে হবে শিক্ষাদানে পটু।

সময়ানুবর্তিতা হবে তাঁর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

তাঁর জীবন হবে সুশৃংখল।

তিনি হবেন বিশুদ্ধভাষী।

তিনি হবেন সু-বক্তা।

তিনি হবে বিজ্ঞ আলোচক।

সকল কাজেই তাঁর থাকবে অগ্রণী ভূমিকা।

তিনি হবেন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব।

সঠিক অর্থে আমানাতদার।

তিনি হবেন শিক্ষার্থীদের প্রেরণার  উৎস।

তিনি যেখানেই যাবেন সেখানেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেবেন।

এইসব গুণ-সম্পন্ন শিকই আদর্শ শিক। এমন শিকই তো হতে পারেন আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর।

অতএব এইসব দিক বিবেচনা করেই শিক রিক্রুটমেন্ট করা প্রয়োজন।

শিক্ষাঙ্গন

১.      মাসজিদ

শিক্ষাঙ্গনে থাকা চাই একটি সুপরিসর মাসজিদ যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বচ্ছন্দে ছালাত আদায় করতে পারবেন।

২.      লাইব্রেরী ও পাঠাগার

শিক্ষাঙ্গনে থাকা প্রয়োজন একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরী এবং সুপরিসর পাঠাগার  যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিবিষ্টমনে জ্ঞান চর্চা করতে পারবেন।

৩.     বিজ্ঞান গবেষণাগার

শিক্ষাঙ্গনে থাকা চাই একটি উন্নতমানের বিজ্ঞান গবেষণাগার যেখানে বহুসংখ্যক শিক্ষার্থী একই সময়ে প্র্যাকটিকেল ওয়ার্ক করতে পারবেন।

৪.      পর্যাপ্ত সংখ্যক কাস রুম

শিক্ষাঙ্গনে পর্যাপ্ত সংখ্যক কাসরুম থাকা চাই যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বচ্ছন্দে পাঠ গ্রহণ করবেন।

৫.      ওডিটোরিয়াম

শিক্ষাঙ্গনে একটি সুপরিসর ওডিটোরিয়াম থাকা প্রয়োজন যেখানে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কিরায়াত প্রতিযোগিতা, দারসুল কুরআন অনুশীলন, দারসুল হাদীস অনুশীলন, বক্তৃতা অনুশীলন, রচনা প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, সুন্দর হস্তার প্রতিযোগিতা, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হবে।

৬.     শরীর চর্চার স্থান

শরীর চর্চার জন্যও সু-বি¯তৃত স্থান থাকা প্রয়োজন।

৭.     পার্কিং শেড

যানবাহন রাখার জন্য একটি সুপরিসর পার্কিং শেড থাকা প্রয়োজন।

৮.     পর্যাপ্ত সংখ্যক টয়লেট

সাধারণ ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক টয়লেট থাকা প্রয়োজন যাতে বহু সংখ্যক শিক্ষার্থী একই সময় তাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন।

৯.      ফার্স্ট এইড রুম

একটি ফার্স্ট এইড রুম থাকা প্রয়োজন যেখানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ঔষধাদি থাকবে।

১০.    প্রশাসনিক

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, শিকবৃন্দ ও অফিস কর্মচারীদের জন্য সংলগ্ন বাথরুমসহ স্বতন্ত্র রুম থাকা প্রয়োজন। তদুপরি রেকর্ডপত্র সংরণের জন্য সুরতি রুমও থাকা প্রয়োজন।

১১.    ওয়েটিং রুম

বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও অন্যান্য ভিজিটার শিক্ষাঙ্গনে এসে থাকেন। তাঁদের সুবিধার্থে সংলগ্ন বাথরুমসহ একটি সুপরিসর ওয়েটিং রুম থাকা প্রয়োজন।

১২.    ক্যান্টিন

শুধু শিক্ষাঙ্গনের লোকদের জন্যেই একটি পরিচ্ছন্ন ক্যান্টিন থাকা চাই।

ক্যান্টিনে যাতে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য ও পানীয় পরিবেশিত হয় তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

১৩.    পাহারা

শিক্ষাঙ্গনে থাকা চাই বেশ কিছু সংখ্যক চৌকস পাহারাদার। দিনের মতো রাতেও পর্যাপ্ত সংখ্যক পাহারাদার নিয়োজিত থাকা প্রয়োজন।

১৪.    দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ

শিক্ষাঙ্গনের গোটা পরিবেশ হওয়া চাই দৃষ্টিনন্দন।

পরিকল্পিত সবুজ চত্বর ও ফুল বাগান শিক্ষাঙ্গনের সৌন্দর্য নিশ্চিত করতে পারে।

শিক্ষাঙ্গনের এক দিক থেকে অন্য দিকে যাবার ফুটপাতগুলো হতে হবে সু-সমতল ও সুন্দরভাবে তৈরি।

শিক্ষাঙ্গনের কোথাও নোংরা কিছু বা দুর্গন্ধযুক্ত কিছু থাকবে না।

সব কিছুই থাকবে পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন।

  শিক্ষার মাধ্যম

মাতৃ-ভাষাই হবে শিক্ষার মাধ্যম ।

তবে জীবন ও জগতের নির্ভুল জ্ঞানের উৎস আলকুরআন যেহেতু আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে, সেহেতু আরবী ভাষাও শেখাতে হবে শিক্ষার্থীদেরকে।

তদুপরি যেই সকল ভাষা পৃথিবীর সুবিস্তৃত অঞ্চলে পরিচিত ও প্রচলিত, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তার পছন্দ অনুযায়ী সেইগুলোর যেই কোন একটি শিখবার সুযোগ করে দিতে হবে।

  শিক্ষা গবেষণা

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন জ্ঞানময় সত্তা।

তিনি মানুষকে জ্ঞান দিয়ে ধন্য করেছেন।

সন্দেহ নেই, মানুষের জ্ঞান সর্বজ্ঞানী আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় কিছুই নয়। কিন্তু অপরাপর সৃষ্টির চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন মানুষকেই বেশি জ্ঞান দিয়েছেন।

আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীন মানুষকে চিন্তাশক্তি দান করেছেন। এই চিন্তাশক্তি ব্যবহার করে মানুষ একের পর এক পৃথিবী ও আসমানের বহু কিছুর সংগে পরিচিত হচ্ছে, এইগুলোকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি  উদ্ভাবন করছে। এইভাবে প্রতিনিয়ত জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। লক্ষ্যণীয় যে জীব ও বস্তুজগতকে নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে মানুষ এমন সব তথ্য ও উপাত্তের সাথে পরিচিত হচ্ছে যেইগুলো নতুন করে আলকুরআনের বক্তব্যের সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

জ্ঞান-চর্চার পরিমণ্ডলে নতুন কিসব বিষয় সংযোজিত হলো, সেইগুলোকে শিা ব্যবস্থায় কিভাবে সন্নিবেশিত করা যায়, পুরোনো কোন্ কোন্ বিষয় বর্তমান প্রোপটে আর প্রয়োজনীয় নয়, কোন্ কোন্ নতুন বিষয় সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, কিভাবে রচিত হওয়া চাই নতুন পাঠ্যপুস্তক, স্বল্প সময়ে সহজবোধ্যভাবে জ্ঞান বিতরণের জন্য কোন্ কোন্ প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরী, শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞানের মান মূল্যায়নের জন্য কী পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়, শিক্ষকদেরকে পারদর্শী শিক্ষকরূপে গড়ে তোলার জন্য কী কী পদপেক্ষ গ্রহণ করা উচিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনাকে আরো উন্নত করার জন্য কী কী করা প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা চালাবার জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট থাকা অত্যাবশ্যক।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s