ধারাবাহিক উপন্যাস আলো-আঁধারের খেলা

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

জুবায়ের হুসাইন

(এক)
‘কা-কা-কা-’ বার তিনেক ডেকে উঠল কাকটা।
‘কা-কা-’ সাড়া দিল সঙ্গী কাকটা।
মাথাটা বাঁ দিকে ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন মোকাব্বর হোসেন। ওয়ালে বালিশে হেলান দিয়ে পা দু’টো ছড়িয়ে খাটে বসে ছিলেন তিনি। পাশের বিল্ডিংটার ছাদে দু’টো কাক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এক্ষণে মাথা নাড়িয়ে একে অপরকে কিছু একটা বলছে। যেন কোনো বিষয়ে বোঝাপড়া চলছে তাদের মধ্যে।
এক দৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থাকায় ঘাড়টা ব্যথা করে উঠল মোকাব্বর হোসেনের। চোখটাও জ্বালা করছে। ঘাড় ফিরিয়ে নিলেন সেদিক থেকে। তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না ওভাবে। এবার হেলান দেয়া থেকে সোজা হয়ে বসে পুরোপুরিই জানালার দিকে ঘুরে গেলেন। হ্যাঁ, পূর্ণ দৃষ্টিতে কাক দু’টোকে দেখা যাচ্ছে এবার।
চমৎকার ভঙ্গিতে মাথা দু’টো ওঠানো নামানো করছে কাক দু’টো। কেমন একটা ছন্দ আছে যেন তাতে। পাতলা একটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল মোকাব্বর হোসেনের চেহারায়।
হঠাৎ একটা কাক পাশ থেকে কিছু একটা দু’ঠোঁটের মাঝখানে উঠিয়ে নিল। দু’পায়ের উপর লাফিয়ে চারপাশটা ঘুরে নিল একবার। তারপর সিঁড়ির মাথায় যেখানটাতে ওয়াল একটু উঁচু করে গাঁথা, তার গোড়ায় চলে গেল, লাফিয়ে। ঠোঁটের জিনিসটা রেখে দিল ওখানে। অন্য কাকটাও লাফিয়ে ওটার কাছে গিয়ে হাজির হলো।
মোকাব্বর হোসেনের দৃষ্টিটা কেমন যেন ঝাঁপসা হয়ে গেল। চোখের সামনে যেন আছড়ে পড়ল কিছু দৃশ্য। এই মুহূর্তে তিনি চলে গেছেন তার কিশোর বয়সের কোনো এক ধূসর বিকেলে। বিকেলটা চমৎকার। বাড়ির পেছনে পুকুর এবং পুকুরের পর নদী থাকায় বিকেলটা হয়ে উঠেছিল অন্যরকম। পড়ন্ত সূর্যের গোলাপি আভাটা ছড়িয়ে পড়েছে পুকুর পাড়ের বাতাবী লেবু গাছে ঝুলে থাকা অর্ধ পাকা লেবুতে। পানিতেও সুন্দর একটা আবছায়া তৈরি হয়েছে তাতে।
শোবার ঘরটা দক্ষিণমুখো হওয়ায় পুকুর ও নদী দু’টোই দেখা যায় বারান্দায় বসলে। অবশ্য ক্রমে ওদিকটায় গাছপালা ও বাড়িঘর উঠে যাচ্ছে। ফলে আগের মতো আর প্রাকৃতিক দৃশ্য ইচ্ছা করলেই বারান্দায় বসে উপভোগ করা যায় না।
গোয়াল ঘরটা ওই পুকুরের দিকেই। গোলপাতার ছাউনি। মাটির দেয়াল। ওই গোয়াল ঘরের চালার উপরেই কাকটা ঠোঁটে করে কিছু একটা নিয়ে উড়ে এসে বসল। কাকটা এদিকেই মুখ করে আছে। ওটার বন্ধ চোখ স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে মোকাব্বর হোসেন। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই চালার ফাঁকে গুঁজে দিল জিনিসটা। তারপর ‘কা-কা’ করে দু’টো ডাক ছাড়ল। আনন্দের না সফলতার তা বুঝলেন না তিনি। বুঝলেন না কাকটা কেন চোখ বন্ধ করে জিনিসটা লুকালো।
বারান্দায় বসে এসবই দেখছিল সে। একটু ভাবুক হয়ে উঠেছিল বিষয়টা নিয়ে। তাই কখন তার আব্বা সাইকেল চালিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন সামনে তা খেয়াল করেনি।
মোকাব্বর হোসেনের আব্বা মোদাব্বর হোসেন ছেলেকে এই অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রে বাবা, কী দেখতিছিস ওইরম করে?’
উঠে দাঁড়াল মোকাব্বর হোসেন। বারান্দা থেকে নেমে আব্বার কাছ থেকে বাই সাইকেলটা নিয়ে ঠেলে বারান্দায় উঠিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখল। বলল, ‘না, কিছু না। গোল (গোয়াল) ঘরের চালের উপরে কাকটা কী যেন সেরে (লুকিয়ে) রাখল। কিন্তু জানেন আব্বা, কাকটা যখন জিনিসটা সেরে রাখল, তখন ওর চোখ দু’টো বন্ধ ছিল!’ শেষের কথাটায় কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ পেল মোকাব্বর হোসেনের।
আব্বা ততক্ষণে একটা পিড়িতে বসে পড়েছেন। কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা গামছাটা দিয়ে মু-গলা-ঘাড় মুছলেন। হাসলেন একটু। বললেন, ‘ও, এই ব্যাপার? শোনো, কাকরা যখন কিছু সেরে রাখে, তখন চোখ দু’টো বন্ধ করেই তবে রাখে। বিশেষ করে খাবার সেরে রাকতি গিলি ওরা এই কাজ করে।’
‘চোখ বন্ধ করে কেন খাবার সারে আব্বা?’
আব্বা আবারও হাসলেন। সাদা লম্বা চাপ দাড়ি, মাথায় কাচা-পাকা চুল। হাসলে বেশ সুন্দর লাগে আব্বাকে। বললেন, ‘পাশে বোসো, কচ্ছি (বলছি)।’
আব্বার পাশে বসতে বরাবরই অস্বস্তি বোধ করে মোকাব্বর হোসেন। আব্বার বিশালত্বের কাছে নিজেকে বেশ ুদ্র মনে হয় নিজেকে। আসলে আব্বাকে ও যেমনি শ্রদ্ধা ও ভক্তি করে, তেমনি তার মতো ব্যক্তিত্বের পাশে নিজেকে কখনোই সামন্তরাল ভাবতে পারে না সে। তারপরও বসে, একটু দূরত্ব রেখেই, অনেকটা জবুথবু হয়ে।
আব্বার গায়ের ঘ্রাণ পাচ্ছে মোকাব্বর। যখনই আব্বার পাশে আসে, তখনই পায় এই ঘ্রাণ। বেশ ভালো লাগে তার।
‘ওরা চোখ বন্ধ করে খাবার সারে এই কারণে যে, ওরা মনে করে ওরা যখন চোখ বুজেই খাবার সেরে থোচ্ছে (রাখছে), অন্যরাও তা দেখতি পাচ্ছে না।’
‘সত্যিই তাই?’ অবাক হয় মোকাব্বর হোসেন। ‘কিন্তু আব্বা, আমি যে দেখিতি পারিছি!’
‘আরে বুকা (বোকা), এই জন্যিই তো ওরা কাকা, আর আমরা মানুষ। মজার কথা হচ্ছেগে, ওরা তো খাবার সেরে রেখে চলে গেল, পরে যখন খাবারের প্রয়োজন পড়ে, তখন কিন্তু ম্যালা খুঁজেও আর সেরে থুয়া খাবার পায় না। পাবে কী করে? সেরে থুয়ার সুমায় তো আর দেখে রাখিনি কনে রাখছে! হা-হা-হা- কত বেকুপ কাকগুলো।’
আব্বা হাসতেই থাকেন। মোকাব্বার হোসেন একবার আব্বার দিকে একবার গোয়াল ঘরের চালার দিকে তাকায়।
আব্বা বেশ সুন্দর করে কথা বলেন। ভালো লাগে তার।
উঠে যান আব্বা। গামছা কাঁধে ফেলে কলপাড়ে যান। মাগরিবের আজান হবে একটু পর। ওজু করে মসজিদে যাবেন তিনি।
কাকের এই বিষয়টা মাথার মধ্যে কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছিল মোকাব্বর হোসেনের। তাই পরদিন বিকেলেও একই জায়গায় একইভাবে বসে রইল। আশায় রইল, আজ নিশ্চয়ই কাকের লুকিয়ে রাখা খাবারের প্রয়োজন পড়বে। সে দেখতে চায়, সত্যিই কাক তার লুকিয়ে রাখা খাবার খুঁজে পায় কি না।
মজনুরা খেলতে ডেকেছিল তাকে। সে যায়নি। বসে আছে বারান্দায়। দৃষ্টি সামনের গোয়াল ঘরের চালার ওপর।
মা টুকটাক কাজ নিয়ে ব্যস্ত। ছেলেকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘অপর বেলায় (অবেলায়) বারান্দায় বসি রইছিস যে বড়! খেলতি যাবিনে?’
‘আজ খেলব না।’ জবাব দেয় সে।
মা আর কিছু না বলে নিজের কাজে মন দেন।
দূর! কাকটা আজ বুঝি আর খাবারের খোঁজে আসবে না। ভাবে সে। ওদিকে সন্ধ্যা প্রায় হয় হয়। হাত-মুখ ধুয়ে, ওজু করে নামাজ সেরে পড়তে বসতে হবে। খেলার মাঠ থেকে ফিরবে ছোট ভাই মোনাব্বর হোসেন। তাকে নিয়ে হারিকেনের আলোয় বারান্দায় খেজুর পাতার বিছানা পেতে পড়তে বসা তাদের রুটিন কাজ।
উঠতে যাবে মোকাব্বর হোসেন, এই সময় গোয়াল ঘরের চালের ওপর উড়ে এসে বসল একটা কাক। হ্যাঁ, গতকালের সেই কাকটাই। কৌতূহল চকচক করে উঠল তার চোখেমুখে। উৎসুক নিয়ে তাকিয়ে রইল ওদিকে।
ঠিকই, কাকটা গতকাল লুকিয়ে রেখে যাওয়া খাবারই খুঁজছে। কিন্তু পাবে কী করে সে খাবার? কোথায় লুকিয়েছে তা তো দেখেনি নিজে। তাই কিছুক্ষণ ‘কা-কা-কা-’ কর্কশ ডাক ছেড়ে চালের এ মাথা ও মাথা লাফালাফি করে একসময় উড়ে গিয়ে পাশের নিম গাছটার ডালে বসল।
উঠে দাঁড়াল মোকাব্বর হোসেন। খুশিতে চিকচিক করে উঠল তার সমস্ত মুখমণ্ডল। আব্বা ঠিকই বলেছেন। আব্বার প্রতি শ্রদ্ধা আরও বৃদ্ধি পেল তার। সেই সাথে বুকটাও যেন গর্বে একটু ফুলে উঠল।
ঝম ঝম একটা শব্দ কানে আসছে মোকাব্বর হোসেনের। চোখেমুখে ঠাণ্ডা পানির ছিটাও লাগছে।
বাস্তবে ফিরে এলেন তিনি। জানালার বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। নারকেল গাছটার পাতায় পড়ছে বৃষ্টির ফোটা। পাতাটা কেমন একটু ঝুকে পড়েছে। আর ওপাশের ছাদটায় কাক দু’টো তখনও আছে। ডানা ঝুলিয়ে একঠাঁই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে।

দুই.
‘খালুজান, চা দিমু?’ কাজের মেয়েটা দরজায় উঁকি দিল।
ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন মোকাব্বর হোসেন। আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। মুখে কিছু বললেন না।
কাজের মেয়েটা এখনও দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারছে না কী করবে। হ্যাঁ-না কোনো জবাব দেননি খালুজান।
আট-নয় বছরের মতো বয়স হবে মেয়েটির। এ বাড়ির রান্না-বাড়াসহ প্রায় সকল কাজই তাকে করতে হয়। বাড়ির কর্তা মোতালেব হোসেন ব্যাংকে চাকরি করেন। সকাল ৯টা টু সন্ধ্যা ৭টা অফিস। গৃহকর্তৃ সালমা বানু একটি বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ম্যাথের টিচার। সকাল ৮টায় বের হন, ফেরেন সন্ধ্যা মাথায় নিয়ে। আর মোতালেব হোসেন ও সালমা বানুর একমাত্র সন্তান সাইমা ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। সেও বের হয় সকালে আর ফেরে শেষ বিকেলে।
এখন বিকেল ছুঁই ছুঁই। একটু পরেই ফিরবে সাইমা, মোকাব্বর হোসেনের নাতনী। সে ফেরার আগ পর্যন্ত তার সমস্ত দায়-দায়িত্ব কাজের মেয়েটার। ওর নাম টুকটুকি। অবশ্য বাড়ির সবাই টুকু বলেই ডাকে। এতে ও প্রথম প্রথম কিছুটা আপত্তি করলেও এখন আর করে না। নামটাকে ও মেনেই নিয়েছে।
‘খালুজান কি অন্য কিছু খাবেন?’ আবার জিজ্ঞেস করল টুকু।
‘বাইরে বিষ্টি হচ্ছে, তাই না?’ টুকুর কথার কোনো জবাব না দিয়েই পাল্টা প্রশ্ন করলেন মোকাব্বর হোসেন।
‘হ, ম্যালা বিষ্টি হইতাছে।’ জবাব দিল টুকু।
‘সাইমা এখনো ফিরিনি (ফেরেনি)’
‘ফিরলি তো দেকতিই পারতেন।’
‘তুই বড্ড কথা কস!’ কিছুটা বিরক্তি ঝরে পড়ে মোকাব্বর হোসেনের কণ্ঠে। ‘যা সামনে থেকে।’
‘আচ্ছা,’ বলে দরজা থেকে সরে যায় টুকটুকি।
মোকাব্বর হোসেন আবার একা হয়ে পড়েন। আনমনা হয়ে যান।
বাইরে একটানা বৃষ্টি হয়েইে চলেছে।
‘দাদুভাই,’ দরজা দিয়ে একপ্রকার ছুটেই প্রবেশ করল সাইমা। সবে কলেজ থেকে ফিরেছে। এখনও স্কুল ড্রেস পরে আছে। দড়াম করে বসল মোকাব্বর হোসেনের পাশে।
‘ও এসেছ দাদু?’ বললেন মোকাব্বর হোসেন। ‘বিষ্টিতি ভেজোনি তো?’
‘না দাদুভাই।’ বলল সাইমা। ‘আব্বুর গাড়ি আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে।’
‘টুকু? টুকু? এই টুকটুকি?’ গলা চড়িয়ে ডাকলেন মোকাব্বর হোসেন।
‘টুকুকে ডাকছ কেন দাদু?’
‘তোমাকে নাশতা দেবে না? সারাদিন না খেয়ে কত কষ্ট পেয়েছ। ভুক লাগিনি তোমার?’
‘তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না দাদুভাই। আম্মু ফিরলে একসাথেই নাশতা করব। দেখেছ দাদু, বাইরে কী সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে।’
‘হ্যাঁ দাদু, আমি জানলা দিয়ে তো বিষ্টিই দেকতিছিলাম।’
‘গ্রামের বৃষ্টি এর চেয়ে অনেক সুন্দর, তাই না দাদুভাই?’
‘তা তো একটু সুন্দর হবেই। এই দেখ না, তুমাদের এই শহরে জানলা দিয়ে বিষ্টি দেকতি হয়। আর আমাদের গিরাম হলি তো ইচ্ছে কল্লিই উঠানে নেমে বিষ্টিতি ভিজা যায়।’
‘ও দাদুভাই, তোমার কথা শুনে তো আমার বৃষ্টিতে ভিজতে লোভ হচ্ছে। কিন্তু দাদু, বৃষ্টি আমার একদম সহ্য হয় না, মাথায় একটুখানি বৃষ্টির পানি পড়লেই নাক দিয়ে অনর্গল পানি ঝরতে থাকে। একটু বেশি পানি পড়লে তো জ্বরই এসে যায়।’
‘কিন্তু দেখ দাদু, আমাদের গিরামের মানুষদের বিষ্টির পানিতি কিছুই হয় না। জ্বর-সর্দি ওসব তুমাদের শহরের মানুষদের জন্যি। আরে বর্ষাকালে বিষ্টিতি না ভিজলি বর্ষার মজা পাওয়া যায় নাকি?’
‘ও দাদুভাই, বলো না গ্রামের বর্ষার গল্প!’ মোকাব্বর হোসেনের গলা জড়িয়ে ধরে আবদার জুড়ে দেয় সাইমা।
মোকাব্বর হোসনেও ফেলতে পারেন না নাতনীর আবদার। শুরু করেন গল্প। বাস্তব জীবনের গল্প। তার নিজের জীবনের গল্প। সংগ্রামী জীবনের গল্প। সে গল্পের প্রতিটি ভাজে ভাজে মোকাব্বর হোসেনের স্মৃতিগুলো হেঁটে বেড়ায়। তিনি কেমন যেন হয়ে যান।
মোকাব্বর হোসেন তার নিজের জীবনের পাণ্ডুলিপি থেকে একটি পরিচ্ছেদ শোনাচ্ছেন। আগ্রহী শ্রোতা সাইমা বানু একাস্ত মন দিয়ে তা শুনছে, আর নিজেই যেন হেঁটে আসছে ওইসব জীবনচিত্র থেকে।
সে বার গ্রামে ভরা মৌসুম চলছে। অন্যন্যবারের চেয়ে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি। সাথে ঝড়-ঝাপটা তো আছেই। ইতিমধ্যেই দক্ষিণ পাড়ার মজুদের ঘরের চালা আর মক্তবের টিনের চালা কয়েক মাইল দূরে নিয়ে ফেলেছে ঝড়ে। হাসুদের কলাবাগানের প্রায় সব কলাগাছই ভেঙে পড়েছে। হাসুর আব্বার তো মাথায় হাত। তিনি আসরের নামাজ সেরে মসজিদেই মাথায় দু’হাত রেখে বসে আছেন। ইমাম সাহেব তাকে কাছে ডেকে বোঝালেন। তাতে শান্ত হলো হাসুর আব্বা।
বাজ পড়ে আইমন বিবির একমাত্র দুধের গাভীটা মরে গেছে। গরুটার লাশ সামনে নিয়ে বিলাপ করে চলেছে বুড়ি। সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল ওই গাভীটা। মেম্বার ছটকু মিয়া এসে আরেকটি গাভী কিনে দেয়ার ওয়াদা করলে তবেই শান্ত হলো আইমন বিবি।
এরকমভাবে আরও অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয় সেবার। এদিকে পুকুর-নদী-মাঠেও পানি বেড়ে গেছে। আউশ ধানের গাছগুলো আর কচিপাটগুলোর বুক সমান পানি। এভাবে আর একদিন বৃষ্টি হলেই পানির নিচে চলে যাবে সেগুলো। চারিদিকে পানি থই থই করছে। গৃহস্তের গোয়ালে বাধা গরুগুলো ‘হাম্বা-হাম্বা’ রব তুলে ডেকে চলেছে অনবরত। শুকনা বিচালিই একমাত্র খাদ্য তাদের এখন। অবশ্য বৃষ্টিতে বিচালির মাচানও ভিজে গেছে। পচতে শুরু করেছে বিচালি। কোঠায় বন্দি হয়ে আছে চাগল। তাদের চোনা আর লাদিতে ভরে আছে পুরো কোঠা। ইউরিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে উঠেছে আশপাশটা।
মক্তব এবং মাদ্রাসার কাস নেই। ছেলেমেয়েরা ঘরে বন্দি। অবশ্য কেউ কেউ তাদের বাবা-চাচা বা ভাইদের সাথে জাল-কোচ নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছে। গৃহিণীরা চুলায় জাল ধরাতে চোখের পানি ঝরিয়ে চোখজোড়া লাল টকটকে করে তুলছে।
এমনই এক বর্ষার দিন। বৃষ্টিতে ভিজে-টিজে একাকার হয়ে কিছু বাজার-সদায় করে বাড়ি ফিরেছেন মোকাব্বর হোসেন। বাড়িতে পা রেখেই শোনেন বড় ছেলে মোতালেবকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির কাউকেই কিছু বলে যায়নি। মা তো কেঁদে-কেটে একাকার। দাদীজান এই বৃষ্টির মধ্যেই একে ওকে এখানে ওখানে পাঠিয়ে দিচ্ছেন নাতীর খোঁজে। একটু পর পর সবাই কোনো খবর না নিয়েই ফিরে আসছে। তাতে উৎকণ্ঠা আরো বাড়ছে।
কোথায় গেল মোতালেব?
মোকাব্বর হোসেন বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। বারান্দায় ঝিম মেরে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। কিছু ভাবলেন। তারপর গামছাটা কোমরে বেধে বেরিয়ে পড়লেন ছেলের খোঁজে।
সমস্ত গ্রাম তন্য তন্য করে খুঁজলেন তিনি। ওর বন্ধুদের বাড়িতেও খোঁজ নিলেন। না, কোনো বন্ধুর বাড়িতে যায়নি ও। বন্ধুরা অধিকাংশই বাড়িতে আছে। দু’একজন বাবা-চাচার সাথে বাইরে গেছে।
এবার বেশ চিন্তায়ই পড়ে গেলেন তিনি। গেল কোথায় ছেলেটা?
বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপ করছে মোকাব্বর হোসেনের শরীর। মৃদু কাঁপতে শুরু করেছেন তিনি। ঠাণ্ডা ধরা করছে। জ্বর-জারি চলে আসবে বোধহয়।
গাঙ-পাড় দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসছিলেন তিনি। হঠাৎ মান্দার (শিমুল) গাছটার নিচে কিছু একটা নড়াচড়া তার নজরে পড়ল। অবিরাম ঝরে চলা বৃষ্টির ছাট উপেক্ষা করে দৃষ্টি তীè করলেন তিনি। হনহন করে হেঁটে গেলেন সেদিকে। হ্যাঁ, ওইতো, মোতালেব পানিতে ছিপ ফেলে বসে আছে। পাশে এলুমিনিয়ামের বদনা।
স্বস্তির একটা শ্বাস ফেললেন মোকাব্বর হোসেন। সেই সাথে চেপে রাকা রাগটাও বেরিয়ে এলো। পিছন থেকে গিয়ে ছেলের পিঠে ঠাস্ ঠাস্ করে গোটাকয় চড় বসিয়ে দিলেন।
আচমকা পিঠে আঘাত পাওয়ায় কিছুটা চমকালো মোতালেব। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল নদীর পানিতে। মোকাব্বরও কম যান না, নেমে পড়লেন পানিতে। টেনে তুললেন ছেলেকে। তারপর একহাতে ছিপ ও বদনা এবং অন্য হাত দিয়ে ছেলের কান ধরে টানতে টানতে চললেন বাড়ির দিকে।
মোতালেব ছাড়া পাওয়ার জন্য কাঁইকুঁই করল কিছুসময়। তারপর সে চেষ্টা বাদ দিয়ে হেঁটে চলল।
এলুমিনিয়ামের বদনার মধ্যে কয়েকটা খলসে আর চ্যাং (টাকি) মাছ লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s