আলো-আঁধারের খেলা (ধারাবাহিক উপন্যাস)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

জুবায়ের হুসাইন

তিন.
‘তারপর কী হলো দাদুভাই? আব্বুকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েও খুব মারলে বুঝি?’ গল্পের মাঝেই জিজ্ঞেস করল সাইমা বানু।
মোকাব্বর হোসেন দম নেয়ার জন্য আরও কয়েকটা মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন। এতক্ষণ একটানা কথাগুলো বলে হাঁফ ধরে গেছে।
‘বুঝলে সাইমা,’ আবার বলতে শুরু করেছেন মোকাব্বর হোসেন। ‘তুমার আব্বাটা ছিল পাজির পা-ঝাড়া। সারাদিন খালি বাদরামি করে বেড়াত। অবশ্য আমারে কাজে-কামে বেশ সাহায্যও করতো।’
‘ওসব আমার জানা দাদুভাই,’ দাদুকে থামিয়ে দিয়ে বলল সাইমা। ‘আব্বুকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কী করলে সেটাই বলো।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন দাদু। বললেন, ‘রাগ আমার তখনও কুমিনি (কমেনি)। তাই বাড়ি নিয়ে গিয়ে আবারও মাত্তি (মারতে) লাগলাম। মা এসে ঠেকায়, পাড়ার আরও দু’একজন এসে ঠেকায়। কিন্তু আমি থামছিনে।’
‘দাদীজান ঠেকাননি?’
‘উঁহু! তিনি তো ঘরের দরজায় দাঁড়ায় দেখতেছেন আর আঁচলে চোখ মুছতেছেন। আমার কোনো কাজে বাধা দেয়ার সাহস তার ছিল না। এখনও নেই।’ কেমন আনমনা হয়ে গেলেন মোকাব্বর হোসেন।
‘আচ্ছা ঠিক আছে, তারপরের ঘটনা বলো।’
‘তারপর আর কী! একসময় আমার রাগ পড়ল। মা ওরে কলে (কলপাড়ে) নিয়ে গেল গোসল করাতি। কিন্তু এরপরই শুরু হলো আসল ব্যাপার।’
‘কী?’ উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে তখন সাইমা।
‘সেবার তুমার আব্বার বিরাট জ্বর হলো। সঙ্গে কাশিও। জ্বর মোটে ছাড়েই না। শেষের দিকি তো কাশির সাথে রক্তও উঠতি লাগল!’
‘ডাক্তার দেখাওনি?’
‘তখন কি আর এখনকার মতোন এতো ডাক্তার ছিল বোন? ডাক্তার-ওষুধ বলতি গিরামের কালাম কোবরেজই ছিল সবার ভরসা। ওষুধ-পত্ত যা করার তার কাছ থেকেই করলাম। বর্ষা ছাড়ল, কিন্তু তুমার আব্বার অসুখ সারে না। তুমার দাদী আর আমার মা তো আমারেই দুষতি লাগলেন। আমিও তখন অনুশোচনায় ভুগতিছি। রাগের মাথায় ছেলেডারে অতটা মারা ঠিক হয়নি। সেদিনও রাতে ভীষণ জ্বর ওর। ঘুমের ঘোরে ভুল বকতেছে অনবরত। তুমার দাদীজানে তো ফুঁফায়ে কানতি লাগল। আমার মা জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে কানতি কানতি বলতি লাগল তার নাতীরে সুস্থ করে দেয়ার কথা। মানতও করল মসজিদে।’
‘তারপর?’ অস্ফুটেই উচ্চারণ করল সাইমা।
‘সেই রাতেই ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল মোতালেবের।’ বললেন মোকাব্বর হোসেন।
চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা শব্দ করে ছাড়ল সাইমা।
‘কিন্তুক আপনেরে দেকলি তো খুব রাগী মনে অয় না।’ এতক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে শুনছিল টুকটুকি। সাইমা শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তেই বলে উঠল ও।
সাইমা ঘুরে তাকাল সেদিকে। বলল, ‘ও, এতক্ষণ লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের কথা শোনা হচ্ছিল?’
‘বারে, এসব বুঝি আমার শুনা বারণ?’
‘না টুকু,’ বললেন মোকাব্বর হোসেন। ‘আমিও দেখিছি তুমি ওখেনে দাঁড়ায়ে আমাদের কথা শুনতেছ। তারপরও আমি কিছু কইনি।’
‘তারমানে দাদুভাই,’ বলে উঠল সাইমা। ‘তুমি ওকে আমাদের গল্প শুনতে দেখেও…’
‘হ্যাঁ দাদু।’
‘কিন্তু ও তোমাকে…’
এবারও সাইমাকে থামিয়ে দিলেন দাদু। বললেন, ‘ও ওর মনের কথা বলেছে। আসলে আমি তো বদরাগী ছিলাম না কোনময়ই। কিন্তু হঠাৎ ওই সময়টায় মাথাটা কেমন যেন হয়ে গিইলো (গিয়েছিল)। তাই নিজিরে সামলাতি পারিনি।’
‘আব্বা এখন কেমন আছেন?’ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন সালমা বানু। এইমাত্র ফিরেছেন তিনি স্কুল থেকে।
‘আম্মু,’ দাদুকে কিছু বলতে না দিয়েই শুরু করল সাইমা। ‘আজ দারুণ একটা গল্প শুনলাম দাদুভাইয়ের কাছ থেকে। শুনলে তুমি তো পাক্কা একঘণ্টা কোনো কথাই বলতে পারবা না। আই চ্যালেঞ্জ!’
‘ন্যাও হয়েছে, দাদুকে বেশি জ্বালাতন করা নিষেধ, ভুলে গেছ সে কথা?’ পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন সালমা বানু।
‘ও মা, তুমি না…’
সাইমাকে থামিয়ে দিয়ে মোকাব্বর হোসেন বললেন, ‘না বৌমা, ও আমারে জ্বালাতন করতিছিল না। আমি আমার জীবন থেকে একটা ঘটনা বলতিছিলাম। বাইরে বিষ্টি হচ্ছে তো, এই বিষ্টি ঘিরেই ঘটনাটা ঘটেছিল।’
‘না আব্বা, আমি আসলে বলতে চাচ্ছিলাম, আপনার রেস্টের সময়টাতে চুপচাপ থাকায় ভালো। ডাক্তার সেরকমই পরামর্শ দিয়েছেন কি না।’
‘তুমাদের ওই ডাক্তার নিয়ে হয়েছে এক জ্বালা। খালি এটা কোরো না ওটা কোরো না, সেটা করো। এসব আমার ভালো লাগে না!’
‘উঁহু দাদুভাই,’ বলল সাইমা। ‘ভালো না লাগলে তো হবে না। তোমাকে সুস্থ হতে হবে।’
‘আমি তো এমনিতিই ম্যালা সুস্থ আছি।’
‘তা আছো, আরও যেন সুস্থ থাকতে পারো, সেজন্য তো ডাক্তারের পরামর্শগুলো তোমাকে মানতেই হবে।’
‘কিন্তু কথা না বলে যে আমি একদম থাকতি পারিনে!’
সালমা বানু বললেন, ‘কথা তো বলতে মানা নেই। তবে রেস্টের সময় না।’
সাইমা যোগ করল মায়ের কথার সাথে, ‘হ্যাঁ দাদুভাই, আরও অনেকদিন বাঁচতে হবে না!’
‘বোন,’ বললেন মোকাব্বর হোসেন। বাঁচা-মরা সব আল্লাহর হাতে। তিনি যতদিন বাঁচিয়ে রাখবেন ততদিনই বাঁচার সুযোগ পাওয়া যাবে। তার এক মুহূর্ত এদিক-ওদিক হবে না।’ কিছুটা চাপা দীর্ঘশ্বাসই যেন প্রকাশ করলেন তিনি।
‘থাক আব্বা, ওসব ভারী কথা ভালো লাগে না।’ তারপর টুকটুকিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘এই টুকু, খালুজানখে ওষুধ খাইয়েছিস?’
মুখটা শুকিয়ে গেল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা টুকটুকির। বলল, ‘আমি খাওয়াতিই চাইছিলাম। কিন্তু খালুজান তো…’
‘ওরে দোষ দিও না বৌমা, আমিই আসলে খাতি চাইনি।’ টুকটুকিকে থামিয়ে দিলেন মোকাব্বর।
‘কী রে, এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? যা, দুধ আর পানি নিয়ে আয়।’ টুকুকে ধমকালেন সালমা বানু। টুকু দ্রুত চলে গেলে দুধ ও পানি আনতে।
‘সাইমা, যাও, ড্রেস চেঞ্জ করে এসো। আজ তোমার দাদুভাইয়ের সাথে একসাথে বসে ঝাল-মুড়ি খাব।’ আবারও বললেন সালমা বানু।
‘ওহ্ দারুণ হবে!’ বলে উঠল সাইমা। ‘আমি এুনি আসছি।’ বলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
সালমা বানু খাটে বসলেন। বললেন, ‘আব্বা, আপনি এখানে এসেছেন চিকিৎসার জন্যে। তাই নিয়মকানুনগুলো তো একটু মানতেই হবে। আপনার ছেলে যদি শোনে আপনি ওষুধ না খেয়ে সাইমার সাথে বসে গল্প করেছেন, তাহলে ও খুব রাগ করবে। আর তাছাড়া…’ থেমে গেলেন।
মোকাব্বর হোসেন কিছুই বললেন না। মুখটা তার থমথম করছে। বার দুই উপর-নিচ মাথা নাড়লেন শুধু।

বৃষ্টিটা থেমে গেলেও তার রেশ এখনও মিলিয়ে যায়নি। টিপটিপ করে ফোটায় ফোটায় বৃষ্টি ঝরছে এখন।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে খানিক আগেই। এরকম বৃষ্টি-বাদলার দিনে অবশ্য একটু আগে-ভাগেই সন্ধ্যা নেমে আসে।
মোতালেব হোসেন ফিরেছেন অফিস থেকে। আজ একটু দেরিই হয়েছে ফিরতে। অফিস শেষ করে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন, সে কারণেই এই দেরি।
‘রিপোর্টগুলো আনিছিস?’ জিজ্ঞেস করলেন মোকাব্বর হোসেন।
‘না আব্বা,’ বললেন মোতালেব হোসেন। ‘আরও দু’দিন লাগবে বললেন ডাক্তার।’
‘আমার খুব কঠিন ব্যাইরাম (অসুখ) হয়েছে, তাই নারে?’
মোতালেব হোসেন কোনো কথা বলেন না।
হেসে ওঠেন মোকাব্বর হোসেন। বলেন, ‘আমার কাছে লুকোতি হবে না। আমি তো জানিই আমার ব্যাইরামটা কঠিন। এটা সারার না।’
‘ডাক্তাররা ভালো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। কাল বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা মিলে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে বসবেন।’
‘ওসবে আর কাজ হবে নারে মতলেব! ওপারের ডাক আমি শুনতি পাচ্ছি। চিন্তা হয় তোর মারে নিয়ে। বেচারি বড় বিপদে পড়ে যাবে রে!’
‘আব্বা আপনি এসব কথা বলবেন না। আপনার কিচ্ছু হবে না। আপনি ভালো হয়ে যাবেন। যত টাকা লাগুক, আমি আপনাকে ভালো করে তুলবোই।’ আবেগে জড়িয়ে আসে মোতালেব হোসেনের কণ্ঠ। ডুকরে কেঁদে ওঠেন।
‘পাগল ছেলে!’ ছেলের পিঠে হাত রেখে বলেন মোকাব্বর হোসেন। ‘তোর মতো তুই তো চেষ্টা করতিছিস। হায়াত-মউত সব যে আল্লাহর হাতে। জানিস, আজ তোর মেয়ের কাছে সেই গল্পটা করতিছিলাম। আরে ওই যে সেই ঘটনাটা- এক বর্ষায় তুই বাড়ির কাউরে কিছু না জানিয়ে ছিপ আর বদনা নিয়ে গাঙে মাছ ধত্তি গেলি। আমি বাজার থেকে বাড়ি ফিরে তোরে না পেয়ে খুঁজতি বের হলাম। শেষে পালাম (পেলাম) গাঙের পাড়ে। খুব মারলাম তোরে আমি। তোর অসুখ হলো। ভীষণ অসুখ! হ্যাঁ রে, তোর খুব লেগেছিল, তাই না রে? জানিস, আমি তোরে কখনও মাত্তি চাইনি। ওইদিন আমার কী যে হলো! আমি, আমি…’ গলা ধরে এলো তার। কাশতে লাগলেন। কাশি মোটে থামে না।
‘আব্বা,’ বলল মোতালেব হোসেন। ‘আমি বড় একা আব্বা!’
‘ক্যাডা কয়েছে তুই একলা? তোর বউ রয়েছে, সাইমা দাদুভাইয়ের মতোন মেয়ে রয়েছে। তোর মা রয়েছেন। আর আমিও তো আছি। খবরদার, তুই একা এ কথা আর একবারও কবিনে।’
‘আমি সব সময় আমার মাথার উপর আপনাকেই চাই আব্বা। আমি আপনাকে কোথাও যেতে দেব না।’ বাবার কোলে মাথা গোঁজেন মোতালেব হোসেন। ঠিক ছোট শিশুটির মতো ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠেন।
মোকাব্বর হোসেন ছেলের পিঠে-মাথায় হাত বুলাতে থাকেন। তারও চোখজোড়া সিক্ত হয়ে উঠেছে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s