রকির চাওয়া

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

জুবায়ের হুসাইন

লম্বাটে ছোট্ট এক টুকরো বারান্দা। খানিকটা উঁচু করে ইটের দেয়াল, তার ওপর গ্রিল দিয়ে ঘেরা। সেখানেই রকির অবাধ বিচরণ। স্কুল ছুটি হয়ে যায় বারোটায়। তারপর থেকেই বাড়িতে রকি আর কাজের বুয়া। রকির আম্মু ফেরেন সেই সন্ধ্যায়। আর আব্বু তো রাত দশটার আগে খুব কমই বাড়িতে আসেন। প্রচণ্ড কাজের চাপ তার। বুয়াও ব্যস্ত থাকেন তার কাজ নিয়েই। কাজেই বেলা বারোটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওকে একাই কাটাতে হয়। ছোট্ট ওই একখণ্ড বারান্দাই তখন হয়ে ওঠে ওর বন্ধু- একান্ত খেলার সাথী। এভাবেই চলে আসছে অনেক দিন। রকির আর ভালো লাগে না। একজন খেলার সাথীর অভাব ও খুব টের পায়। বড় আপু সামিরা আগে যা-ও একটু সময় দিতো, এখন মোটেও দেয় না। ওর পড়ার চাপ নাকি খুবই বেড়ে গেছে। বেশিরভাগ সময়ই সে বাইরে থাকে। আর বাড়িতে বাকি সময়টা বই নিয়ে পড়ে থাকে। তখন তাকে হাজার ডেকেও পাওয়া যায় না। রকি তাই ভীষণ একা। ব্যাট-বল নিয়ে বারান্দাতে খেলছিল রকি। সিলিঙ থেকে পুরনো একটা গামছা ঝুলিয়ে তাতে টেনিস বলটা বেঁধেছে ও। তা দিয়ে ব্যাটিং করতে থাকে। কিন্তু কোনো রান করতে পারে না। না সিঙ্গেল, না দুই-তিন, না চার-ছয়। এভাবে ব্যাটিং করে আর কতোক্ষণই বা কাটানো যায়? রকি তাই ছুটে যায় বোনের রুমে। সামিরার আজ কোচিং নেই। তাই নিজের রুমে বসেই পড়ালেখা করছিল ও। ক্লাস থ্রি-পড়ুয়া রকি বোনের পাশে দাঁড়িয়ে বোনের হাতে ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘আপু, এসো না আমার সাথে একটু খেলবে! এসো না আপু!’ সামিরা প্রথমে কিছুই বলে না। কিন্তু বারবার এভাবে করাতে ও কিছুটা বিরক্ত হয়। বলে, ‘যা-তো, এখন ডিসটার্ব করিস না।’ রকি নাছোড়বান্দা, ‘আমি যে একা খেলতে পারছি না। একটু এসো না আমার সাথে খেলবে!’ ‘দেখছিস না আমি পড়ছি!’ ঝাঁঝিয়ে ওঠে সামিরা। রকি আর কি করে, ফিরে আসে নিজের ছোট্ট খেলার মাঠে। তবে খেলায় আর মন বসাতে পারে না। কিছুক্ষণ গ্রিল ধরে বারান্দার বাইরে তাকিয়ে থাকে। এখান থেকে খোলা মাঠটা দেখা যায়। মাঠে অনেক ছেলে একসাথে খেলছে। রকির খুব ইচ্ছে করে ওরকম একটা খোলা মাঠে বন্ধুদের সাথে খেলতে। মাঠের ক্রিকেট খেলা দেখে ও মাঝে মাঝে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। হঠাৎ একজনকে বোল্ড হতে দেখে ওর খুব আফসোস হয়। ইস! ব্যাটটা যদি ওভাবে না ঘোরাতো তাহলেই তো আউট হতো না! এক সময় চোখজোড়া ক্লান্ত হয়ে আসে রকির। ব্যাটটা পাশে রেখে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। এ বন্দীত্ব থেকে মুক্তি চায় ও। অন্তত একজন খেলার সাথী ওর চাই-ই চাই। একটু পর বুয়া এলো। আজই প্রথম নিজের ছেলেকে সঙ্গে এনেছে বুয়া। এসেই নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। বুয়া তার ছেলেটাকে পই পই করে বলে দিল, তার কাছ থেকে যেন কোথাও না নড়ে। কিন্তু ছোট মানুষ, কতোক্ষণ আর মায়ের একঘেয়েমি কাজ দেখতে পারে! ঘুরতে ঘুরতে একসময় চলে এলো রকির ছোট্ট মাঠটিতে। রকিকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে প্রথমে একটু ঘাবড়ে যায় ছেলেটি। রকি প্রথমে কিছু খেয়াল করে না। একটু পর তার বয়সী একটা ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাছে ডাকে। উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কে তুমি? কি নাম তোমার? তুমি আমার সাথে খেলবে?’ বুয়ার ছেলেটি বয়সে রকির চেয়ে একটু বড়ই হবে। কিন্তু রকির মতো অত চটপটে নয়। সে ফ্যালফ্যাল করে রকির দিকে তাকিয়ে থাকে। রকি আবার বলে, ‘খেলবে না আমার সাথে? তাহলে কেন এসেছো এখানে?’ এমন সময় বুয়া দৌড়ে আসে। বলে, ‘না ভাইজান, ও আপনার সঙ্গে খেলবে না। আপনে খেলেন। এই কালাম, আয় আমার লগে।’ বলে ছেলের হাত ধরে টানতে থাকে বুয়া। রকি বলে, ‘ও তোমার ছেলে বুঝি? আমার সাথে খেলুক না!’ বুয়া বলে, ‘না ভাইজান, আম্মা জানতে পারলে আমার চাকরি যাইবো।’ ‘কেন বুয়া? ও আমার সঙ্গে খেললে তোমার চাকরি যাবে কেন?’ ‘আপনে ওসব বুঝবেন না। আপনে খেলেন, আমি আপনার দুধ নিয়া আসি।’ বলে ছেলেকে টেনে নিয়ে চলে যায় বুয়া। একটু পর বুয়া দুধ দিয়ে যায়। সবটুকু খেতে পারে না রকি। বুয়া আজ আর জোরও করে না। গ্লাস নিয়ে চলে যায়। রকি আবার একা হয়ে যায়। কিন্তু খানিকক্ষণ পর কালাম আবার আসে। এবার আর রকির ডাকে সাড়া না দিয়ে পারে না ছেলেটি। রকি গামছা থেকে বলটা খুলে ফেলে। দু’জনে মিলে খেলায় মেতে ওঠে। বুয়াও আর কিছু বলে না। ভাবে, খেলুক না ওরা। স্যার-ম্যাডাম না জানলেই তো হলো। এভাবে ক’দিন কেটে যায়। রকি এখন বেশ খুশি। তার একজন খেলার সাথী জুটেছে। দু’জনে খুব বন্ধু হয়ে যায়। রকি নিজের দুধ থেকে কালামকে খেতে দেয়। নিজের খেলনা নিয়ে খেলতে দেয়। হাসি আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কাটতে থাকে ওর দিনগুলো। আম্মু জানলেও আব্বু প্রথমে কিছুই জানতে পারেন না। একদিন রাতে আব্বু আম্মুকে বলেন, ‘শুনলাম বুয়ার ছেলেটা নাকি রকির সাথে খেলা করে।’ আম্মু জবাব দেন, ‘হ্যাঁ, সে কথা আমিও শুনেছি।’ ‘তুমি বুয়াকে কিছু বলোনি?’ বলেন আব্বু। ‘কি বলব? ওরা খেলছে খেলুক না।’ ‘কিন্তু তাই বলে বুয়ার ছেলের সাথে তোমার ছেলে খেলবে?’ আম্মু বলেন, ‘আমরা তো ছেলেটাকে ভালোমতো সময় দিতে পারি না। ও যদি একজন খেলার সাথী পায়, তাতে আপত্তি করার কি আছে? তাছাড়া বুয়ার ছেলে বলে তাকেও তো আমরা অবহেলা করতে পারি না।’ ‘দেখ, তোমার মতো আমি অত উদার না। আমার ওসব একদম ভালো লাগে না।’ বলেন আব্বু। আম্মু বলেন, ‘আহা, ওসব তুমি ছেড়ে দাও তো। আমার রকির কিচ্ছু হবে না। তাছাড়া তুমিই তো কাল বললে রকি ইদানিং লেখাপড়ায় বেশ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। ওকে আর আগের মতো মনমরা লাগে না। এটা কি আমাদের জন্য খুশির খবর নয়?’ আব্বু এই কথার কোনো জবাব দিতে পারেন না, শুয়ে পড়েন। আজ কালাম আসেনি। বুয়ার কাছে জানতে চাইলে সে বলল, ‘কালামের বেশ জ্বর।’ একথা শোনার পর থেকে রকির মনটা খুব খারাপ। খেলা বাদ দিয়ে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ভাবতে লাগলো অনেক কিছু। একটু পর সামিরা এলো। ছোট ভাইটিকে ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘রকি, তোর মন খারাপ?’ রকি কোনো জবাব দেয় না। সামিরা ওর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে যায়। সমস্ত বিকেলটাই রকি শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিল। সন্ধ্যায় আম্মু এসে দেখেন তার আদরের দুলাল ঘুমিয়ে পড়েছে। এই অসময়ে ওকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে আম্মুর বুকটা কেমন করে উঠলো। তখুনি বুয়াকে ডেকে কারণ জানতে চাইলেন। বুয়া সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারলো না। আম্মু বললেন, ‘আজ কালাম আসেনি?’ বুয়া বলল, ‘ওর ভীষণ জ্বর।’ ‘ডাক্তার দেখিয়েছো?’ ‘না।’ ‘এটা তো ভারি অন্যায়। অতটুকু একটা ছেলে অসুস্থ হয়ে গেছে, তাকে এখনও ডাক্তার দেখাওনি কেন? অন্তত আমাকে একটা ফোন তো করতে পারতে।’ বুয়া কিছু বলে না। আম্মু বলেন, ‘তোমার কাজ শেষ?’ বুয়া উপর-নীচ মাথা নাড়ে। ‘ঠিক আছে, এখন তুমি বাসায় যাও। আর কাল সকালেই ছেলেকে ডাক্তার দেখাবে।’ বুয়া ‘আচ্ছা’ বলে চলে যায়। আম্মু এবার রকির ঘরে ঢোকেন। ছেলের মাথার কাছে বসে মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে থাকেন। এতে জেগে যায় রকি। আম্মুকে পাশে বসে থাকতে দেখে বলে, ‘জানো আম্মু, বুয়ার ছেলের জ্বর হয়েছে।’ ‘তাই বুঝি তোমার মন খারাপ?’ ছেলেকে নিজের কোলে বসান আম্মু। রকি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে। আম্মু বলেন, ‘ও সেরে উঠবে। আবার তোমার সাথে খেলা করবে।’ ‘আম্মু, আমি কি ওর জন্যে কিছুই করতে পারি না?’ ’পারবে না কেন? অবশ্যই পারো। তুমি খুব করে ওর জন্য প্রার্থনা করো। একদম মন থেকে প্রার্থনা করো, দেখবে ও ঠিক হয়ে যাবে।’ রাতে ঘুমানোর সময় রকি প্রার্থনা করতে থাকে, যাতে সুস্থ হয়ে ওঠে কালাম। ভিজে ওঠে ওর চোখজোড়া। মন থেকে প্রার্থনা করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে রকি। আর ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে কালামের সঙ্গে খোলা মাঠটিতে খেলছে রকি। একে একে খেলতে আসে আরও অনেকে। সবাই খুব মজা করে খেলছে। খুশিতে ভরে ওঠে রকির হৃদয়।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s