সূরা আর্-রূম: ৬ থেকে ৮ আয়াত

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

اَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ

6- وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ وَعْدَهُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ.

7- يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ.

8- أَوَلَمْ يَتَفَكَّرُوا فِي أَنفُسِهِمْ مَا خَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَ إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُّسَمًّى وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ بِلِقَاء رَبِّهِمْ لَكَافِرُونَ.

অর্থ:

৬। আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহ্ তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।

৭। তারা দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক দিক সম্পর্কে জানে, আর আখেরাত সম্পর্কে তারা গাফেল।

৮। তারা কি নিজেদের অন্তরে ভেবে দেখে না, আল্লাহ্ আসমানসমূহ্ ও যমীন এবং এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সব কিছুই যথাযথভাবে ও এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছেন? আর নিশ্চয়ই বহুলোক তাদের রবের সাক্ষাতে অবিশ্বাসী।

নামকরণ পরিচিতি: সূরাটির নামকরণ করা হয়েছে আর-রূম। সূরার দ্বিতীয় আয়াতের الروم শব্দ থেকে এ নামটি নেয়া হয়েছে। এটি একটি শব্দচয়ন ভিত্তিক নামকরণ হলেও এতে রোমকদের সম্পর্কেও অনেক আলোচনা এসেছে। ধারাবাহিকতায় ৩০ নং সূরা। আয়াত সংখ্যা: ৬০।

নাযিলের সময়কাল: সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: রূম ও পারস্য; তৎকালীন দুই পরাশক্তির মধ্যকার যুদ্ধ ও তাদের জয়-পরাজয়ে সুমহান স্রষ্টা আল্লাহ্ তা’আলার ভূমিকা ইত্যাদি ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে সূরা আর্-রূম অবতীর্ণ। সূরার শুরুর আয়াতগুলো সহ আলোচ্য আয়াতগুলোর নাযিলের প্রেক্ষাপট ছিল: রোমকরা ছিল আহলে কিতাব খৃষ্টান আর পারসিকরা ছিল অগ্নিপূজক। সুতরাং দ্বীনের দিক থেকে রোমক খৃষ্টানরা ছিল ইসলামের কাছাকাছি। তাই মুসলমানগণ এ যুদ্ধে রোমকদের বিজয় আশা করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল পারসিকরা বিজয় লাভ করে এবং কনষ্টান্টিনোপল জয় করে সেখানে অগ্নিপূজকরা সেখানে অগ্নিকুণ্ড নির্মাণ করে। এতে মক্কার কাফেররা দারুন খুশি হয় ও মুসলমানদের বলতে থাকে যে, পারসিকদের হাতে রোমকদের পরাজয়ের মতই একদিন তোমরাও আমাদের হাতে পরাজয় বরণ করবে। এরই প্রেক্ষিতে উক্ত আয়াতসমূ নাযিল করে আল্লাহ্ তা’আলা মুসলমানদেরকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তথ্য ও সান্ত্বনা দিয়েছেন।

বিষয়বস্তু: আয়াত সমূহে আল্লাহ্ তা’আলার ওয়াদা যে অকাট্য, তা যে ঘটবেই সে সম্পর্কে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু মানুষদের মধ্যে বহুসংখ্যক তা সম্পর্কে অজ্ঞ। এসব অজ্ঞ লোকেরা দুনিয়ার জীবন ও জীবনোপকরণ সম্পর্কে যতটা সীমাহীন জ্ঞান রাখে ঠিক ততটা সীমাহীন অজ্ঞতা ধারণ করে এ জীবনের পরবর্তী জীবন সম্পর্কে। আল্লাহ্ তাদেরকে তাঁর সৃষ্টিরাজি ও সেসবের পরিক্রমা-সময়সীমা ইত্যাদির সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করে আখেরাতের ব্যাপারে জ্ঞান লাভ করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং তারপরও যারা আখেরাত সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাবে তাদের ব্যাপারে তিনি বলেন যে, মূল কথা হলো বহু লোক তাদের রব আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে অবিশ্বাসী।

একথায়, আল্লাহ্ তাঁর ওয়াদা, ওয়াদার রক্ষার নিশ্চয়তা, মানুষের দুনিয়াবী জ্ঞান ও এ ব্যাপারে বিজ্ঞতা এবং সৃষ্টির ক্ষণস্থায়ীত্বের মত বিভিন্ন উদাহরণ পেশ করে আখেরাতের জীবনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং আখেরাতের ব্যাপারে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

ব্যাখ্যা:

وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ وَعْدَهُ – আল্লাহ্ ওয়াদা করেন। তবে তিনি এর জন্য বাধ্য নন। তিনি তাঁর বান্দাদের মনোবল বৃদ্ধি ও দ্বীনের প্রতি উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন ব্যাপারে ওয়াদা করেছেন। এটি মূলত: তাঁর পক্ষ হতে মানুষের জন্য অসংখ্য নেয়ামত ও মর্যাদার মতই একটি। মহাসত্যের স্রষ্টা আল্লাহ্ তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। আয়াতের দ্বারা একথা তিনি না বললেও পারতেন, তথাপি মানুষের মন যেহেতু সন্দেহপ্রবণ করেই সৃষ্টি করা হয়েছে, সেহেতু আল্লাহ্ নিশ্চয়তা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি কখনো তাঁর ওয়াদার ব্যতিক্রম করেন না। সোবহান আল্লাহ্।

কিন্তু আল্লাহর ওয়াদা কি? এ আলোচনা করা হয়েছে পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে যা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলোচনায় এসেছে। এ সম্পর্কে ইবনে কাসীর বলেন: “….. এটি আল্লাহর পক্ষ হতে একটি সত্য ওয়াদা যা যথাযথভাবে পালিত হবে। রূম পারস্যের উপর অবশ্যই বিজয়ী হবে। কারণ, আল্লাহর এটাই চিরাচরিত বিধান যে, দু’টি বিবাদমান দলের যে দল সত্যের অধিক নিকটবর্তী, তিনি তাদের সাহায্য করেন। এবং এর পরিণাম শুভ হয়।”

وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ -“কিন্তু অধিকাংশ লোক এটা বুঝে না যে, ইনসাফের ভিত্তিতে আল্লাহর যাবতীয় কর্মকান্ডে কি হিকমত ও নিগূঢ় রহস্য রয়েছে।”

– يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ ইবনের কাসীরের বর্ণনায় হাসান বসরী বলেন: “আল্লাহর কসম! দুনিয়ার ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এতই বিজ্ঞ যে, নখের উপর দিরহাম উলট-পালট করেই বলে দিতে পারে যে, এর ওজন কি হবে। কিন্তু সে সঠিকভাবে সালাত আদায় করতে সক্ষম নয়।”

ইবনে আব্বাস (রা) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: “কাফেররা দুনিয়ায় আবাদ করতে ও পার্থিব উন্নতি সাধন করা তো খুবই বুঝে, কিন্তু দ্বীন সম্পর্কে তারা মূর্খ। “[ইবনে কাসীর: ৬০৬]

أَوَلَمْ يَتَفَكَّرُوا فِي أَنفُسِهِمْ -মানুষের এমন তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাকে পৃথিবীর অন্যান্য জিনিস থেকে আলাদা করেঃ

একঃ পৃথিবী ও তাঁর পরিবেশের অসংখ্য জিনিস তার বশীভূত করে দেয়া হয়েছে এবং সেগুলো ব্যবহার করার ব্যাপক ক্ষমতা তাকে দান করা হয়েছে।

দুইঃ নিজের জীবনের পথ বেছে নেবার জন্য তাকে স্বাধীন ইখতিয়ার দেয়া হয়েছে।

তিনঃ তার মধ্যে জন্মগতভাবে নৈতিকতার অনুভূতি রেখে দেয়া হয়েছে।

مَا خَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُّسَمًّى -এ বাক্যে আখেরাতের সপক্ষে আরো দুটি যুক্তি পেশ করা হয়েছে৷ যথা:

প্রথম যুক্তি: এ বিশ্ব- জাহানকে যথার্থ সত্যের ভিত্তিতে সৃষ্টি করা হয়েছে৷

দ্বিতীয় যুক্তি: এখানে কোন জিনিসই চিরস্থায়ী নয়৷

وَإِنَّ كَثِيرًا مِّنَ النَّاسِ بِلِقَاء رَبِّهِمْ لَكَافِرُونَ-মূলত: মানুষের মধ্যে এ চিন্তা যদি বিদ্যমান থাকে যে, তাকে তার প্রতিটি কর্মের হিসাব প্রদান করতে হবে তাদের প্রতিপালকের নিকট, তাহলে তার পক্ষে খেয়ালী জীবন পরিচালনার কোন সুযোগ নেই। সর্বদা প্রতিটি কথা, কাজ ও সমর্থনে তার বিবেচনায় একথা থাকবেই যে, একদিন তাকে তার প্রতিপালকের সাথে দেখা করতেই হবে এবং জীবনের ভাল-মন্দের হিসাব তিনি তার কাছ থেকে নেবেন। এব্যাপারে কুরআনের বহু জায়গায় কথা এসেছে, যেমন সূরা আল-মাউন।

উপরোক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহর পক্ষ হতে নিশ্চয়তা, সান্ত্বনা, সতর্ক ও সৃষ্টির রহস্য ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে একটি বিষয়ই বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তা হচ্ছে- আখেরাত। কি এই আখেরাত? কেন এর প্রতি এতটা গুরুত্ব? কেমন হবে আখেরাতের চিত্র-বৈচিত্র। কি সুদশা-দুর্দশা অপেক্ষা করছে সেখানে আমাদের জন্য? আসুন ইত্যাদি বিষয়গুলো আরো বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আমরা জেনে নেয়ার চেষ্টা করি।

মৃত্যু:

মূলত: বান্দার জন্য কেয়ামত, আখেরাত সবকিছুরই শুরু হয় মৃত্যুর মাধ্যমে। এর আরেকটি নাম ইন্তেকাল, যার অর্থ স্থান পরিবর্তন। কুরআনে আল্লাহ্ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” [সূরা আলে ইমরান: ১৮৫]

বনী আদমের মৃত্যুর অবস্থা সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ হাদীস রয়েছে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর নিকট হতে।

কবর:

কবরের নেয়ামত ও শাস্তির প্রতি ঈমান ও তার দলীল- আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

سَنُعَذِّبُهُمْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَى عَذَابٍ عَظِيمٍ

“আমরা তাদেরকে দু’বার শাস্তি দেব তারপর তারা মহা শাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।” [সূরা আত্-তাওবাহ্: ১০১] মুজাহিদ বলেন: “ক্ষুধা ও কবরের আযাব এবং তারপর মহাশাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে কেয়ামতের দিনে।” কাতাদাহ্ বলেন: “দুনিয়ার শাস্তি ও কবরের শাস্তি, তারপর তারা মহাশাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।”

কবরের শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ; এ তথ্য থেকে শিক্ষা নিয়ে শুদ্ধভাবে জীবন পরিচালনা দরকার- আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন:

لَوْلَا أَنْ لَا تَدَافَنُوا لَدَعَوْتُ اللَّهَ أَنْ يُسْمِعَكُمْ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ

“যদি এ ভয় না থাকত যে, তোমরা দাফন করা ত্যাগ করবে তাহলে আমি আল্লাহর কাছে দো’আ করতাম তিনি যেন তোমাদেরকে কবরের আযাব শোনান।”[মুসলিম: ২৮৬৮]

إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا وُضِعَ فِي قَبْرِهِ وَتَوَلَّى عَنْهُ أَصْحَابُهُ وَإِنَّهُ لَيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ أَتَاهُ مَلَكَانِ فَيُقْعِدَانِهِ فَيَقُولَانِ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ لِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَمَّا الْمُؤْمِنُ فَيَقُولُ أَشْهَدُ أَنَّهُ عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ فَيُقَالُ لَهُ انْظُرْ إِلَى مَقْعَدِكَ مِنْ النَّارِ قَدْ أَبْدَلَكَ اللَّهُ بِهِ مَقْعَدًا مِنْ الْجَنَّةِ فَيَرَاهُمَا جَمِيعًا قَالَ قَتَادَةُ وَذُكِرَ لَنَا أَنَّهُ يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ ثُمَّ رَجَعَ إِلَى حَدِيثِ أَنَسٍ قَالَ وَأَمَّا الْمُنَافِقُ وَالْكَافِرُ فَيُقَالُ لَهُ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ فَيَقُولُ لَا أَدْرِي كُنْتُ أَقُولُ مَا يَقُولُ النَّاسُ فَيُقَالُ لَا دَرَيْتَ وَلَا تَلَيْتَ وَيُضْرَبُ بِمَطَارِقَ مِنْ حَدِيدٍ ضَرْبَةً فَيَصِيحُ صَيْحَةً يَسْمَعُهَا مَنْ يَلِيهِ غَيْرَ الثَّقَلَيْنِ

“বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয়, আর তার সাথীরা তাকে রেখে ফিরে আসে, সে তাদের জুতার খট খট শব্দ শুনতে পায় এমতাবস্থায় তার কাছে দু’ফিরিশতা আসে। তারা তাকে বসানোর পর জিজ্ঞাসা করে: ‘এ লোক(মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে তুমি কি বলতে?’ তখন মুমিন বলে: ‘আমি সাক্ষ্য দেই যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।’ তখন তাকে বলা হবে: ‘জাহান্নামে তোমার আসনের দিকে তাকাও, আল্লাহ্ তোমার সে আসনের বদলে জান্নাতে তোমার আসন করে দিয়েছেন, তারপর সে দু’টি আসনই দেখতে পাবে।’ আর মুনাফেক ও কাফেরকে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে: ‘এ লোকটি সম্পর্কে তুমি কি বলতে?’ সে বলবে: ‘আমি জানিনা, মানুষ যা বলত আমিও তা বলতাম।’ তারপর তাকে বলা হবে: ‘তুমি জানওনি আর পড়ওনি।’ তাকে লোহার হাতুড়ি দিয়ে এমনভাবে আঘাত করা হবে যার ফলে সে এমন জোরে চিৎকার করবে যা মানুষ ও জিন ব্যতীত তার কাছে যারা থাকবে তারা সবাই শুনতে পাবে।” [সহীহ্ বুখারী: ১৩৩৮]

হাদীসে আরো এসেছে-

فَتُعَادُ رُوحُهُ فِي جَسَدِهِ فَيَأْتِيهِ مَلَكَانِ فَيُجْلِسَانِهِ فَيَقُولَانِ لَهُ مَنْ رَبُّكَ…..

“তারপর তার রূহ্ তার শরীরে ফেরৎ পাঠানো হবে, তখন তার কাছে দু’জন ফিরিশতা আসবে, তারা তাকে বসাবে, তারপর তারা তাকে বলবে: তোমার রব তথা প্রতিপালক কে?…”[মুসনাদে আহমাদ: ৪/২৮৭, আবু দাউদ: ৫/৭৫, মুস্তাদরাকে হাকিম: ১/৩৭-৩৮]

এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল (সা) আরো বলেন:

لما أصيب إخوانكم بأحد ، جعل الله أرواحهم في جوف طير خضر ، ترد أنهار الجنة ، تأكل من ثمارها ، وتأوي إلى قناديل من ذهب معلقة في ظل العرش….

“যখন তোমাদের ভাইগণ নিহত হলো উহুদের যুদ্ধে, আল্লাহ্ তা’আলা তাদের আত্মাকে সবুজ পাখীর পেটে দিয়ে দিলেন, যাতে তারা জান্নাতের নহরসমূহে বিচরণ করতে পারে, জান্নাতের ফলসমূহ থেকে খেতে পারে আর আরশের ছায়ায় স্বর্ণের ঝাড়বাতির মধ্যে এসে আশ্রয় নিতে পারে।” [মুসনাদে আহমাদ: ১/২৬৬, মুস্তাদরাকে হাকেম: ২/৮৮, ২৯৭]

প্রমাণিত হলো যে, কবরে মানুষকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে এবং শান্তি ও শাস্তি রূহ্ এবং দেহ উভয়ের উপর কার্যকর হবে।

মুনকার ও নাকীর নামক দু’জন ফিরিশতার প্রতি ঈমান এবং কবরে তাদের কার্যক্রম- এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন:

إِذَا قُبِرَ الْمَيِّتُ أَوْ قَالَ أَحَدُكُمْ أَتَاهُ مَلَكَانِ أَسْوَدَانِ أَزْرَقَانِ يُقَالُ لِأَحَدِهِمَا الْمُنْكَرُ وَالْآخَرُ النَّكِيرُ فَيَقُولَانِ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ فَيَقُولُ مَا كَانَ يَقُولُ هُوَ عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ فَيَقُولَانِ قَدْ كُنَّا نَعْلَمُ أَنَّكَ تَقُولُ هَذَا ثُمَّ يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ سَبْعُونَ ذِرَاعًا فِي سَبْعِينَ ثُمَّ يُنَوَّرُ لَهُ فِيهِ ثُمَّ يُقَالُ لَهُ نَمْ فَيَقُولُ أَرْجِعُ إِلَى أَهْلِي فَأُخْبِرُهُمْ فَيَقُولَانِ نَمْ كَنَوْمَةِ الْعَرُوسِ الَّذِي لَا يُوقِظُهُ إِلَّا أَحَبُّ أَهْلِهِ إِلَيْهِ حَتَّى يَبْعَثَهُ اللَّهُ مِنْ مَضْجَعِهِ ذَلِكَ وَإِنْ كَانَ مُنَافِقًا قَالَ سَمِعْتُ النَّاسَ يَقُولُونَ فَقُلْتُ مِثْلَهُ لَا أَدْرِي فَيَقُولَانِ قَدْ كُنَّا نَعْلَمُ أَنَّكَ تَقُولُ ذَلِكَ فَيُقَالُ لِلْأَرْضِ الْتَئِمِي عَلَيْهِ فَتَلْتَئِمُ عَلَيْهِ فَتَخْتَلِفُ فِيهَا أَضْلَاعُهُ فَلَا يَزَالُ فِيهَا مُعَذَّبًا حَتَّى يَبْعَثَهُ اللَّهُ مِنْ مَضْجَعِهِ ذَلِكَ.

“যখন মৃত ব্যক্তিকে অথবা বলেছেন: তোমাদের কাউকে কবরস্থ করা হয় তখন তার কাছে দু’জন জমকালো গাঢ় নীল ফিরিশতা আসে। তাদের একজনকে বলা হয় মুনকার, অপরজনকে নাকীর, তারপর তারা বলে: ‘এ লোকটি সম্পর্কে তুমি কি বলতে?’ উত্তরে সে যা বলত তা বলবে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন প্রকৃত ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তখন তারা দু’জন বলবে: আমরা ভালভাবেই জানতাম যে, তুমি এটা বলবে। তারপর তার কবরকে দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে সত্তর হাত পর্যন্ত প্রসারিত করা হবে…। আর যদি মৃত ব্যক্তি মুনাফিক হয় সে বলবে: মানুষকে যা বলতে শুনেছি আমিও অনুরূপ বলেছি, আমি কিছু জানি না। তখন তারা দু’জন বলবে: আমরা ভাল করেই জানতাম যে, তুমি এটা বলবে। তারপর যমীনকে বলা হবে যে, তার উপর দু’দিক থেকে মিশে যাও। তখন যমীন দু’দিক থেকে তার উপর মিশে যাবে যাতে তার পাঁজর ভেঙ্গে একাকার হয়ে যাবে। তারপর আল্লাহ্ তাকে তার এ শোয়ার স্থান থেকে পুনরুত্থান করা পর্যন্ত সে এভাবেই শাস্তি পেতে থাকবে।”[তিরমিযী: ৩/৩৮৩,হাদীস নং: ১০৭১]

কবরের চাপ:

এ প্রসঙ্গে আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত এক হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন: “কবরের একটি চাপ আছে, কেউ যদি সে চাপ থেকে পরিত্রাণ পেত তাহলে সা’আদ বিন মু’আয পেত।” [আহমাদ, আলবানী এ হাদীসে সহীহ্ বলেছেন।]

মৃত্যুর পর হতে কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত রূহসমূহের অবস্থান ও মর্যাদার নানা স্তর রয়েছে।যথা- ইবনুল কাইয়্যিম (র)-এর মতে-

১. নবী-রাসূলগণের রূহ সর্বোচ্চ মর্যাদায় অবস্থান করবে। সেখানেও থাকবে মর্যাদার পার্থক্য যা মি’রাজের রাতে আল্লাহর রাসূল (সা) দেখে এসেছেন।

২. শহীদদের রূহ সবুজ পাখীর বেশে জান্নাতে বিচরণ করবে। তবে ঋণগ্রস্ত শহীদগণ ছাড়া। কেননা তাদের রূহকে জান্নাতে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। [হাদীস]

৩. রাসূল (সা) বলেন: “তোমাদের কিছু সঙ্গীকে জান্নাতের দরজায় আটকাবস্থায় দেখলাম।”

৪. কেউ বন্দী থাকবে কবরে। এক ব্যক্তি বিনা অনুমতিতে গণিমতের মাল থেকে একটি ফিতা চুরি করে শহীদ হয়ে যান। লোকেরা বলছিল যে, তার জন্য জান্নাত সহজ হয়ে গেল।

প্রতিবাদে রাসূল (সা) বললেন: “ঐ সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার জীবন, সে লোকটি যে ফিতার খেয়ানত করেছে তার জন্য সে কবরের আগুনে জ্বলবে।”

৫. কারো আবাস হবে জান্নাতের দরজা। হাদীসে এসেছে শহীদদের রূহ জান্নাতের দরজায় নদীর তীরে সবুজ গম্বুজে অবস্থান করবে। তবে জাফর বিন আবু তালেব ডানা প্রাপ্ত হবে।

৬. ব্যভিচারকারী রূহ আগুনের চুল্লীতে জ্বলতে থাকবে এবং আবার কিছু রূহ রক্তের নদীতে সাঁতার কাটবে ও পাথর গিলবে।

পুনরূত্থান:

আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:

وَضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَنَسِيَ خَلْقَهُ ۖ قَالَ مَن يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ * قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ ۖ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ

“আর সে আমাদের সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। সে বলে: ‘কে অস্থিতে প্রাণের সঞ্চার করবে যখন তা পঁচে-গলে যাবে?’ বলুন: ‘তার মধ্যে প্রাণের সঞ্চার তিনিই করবেন যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত।” [সূরা ইয়াসীন: ৭৮-৭৯]

শিক্ষা:

১. আল্লাহ্ ওয়াদা করেন।

২. আল্লাহ্ তাঁর ওয়াদা কখনোই খেলাপ করেন না।

৩. মানুষ দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিকতা জেনেই নিজেকে যথেষ্ট জ্ঞানী মনে করে।

৪. প্রকৃত জ্ঞান ও বিচক্ষণতা রয়েছে অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টা ও তাঁর কুদরতকে জানা ও বিশ্বাস করা।

৫. এই সৃষ্টিরাজি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এবং সবাইকে তাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে, কিন্তু একথা অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে না।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s