সূরা আল ফাতহ্: ২৯ নং আয়াত

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

Written by তানভীর

সাহাবায়ে কেরামঃ ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আদর্শ

مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنْجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا – سورة الفتح : 29

সরল অনুবাদ: মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, যারা তার সাথে আছে তারা কাফিরদের ব্যাপারে কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে কোমল। তুমি যখন তাদেরকে দেখবে তখন তাদেরকে রুকু-সিজদা অবস্হায় আল্লাহর মেহেরবানী ও সন্তুষ্টির তালাশে মগ্ন পাবে। তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন রয়েছে, যা থেকে তাদেরকে আলাদাভাবে চেনা যায়। তাওরাতে ও ইনজীলে তাদের এ পরিচয় রয়েছে। তাদের উদাহরণ এভাবে দেয়া হয়েছে, যেন একটি বীজ বপন করা হলো, যা থেকে প্রথমে অঙ্কুর বের হলো, তারপর মজবুত হলো, তারপর তা পুষ্ট হলো, এরপর নিজের কাণ্ডের উপর খাড়া হয়ে গেল। (এ দৃশ্য) চাষীকে খুশী করে দেয়, এভাবে (মুমিনদের সমৃদ্ধির দ্বারা) কাফিরদের(দিলে) জ্বালা সৃষ্টি হয়। এ লোকদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও নেক আমল করেছে, আল্লাহ তাদের সাথে মাগফিরাত ও মহা পুরস্কারের ওয়াদা করেছেন।

নাযিলের সময়কাল: ৬ষ্ঠ হিজরীতে মক্কার কাফেরদের সাথে সন্ধিচুক্তি শেষে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যখন মদীনার দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন, সে সময় গোটা সূরাটি একত্রে নাযিল হয়।

নাযিলের পটভূমি: হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে মুসলমানদের সুস্পষ্ট বিজয় হয়েছে, এমন সুসংবাদ প্রদানের জন্য সুরাটি নাযিল করা হয়। সাথে সাথে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ও তার সঙ্গীদের ব্যাপারে কাফির ও মুনাফিকদের বিদ্বেষপূর্ণ উক্তির দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়ার মাধ্যমে তাদের অন্তরে নিস্ফল আক্রোশ জাগিয়ে তোলাও এ সূরাটি নাযিলের উদ্দেশ্য।

আয়াতে কারিমার ব্যাখ্যা: প্রথমতঃ আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ(সাঃ) সম্পর্কে নিশ্চিত করলেন যে তিনি আল্লাহর রাসূল। তারপর তার সাহাবায়ে কেরামের গুণাবলী সমূহ বর্ণনা করেন।

কারো মতে সাহাবীগণ বলতে এখানে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় যারা আল্লাহর রাসূলের সাথে ছিলেন, তারা। তবে অধিকাংশের মতে সকল সাহাবী উদ্দেশ্য। যেমন তারা ছিলেন-

১. কাফিরদের প্রতি কঠোর: সাহাবীগণ তাদের আক্বীদার পরিপক্কতা, নীতির দৃঢ়তা, চারিত্রিক শক্তি ও ঈমানী দূরদর্শীতার কারণে কাফেরদের মোকাবিলায় অনমনীয় ও আপোষহীন ছিলেন। কোন ভয়-ভীতি, লোভ-লালসা তাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। দ্বীনকে বিজয়ী করার যে শপথ তারা নিয়েছেন তা থেকে বিচ্যুৎ করার সাধ্য কোন কাফিরের নেই। সুরা আল মায়েদার ৫৪ নং আয়াতে এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “তারা হবেন মুমিনদের প্রতি কোমল ও কাফিরদের প্রতি কঠোর।”

২. নিজেদের মধ্যে বিনয়ী: ঈমানদারদের কাছে তারা বিনম্র, দয়া পরবশ, স্নেহশীল, সমব্যথী ও সুখ-দুঃখের সাথী। নীতি ও উদ্দেশ্য এক হওয়ায় নিজেদের মধ্যে এমনটি পরিলক্ষিত হত। সহীহ হাদীসের বর্ণনানুসারে “পারস্পরিক স্নেহ-ভালবাসার ক্ষেত্রে মুমিনরা হবে একটি দেহের মত।” অপর বর্ণনায় “তারা একটি প্রাচীরের ন্যায়” অর্থাৎ, যেমনিভাবে প্রাচীরের উপাদানগুলো মজবুত হয়ে প্রাচীরটিকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করে, মুমিনরাও একইভাবে দ্বীনকে হেফাজত করবে।

৩. সর্বদা রুকূ ও সিজদাবনত: এটা হলো আল্লাহর রাসূলের(সা) সাহাবাদের আমলী জিন্দেগীর ব্যাপারে আল্লাহর সাক্ষ্য। দিনের বেলায় জিহাদের ময়দান চষে বেড়ানো এই সাহাবারাই রাত্রিগুলো কাটিয়ে দিতেন রুকূ ও সিজদায়। আল্লাহর সাহায্য ও মাগফিরাত কামনায় তারা অশ্রু বিসর্জন করতেন। বস্তুতঃ ইসলামী আন্দোলনকে তার প্রকৃত মনযিলে পৌঁছাতে হলে এই গুণটি অতীব জরুরী। আব্বাস আলী খানের (রহঃ) একটি উক্তি অনুসারে “ইসলামী আন্দোলনের বিজয় তখন আসবে যখন আন্দোলনের কর্মীদের চোখের পানিতে জায়নামায ভিজে যাবে।”

৪. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তার অনুগ্রহ কামনা: রুকু ও সিজদাবনত হয়ে দুনিয়াবী কোন স্বার্থ-সিদ্ধি তাদের মূল লক্ষ্য ছিলনা, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সকল দ্বীনের উপর ইসলামকে বিজয়ী করা। সূরা আত-তাওবার ৭২নং আয়াতে আল্লাহ বলেন: “সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি।”

৫. চেহারায় সিজদার চিহ্ন বর্তমান: ইবনে আব্বসের (রাঃ) মতে “সুন্দরের ছাপ”, উবাই ইবন কা’বের (রাঃ) মতে কিয়ামতের দিনে চেহারায় নূরের কথা বলা হয়েছে। মুজাহিদের (রাঃ) মতে “আল্লাহভীরুতা, নম্রতা” কারো কারো মতে, অধিক নামায আদায় তাদের চেহারাকে উজ্জ্বল করত। জাবের (রাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি রাতের বেলায় অধিক নামায আদায় করল, দিনের বেলায় তা তার চেহারায় ফুটে উঠবে (সহীহ্ মাওকুফ)। কারো কারো মতে, সৎকার্য অন্তরে নূর, চেহারায় দ্বীপ্তি, রিযিকে প্রবৃদ্ধি ও মানুষের অন্তরে ভালবাসা সৃষ্টি করে। প্রকৃতঅর্থে মানুষের মহৎ নৈতিক চরিত্রের প্রভাব তার চেহারায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোন অহংকারীর চেহারা একজন বিনম্র ও কোমল স্বভাবের মানুষের চেহারা থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। এমনিভাবে একজন দুশ্চরিত্র মানুষের চেহারা একজন সচ্চরিত্র মানুষের চেহারা থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। রাসূল (সাঃ) বলেন, তোমাদের মধ্যে যদি কেউ নিশ্ছিদ্র পাথরের মাঝে লুকিয়েও কোন আমল করে, তারপরও মানুষের কাছে তা প্রকাশিত হয়ে যাবে, যেমনিভাবে তা করা হয় । আহমাদ (হাদীসটির সনদ দূর্বল)।

পূর্ববর্তী কিতাবে সাহাবায়ে কেরামের নৈতিকতার বিবরণ: আল্লাহ তা’আলা বিশেষভাবে সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপার পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাত ও ইনজীলে উল্লেখ করতে গিয়ে চমৎকার একটি উদাহরণ এনেছেন। কৃষক ছোট একটি বীজ বপন করে ফসল ফলায়, যখন কাটার সময় হয় তখন সে ফসলভরা মাঠ দেখে আনন্দে নেচে ওঠে। একইভাবে সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনি আন্দোলনের এ ময়দানে চাষাবাদ করেছেন সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের মাধ্যমে সত্য দ্বীনের বীজ, তাদের এই নিরলস শ্রমের ফলে সর্বশেষ সাহাবীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার। তাদের এই সংখ্যাধিক্য কাফিরদের জন্য অশুভবার্তা ছিল।

মাগফিরাত ও মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতি: দ্বীনের বিজয়বার্তা সাহাবায়ে কেরামের ত্যাগ-কুরবানীর ফসল, পূর্ববর্তী উদাহরণ মোতাবেক এটি তাদের দুনিয়ার সফলতা। এটিই শেষ নয়, আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান হিসেবে সর্বোচ্চ জান্নাতে প্রবেশাধিকার।

আয়াতে কারিমার শিক্ষা :

১. আরবী ২৯ টি হরফ এই আয়াতটিতে রয়েছে।

২. ইসলামী আন্দোলনের সফলতা আল্লাহর সাহায্য ও আন্দোলনের কর্মীদের উন্নত চারিত্রিক শক্তির উপর নির্ভরশীল।

৩. নৈতিক প্রভাব দিয়ে বিরোধী শক্তির উপর প্রভাব বিস্তার। উল্লেখ্য, একদল খ্রিষ্টান ইমাম মালেকের (রহঃ) কাছে সিরিয়া বিজয় করতে আসা সাহাবীদের নৈতিকতায় নিজেদের প্রভাবিত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

৪. কপালের কালো দাগ অধিক রুকূ ও সিজদার আলামত বহন করেনা।

৫. সকল সাহাবী মাগফিরাত ও মহাপ্রতিদানের অন্তর্ভুক্ত।

৬. দ্বীন কায়েমের আন্দোলনে আত্মনিয়োগকারীর দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s