আলো-আঁধারের খেলা (ধারাবাহিক উপন্যাস)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন জুবায়ের হুসাইন

চার.
ভীষণ জোরে সাউন্ড দিয়ে টিভি দেখছে টুকটুকি। হিন্দিতে কথা শোনা যাচ্ছে। হাসি আর চিল্লাচিল্লি।
মাথায় ভীষণ বাজছে সাউন্ডটা মোকাব্বর হোসেনের। ঘরের দরজার পাল্লাটা হালকা ফাঁক থাকায় সাউন্ড ভেতরে চলে আসছে। উঠে গিয়ে যে বন্ধ করে দেবেন, সে ইচ্ছা করছে না। আবার নিষেধও করতে ভালো লাগছে না মেয়েটাকে। দেখুক না যা দেখার। কিন্তু সাউন্ডটা একটু কমিয়ে দেখলে দোষ কী? কেন বোঝে না মেয়েটা এই সাউন্ড তাকে খুব বিরক্ত করছে?
বাম কাতে শুয়ে আছেন বিছানায় মোকাব্বর হোসেন। ডান কাতে শুতে পারেন না এখন আর। ব্যথা করে। আর সারাক্ষণ তো চিনমিনে একটা ব্যথা লেগেই আছে বুকের বাম পাশটায়। থেকে থেকে কাশেন তিনি। যখন কাশির বেগ ওঠে, তখন আর থামতে চায় না। যেন চলতেই থাকবে, যতক্ষণ শ্বাস আছে ততক্ষণ। না, একসময় অবশ্য থেমে যায়, তবে তখন বেশ কাহিল হয়ে পড়েন তিনি। পাক্কা দেড়-দুই মিনিট হাঁফিয়ে তবে শান্ত হওয়া।
প্রচণ্ড পেশাব চেপেছে। উঠে পড়লেন তিনি। এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠল এই সময়।
টুকটুকি হিন্দি সিরিয়ালটার মধ্যে বেশ ডুবে গিয়েছিল। মোতালেব, সালমা এবং সাইমা সবাই নিষেধ করেছেন যেন বেশি সাউন্ডে টিভি না দেখে ও। বাসায় রোগী আছে, তাকে কোনোপ্রকার ডিস্টার্ব করা যাবে না। কিন্তু সেসব বেমালুম ভুলে বসে আছে ও।
সিরিয়ালটা বেশ হাসির। তাই মগ্ন হয়ে সেটাই উপভোগ করছে ও। খালুজানের যে ওষুধ খাওয়ার সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, সেটাও ভুলে বসে আছে। টিভি পর্দার দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছে ও। যেন গোগ্রাসে গিলছে।
হঠাৎ ‘ধপাস’ করে একটা শব্দ হলো। চমকে উঠল টুকটুকি।
শব্দটা এসেছে খালুজানের রুমের দিক থেকে। কলজেটা লাফিয়ে উঠল ওর। দৌড় দিল সেদিকে।
যা ভেবেছিল তাই, পড়ে গেছেন খালুজান। দলামলা হয়ে দরজার উপরে পড়ে আছেন তিনি। পায়ের দিকটাতে পানির একটা ধারাও বয়ে যাচ্ছে।

বিকেলে বাড়ি ফিরে টুকুকে জড়োসড়ো হয়ে দরজার সামনে বসে থাকতে দেখল সাইমা বানু। দেখেই বুঝল কিছু একটা ঘটেছে। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে রে? বাড়ির আর লোকজন কোথায়? আম্মু কোথায়?’
ঘটনা শোনার পর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল সাইমার মাথার ওপর। বইয়ের ব্যাগটা ভেতরে ছুড়ে ফেলেই ছুটল আবার রাস্তার দিকে। একটা রিকশা পেয়ে তাতে উঠে বসল।

হাসপাতালে মোকাব্বর হোসেনের বেড ঘিরে মোতালেব হোসেন, সালমা বানু, ডাক্তার হাবিব আর দু’জন নার্স। হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করল সাইমা।
ডাক্তার হাবিব মোকাব্বর হোসেনের পালস দেখলেন। তারপর নার্সকে কিছু বলে মোতালেব হোসেন ও অন্যদের নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
মোতালেব হোসেন বললেন, ‘কোনো প্রবলেম নেই তো ডক্টর?’
‘না,’ আশ্বস্ত করলেন ডাক্তার হাবিব। ‘আপাতত কোনো প্রবলেম দেখছি না। তবে এরপর থেকে বেশ সাবধানে থাকতে হবে। আজকের দিনটা এখানেই থাক। কাল বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন।’
‘ওহ্ থ্যাংকস লর্ড।’ বললেন মোতালেব হোসেন।
‘ডক্টর, উনার খাওয়া-দাওয়া?’ জিজ্ঞেস করলেন সালমা বানু।
‘আপাতত স্যালাইনই চলুক। আমি রাতে একবার আসব। এখন চলি। বাই।’ চলে গেলেন ডাক্তার হাবিব।
‘আব্বু,’ এই প্রথম কথা বলল সাইমা।
‘ডাক্তার তো বললেনই শুনলে, আপাতত চিন্তার কোনো কারণ নেই। কিন্তু টুকু বাসায় থাকার পরেও…’
‘কেন, ও কী করেছে?’ কিছুটা অবাক সাইমা।
‘নাহ্, ওকে আর রাখা ঠিক হবে না।’ বললেন মোতালেব হোসেন।
‘কিন্তু ওকে না রেখেও কি উপায় আছে? এই মুহূর্তে তুমি নতুন কাজের মেয়ে পাবে কোথায়? আজকাল কাজের মেয়ে পাওয়া যা কষ্টের!’ বললেন সালমা বানু।
‘সে জন্যেই তো কিছু করতে পারছিনে।’
‘ওর আর দোষ কী বলো? সারাদিন একা একা বাসায় থাকে। আর টিভি দেখার পারমিশন তো আমরাই ওকে দিয়েছি।’
‘তাই বলে অতো জোরে সাউন্ড দিয়ে? তার ওপর বাসায় রোগী থাকার পরেও?’
‘যাক গে, ওসব এখন বাদ দাও। আজ তো বাকি রিপোর্টগুলো দেয়ার কথা।’
‘হ্যাঁ, এক কাজ করো, তুমি আর সাইমা এখানেই থাকো। আমি যাচ্ছি। রিপোর্টগুলো নিয়ে আসি। আর বাসায় একটা ফোন করে দিও। বেচারি বড় টেনশনে আছে।’
বলে ওখান থেকে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে গেলেন মোতালেব হোসেন। আর সালমা ও সাইমা চললেন মোকাব্বর হোসেনের কেবিনের দিকে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s