আলো-আঁধারের খেলা (ধারাবাহিক উপন্যাস)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন জুবায়ের হুসাইন

পাঁচ.
অন্ধকার রাত। বাঁশবাগানে জোনাক পোকার আনাগোনা। এই জ্বলে তো এই নেভে। পুকুরপাড়ের এই বাঁশবাগানের চারপাশ ঘিরে যেন আলোর ফুলঝুরি টানিয়ে রাখা হয়েছে।
আলোর ফুলঝুরির সাথে যেন পাল্লা দিয়ে একটানা ‘ঝিঁইইইই……!’ শব্দে ডেকে চলেছে ঝিঁঝিঁ পোকারা। থেকে থেকে কয়েকটা কুকুর সমান বিরতিতে ‘ঘেউ ঘেউউউ…’ করে চলেছে।
দুপুরের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। প্রকৃতি তাই কিছুটা সতেজ এখন। বাতাসে ভেজা ভেজা আবেশটা রয়ে গেছে।
পুকুরের পানি বেশ বেড়ে গেছে কয়েকদিনের বৃষ্টিতেই। বাঁশবাগানের ভেতরে প্রবেশ করবে আর এক ঘণ্টা টানা বৃষ্টি হলেই। বাঁশগাছের গোড়া ছুঁই ছুঁই হওয়ার কারণেই জোনাকের জ্বলা-নেভাটা অন্যরকম এক আবহ তৈরি করেছে।
আজকাল গ্রামের সেই নীরবতা খুব বেশি উপভোগ করা যায় না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দোকানপাট আর পাকা ঘরবাড়ি ও ইলেকট্রিসিটির বদৌলতে অনেক রাত অবদিই জেগে থাকে লোকালয়। আর এই গ্রামটা তো আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে আরও চার-পাঁচ বছর আগে থেকেই। তাই রাত ৯টা সাড়ে ৯টা বাজলেও লোকজনের চলাচল একণও চোখে পড়ে।
ঢাকা-যশোর মহাসড়কের যে স্থানটিতে বুড়িভৈরব নদী ক্রস করতে হয়, তার ঠিক পূর্বপ্রান্তে নদীর ধার ঘেষেই গ্রামটি। গভ. কমার্শিয়াল কলেজের পেছন দিকে মূল গ্রামটা। নদীর পরেই আছে পাশাপাশি দু’টো পুকুর। পূর্ব দিকের পুকুরটার পাড়েই বাড়িটা। প্রায় দশ কাঠা জমির উপর নানান ফলের গাছগাছালির ছোটখাট বাগান একদিকে, অন্যদিকে ছোট তিনটি বিল্ডিয়Ñ শোবার ঘর, যাতে দু’টো রুম, একটি রান্নাঘর ও একটি গোয়াল ঘর। গোয়াল ঘরে প্রায় সবসময় একটা গাভী বাঁধা থাকে। আগে অনেক গরু ও ছাগল ছিল। এখন দেখাশোনার লোকের অভাবের কারণে সব বিক্রি করে দিয়ে এই একটিই গাভী রাখা হয়েছে।
রান্নাঘরটিতে রান্না করছিল শেফালি। কচু শাকের ঘণ্টো আর কাচকলার ঝোল রান্না হচ্ছে। ভাতটা আগেই রাঁধা শেষ হয়েছে। এখন পাতিলটা কাঠের ফ্রেমের উপর উপুড় করে রাখা হয়েছে ফ্যান ঝরানোর জন্য। চুল্লিতে কাচকলার ঝোল খুনতিতে উঠিয়ে বাঁ-হাতের তালুতে দু’ফোঁটা ফেলে জিহ্বা দিয়ে চেখে দেখল শেফালি। হ্যাঁ, লবণ-টবন ঠিক আছে। সড়াটা আবারও উপুড় করে ঢেকে দিল কড়াইটা। সুন্দর একটা ঘ্রাণ ভুর ভুর করছে রান্নাঘরটা জুড়ে।
সাদা-কালো ডোরাকাটা বিড়ালটা চুলার একটু পাশেই দলা পাকিয়ে শুয়ে আছে। ওটার দিকে একবার তাকাল শেফালি। বেশ পুষ্ট শরীর বিড়ালটার। মাছ বা মাছের কাটা কদাচিৎ জোটে, ওদের মতো ভাত খেয়েই কাটাতে হয়। তারপরও তেল চকচকে গায়ের পশম দেখলেই গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। শেফালি তো মাঝে মাঝেই টাইগারকে কোলে নিয়ে ওটার নাকে নিজের নাক ঘষে। তখন বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা মজা লাগা বিষয় ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত শিরা-উপশিরায়।
রান্নাঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো শেফালি। শোবার ঘরের ডান দিকের রুমে প্রবেশ করল ও।
রুমে কোনো আলো নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ডাকল, ‘খালাম্মা? খালাম্মা?’
ভেতর থেকে সাড়া মিলল, ‘ক কী কবি।’
‘না খালাম্মা,’ বলল শেফালি। ‘ক দিন ধরে খালি ঘরের মদ্দি শুয়ে থাকেন। বেশি কথাও কন না।’
কোনো জবাব এলো না এ কথার।
শেফালি আবরও বলল, ‘এভাবে সারাক্ষণ ঘরের মদ্দি পড়ে থাকলি তো শরীর খারাপ করবেনে। খাওয়া-দাওয়াও ঠিকমতো করতেছেন না। খালুজান জানতি পাল্লি শেষে আমারে বকা দেবেনে।’
‘তুই খালি বকবক করিস। যা তো, আমারে একলা থাকতি দে।’
‘হুঁ, তাতো যাব। কিন্তু রান্নাঘরের দিকি একটু আসবেন? কী রান্না করলাম দেখবেন না?’
‘ওসব তুই-ই দেখ। যা এখন। রান্না শেষ হলি আমারে চারডে খাতি দিসেনে।’ একটু থামে কণ্ঠটা। অবশ্য শেফালি এখন ভেতরে কাঠের খাটে পরিচন বিবির শুয়ে থাকা দেহটা আবছা দেখতে পায়। পরিচন বিবি আবার বললেন, ‘মুংলারে খাতি দিইছিস তো?’
‘হুঁ, মুংলার খবর নিয়া হচ্ছে! নিজি যে সকাল থেকে না খেয়ে রয়েছে, সেদিকে খেয়াল নেই। হ্যাঁ, ওরে বিচোলি কেটে দিইছি। এখন একটু ওঠেন। কল থেকে হাতমুখ ধুয়ে আসেন। আমি ভাত দিচ্ছি।’
বের হয়ে এলো শেফালি। ঢুকলো আবার রান্নাঘরে। তরকারির কড়াই থেকে সড়া উঠাতে উঠাতে নিজের মনে গজগজ করতে লাগল, ‘আমার হয়েছে যত জ্বালা। এভাবে না খেয়ে থাকলি শেষে ব্যাইরাম বাধায়ে বসবে, তখন কষ্ট ডবল হবে। খালুজান যে কবে আসবে!’
আরও কী সব বকবক করছিল ও। ন্যাকড়া দিয়ে গরম কড়াই ধরে চুলা থেকে নামিয়ে রাখল। এই সময় বাইরে থেকে কারোর ডাক শুনল, ‘দাদী বাড়ি আছেন? ও দাদী-ই-ই..?’
বাইরে বেরিয়ে এলো আবার শেফালি। হারিকেনটা বাড়িয়ে ধরে দেখল, পাশের বাড়ির বশিরের বউ রোজিনা। শেফালিকে দেখতে পেয়ে বলল, ‘দাদী কই রে শেফালি? ঢাকা থেকে ফোন এয়েছে। তোর খালু কথা কবে।’
দ্রুত পায়ে নিচে নামল শেফালি। বলল, ‘খালুজানে ফোন দিছে? হাচা কচ্ছাও?’
‘হ্যাঁরে হ্যাঁ। এখন দাদীরে ডাক, বেশি দেরি কল্লি বিল পোড়বেনে।’
ততক্ষণে রুমের দরজায় উঁকি দিয়েছেন পরিচন বিবি। বললেন, ‘কিডা?’
‘আমি রোজিনা দাদী।’ বলল রোজিনা।
‘কী হয়েছে? ডাকতিছিস ক্যান্?’
‘তুমার ফোন এয়েছে। ঢাকা থেকে দাদা কথা কবে। জলদি মোবাইল ধরো, কথা কও।’ মোবাইল সেটটা পরিচন বিবির দিকে এগিয়ে ধরল রোজিনা।
‘হ্যাঁলো!’ কেমন কেঁপে উঠল পরিচন বিবির কণ্ঠ। একরকম আবেগও যেন জড়িয়ে আছে তাতে।
মোবাইল সেটটা কানের াসথে সেটে ধরে মোনযোগ দিয়ে ওপাশের কথা শুনলেন। তারপর বললেন, ‘আপনার শরীর এখন কী রকম? ডাক্তার কী কয়েছে? কবে বাড়ি আসবেন।’
আবারও ওপাশের কথা শুনলেন। বললেন, ‘আরও কয়েকদিন দেরি হবে?.. কী কোলেন?… সাইমা আসতি দিতি চায় না?… ও… আচ্ছা, ওরে নিয়েই চলে আসেন না!…. বুঝিছি, কলেজের কেলাস আছে।… হ্যাঁ, না মানে এখনও… আমি কি কখনও একলা একলা… আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসেন। …আছে, শেফালি ভালো আছে। আমারে ম্যালা যতœ কত্তিছে। …মুংলাও ভালো আছে।… কী কলে? সাইমা বু কথা কবে? দ্যাও ওরে।…’
মোবাইলে কথা বলেই চললেন পরিচন বিবি। আবেগে তার কণ্ঠ জড়িয়ে জড়িয়ে আসছে।
সাইমার সাথে কথা শেষ করে সালমা বানু ও মোতালেবের সাথেও কথা বললেন তিনি।
পাশে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল শেফালি ও রোজিনা। পরিচন বিবির আবেগে নিজেরাও আবেগাপ্লুত হতে লাগল।
গোয়ালঘরে মংলা জোরে জোরে কান ঝাড়া দিল। ‘পট পট’ শব্দ হলো বাতাসে।
দূরে কোথাও ‘হুক্কা হুউউ..’ করে একযোগে কয়েকটা শেয়াল ডেকে উঠল। একটু পর ‘ঘেউ ঘেউ’ করে সাড়া দিল একটা কুকুর। তাতে যোগ দিল আরও কয়েকটা কুকুর।
কিছুক্ষণের জন্য যেন জোনাক পোকারাও পিদিম জ্বালানো বন্ধ করে দিল।
পুকুরে ‘ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ’ ডাকতে থাকা ব্যাঙের আনন্দ-উৎসবও থেমে রইল কিছু সময়।
মোবাইল সেটটা রোজিনাকে ফিরিয়ে দিলেন পরিচন বিবি। তারপর অন্ধকার রুমে ঢুকে পড়লেন আবার। একটু পর চাপা কান্নার শব্দ ভেসে আসতে লাগল রুম থেকে।
ওড়নার কোনা দিয়ে চোখ মুছল শেফালি।
রোজিনা বাতাসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছুড়ে দিয়ে নিজের বাড়ির দিকে চলল।
হঠাৎ মেঘের ভাজে এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকে উঠল। পরপরই ‘কড়্ কড়্ড়াৎ’ শব্দে ডেকে উঠল মেঘ।
যেন প্রকৃতির ভেতরে একটা গোপন ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s