আলো-আঁধারের খেলা (ধারাবাহিক উপন্যাস)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন জুবায়ের হুসাইন

ছয়.
সকালটা বেশ সুন্দরভাবে শুরু হয়েছে আজ।
সূর্যটা যথারীতি পুব আকাশে রঙ ছড়াচ্ছে।
পাখিরা ডানা ঝাপটে দিগন্তে উড়াল দিয়েছে আহারের সন্ধানে।
ফুলের বনে ফুলকলিরা পাপড়ি মেলে বাতাসে গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। ভ্রমর-মৌমাছিরা উড়ে উড়ে শোভা বর্ধন করে চলেছে।
অধিকাংশ মানুষই তাদের স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে পাড়ি জমিয়েছে।
এককথায়, চারদিকে কর্মচাঞ্চল্যতা বিরাজ করছে।
মোতাহার স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। বই-খাতা আগেই গুছিয়ে নিয়েছে। খেতে বসেছে ও। পান্তা ভাতের সাথে জাল দেয়া ইলিশ মাছ। বেশ মজা লাগে খেতে।
ইলিশ মাছের পেটি ওর দারুণ পছন্দের।
‘মা যাচ্ছি।’ বলে বেরিয়ে পড়ল মোতাহার।
‘আচ্ছা। সাবধানে যাস্।’ নিজের কাজের মধ্য থেকেই বললেন মা।
বিকেলে বাড়ি ফেরে মোতাহার। রান্নাঘরে থালায় বেড়ে রাখা ভাত খেয়ে নেয়। বেগুনের সাথে ইলিশ মাছ রান্না করা হয়েছে। গোলআলু তো আছেই। এ বাড়িতে প্রায় প্রতিটি তরকারিতেই গোলআলু ব্যবহার করা হয়।
খেয়েদেয়ে খেলার মাঠে ছুটল মোতাহার। ফুটবল ওর প্রিয় খেলা। ওদের পাড়ার সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড় ও। বল একবার পায়ে পেলে হয়, বিপক্ষ দলের সবাইকে ডস্ দিয়ে গোলবারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। অবশ্য সব বার গোল করতে পারে না। আসলে অন্যকে দিয়ে গোল করায় ও। এই তো, গত বছর তমালতলার মাঠে যে ফুটবল টুর্নামেন্টটা হলো, সেখানে ও চারটি ম্যাচে ১০টি গোল করেছিল। এর মধ্যে প্রথম তিনটি ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেছিল। শেষের ম্যাচে ১টি গোল করে। তার দল হেরে যায় এবং কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয়। আসলে বল নিয়ে গোল দেয়ার মুহূর্তে বিপক্ষ দলের গোলকিপার ওর মাথায় আঘাত করেছিল। খেলার বাকি সময়টা ও আর ভালো করে খেরতেই পারেনি। নইলে ফলাফলটা উল্টেও যেতে পারতো।
আজ লালন আসেনি খেলতে। লালন মোতাহারের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তাই খেলায় মন বসাতে পারল না। সারাটা সময় কেবল লালনের অনুপস্থিতির বিষয়টাই মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।
খেলা শেষ হতেই ছুটল লালনদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। লালনের মা জানালেন লালন ওর আব্বার সাথে হাটে গেছে। মোতাহারকে মুড়ি-পাটালি খেতে দিলেন।
দ্রুততার সাথে দুই মুঠ মুড়ি খেয়ে এক টুকরো পাটালি নিয়ে বেরিয়ে এলো মোতাহার। হাটে যাবে। বিশেষ একটা কাজের কথা মনে পড়েছে।
অনেকটা দৌড়ানোর মতো করে হাঁটতে লাগল মোতাহার। হাটটা মোটামুটি দেড় মাইলের দূরত্বে।
হাট লোকে লোকারন্য। হৈ হট্টগোলে কানে তালা লেগে যায়। কিন্তু কেউ বিরক্ত হয় না। আসলে এতে যে সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে!
রাতের হাটটা বেশ জমে উঠেছে। অবশ্য আর বেশিক্ষণ চলবে না হাট।
হনহন করে হাটের পশ্চিম কোনায় কাচা বাজারের দিকে ছুটে গেল মোতাহার। ওর আব্বা ক্ষেতের বেগুন তুলে এনেছেন বিক্রি করতে।
‘আব্বা, পাঁচটা টাকা দ্যাও তো।’
মোকাব্বর হোসেন এক পলক চোখ তুলে তাকালেন ছেলের দিকে। তারপর পাঞ্জাবির পকেট থেকে পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে মোতাহারকে দিলেন। মোতাহার সেটা নিয়েই আবার ছুটল। হাটের প্রায় বিপরীত প্রান্তে লালনের আব্বা মাছ নিয়ে বসেন। এদিকটা মাছের জন্য নির্ধারিত।
‘লালন!’ ডাকল মোতাহার।
লালন চোখ তুলে তাকাল। মুখে কিছু না বলে ভয়ার্ত চোখে ওর আব্বার দিকে তাকাল। লালনের আব্বা টিনের মগে হাত ডুবিয়ে পানি নিয়ে মাছের গায়ে ছেটাচ্ছেন নির্দিষ্ট বিরতিতে। সুযোগ বুঝে আব্বার চোখকে ফাঁকি দিয়ে অন্যপাশে চলে এলো লালন।
মোতাহার ওখানেই অপেক্ষা করছে।
‘কী কবি তাড়াতাড়ি ক।’ বলল লালন।
‘চল।’ বলেই লালনের হাত ধরে টানতে লাগল মোতাহার।
লালন ওকে বাধা দিয়ে বলল, ‘কী করতিছিস? আব্বা আমারে না দেকলি বকা দেবেনে। এখন তোর সাথে যাতি পারব না।’
‘আহ্ আসবি তো!’ লালনের হাতটা ধরে জোরে টান দিল মোতাহার। তাতে হাতে বেশ ব্যথা পেল লালন।
‘উহ্!’ করে ব্যথায় ককিয়ে উঠল। বলল, ‘লাগছেরে। ছেড়ে দে। সত্যিই এখন তোর সাথে যাতি পারব না।’
‘এই দ্যাখ, টাকা আনিছি।’ ডান হাত খুলে পাঁচ টাকার নোটটা দেখাল মোতাহার।
‘কিন্তু…’
‘আহ্, রাখ তো তোর কিন্তু। চল, বাতোসা (বাতাসা) খাব।’
এবার আর না যেয়ে পারল না লালন। ওর মুখটাও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
ফকিরের দোকান থেকে বাতাসা কিনল ওরা। তারপর গিয়ে বসল হাট থেকে খানকিটা দূরে ধান ক্ষেতের আইলের উপরে, পেছনে একটা বাবলা গাছ রেখে।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তারই মাঝে ধান ক্ষেতের আইলে বসে বাতাসা খেতে খেতে গল্প করে চলেছে ওরা। ঘা ঘেষাঘেষি করে বসেছে। একজনের গায়ের গন্ধ অন্যজনের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের অক্সিজেন-কার্বন-ডাই-অক্সাইড লেন দেন হচ্ছে।
গল্পে এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিল ওরা যে লালনের আব্বা এসে কখন ওর পিঠে দমাদম থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছেন গোটা তিনেক, তা ওরা কেউ বুঝতেই পারেনি। বুঝতে পারল তখন, যখন লালনের শরীরের মধ্যে হঠাৎ ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল এবং ওর আব্বা ওকে ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল।
হতভম্বের মতো লালন আর ওর আব্বার গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল মোতাহার।
হাটের দিকে আলো অনেকটা কমে এসেছে। অর্থাৎ সবাই ফিরতে শুরু করেছে বাড়ি। ফেরার কোনো তাড়া নেই কেবল মোতাহারের মধ্যে। বাবলা গাছটায় হেলান দিয়ে বসে আছে ও। যদিও বাবলা গাছের উঁচু নিচু চাল ওর পিঠে দাগ বসিয়ে যন্ত্রণা দিচ্ছে, তারপরও কোনো ব্যথাই যেন অনুভূত হচ্ছে না ওর কাছে।
মনটাই খারাপ হয়ে গেছে ওর। যে উজ্জ্বলতা নিয়ে আজকের দিনটা শুরু হয়েছিল, নিমেষেই সেটা যেন হাওয়া হয়ে গেছে। অন্তত ওর আশপাশটার বাতাসে গুমোট একটা গুনগুনানি হয়েই চলেছে। উপরের আকাশ খণ্ডটাও বুঝি নি®প্র্রভ হয়ে পড়েছে।

মোতালেব হোসেন ছোট ভাইটিকে হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে। কোথায় গেল ও? ইতিমধ্যেই সারা পাড়া খোঁজা হয়ে গেছে।
মোকাব্বর হোসেন নিজেকে সামলে রাখতে পারছেন না। সন্ধ্যায় তো তার কাছ থেকেই পাঁচ পাকা নিল ছেলেটা। তখন যদি জেনে নিতেন টাকা দিয়ে ও কী করবে, কোথায়ই বা যাচ্ছেÑ তাহলে হয়তো হারিয়ে যেত না। তিনিও এদিক-ওদিক খুঁজে চলেছেন। একে ওকে জিজ্ঞেস করছেন।
পরিচন বিবি কেবল শাড়ির আঁচলে মুখ চেপে কান্নাকাটি করছেন। তিনিও এক প্রস্থ সমস্ত পাড়া ঘুরে এসেছেন।
নাজমায়ারা মাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে। বিভিন্নভাবে বোঝাচ্ছে মোতাহার হারিয়ে যায়নি। হয়তো কোনো কাজে গেছে। কাজ শেষ হলেই ফিরে আসবে। কিন্তু কিছুতেই শান্ত হচ্ছেন না পরিচন বিবি।
রাত অনেক হয়েছে। কী মনে করে হাটের দিকটাতে আবারও গেল মোতালেব। প্রতিটি দোকানের আশপাশ আর ছাউনির নিচগুলো টর্চের আলো জ্বেলে খুঁজে চলেছে। নাহ্, কোথাও নেই।
হাটের পিছন দিকটায় চলে এলো মোতালেব। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এদিক ওদিক টর্চের আলো ফেলতে লাগল। একসময় থমকে দাঁড়াল ও। রাস্তা থেকে কিছুটা নিচে ধান ক্ষেতের আইলে বাবলা গাছটার নিচে কেউ যেন শুয়ে আছে। বুকের ভেতরটায় ছ্যাঁত করে উঠল ওর। দ্রুত নেমে গেল রাস্তা থেকে।

পরিচন বিবি এখন বিলাপ বকতে শুরু করেছেন। বারান্দায় বসে খুটিতে থেকে থেকে মাথা ঠুকছেন। পাশে বসে নাজামায়ারা কান্ত হয়ে পড়েছে মাকে সামাল দিতে দিতে। এই মুহূর্তে সেও কাঁদছে। এতক্ষণ যে বল সে পাচ্ছিল নিজের মধ্যে, এখন সেটা হারিয়ে ফেলেছেন। বিভিন্ন কু-চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।
‘ও আমার মুতাহার রে!’ বিলাপ বকছেন পরিচন বিবি।
‘ও ভাই, ভাই তুই কনে গিলি ভাই!’ নাজামায়ারার কণ্ঠেও বিলাপের সুর।
বাড়িটার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে ওদের বিলাপে।
ঠিক এই সময় মোতাহারকে কাধে করে নিয়ে হাজির হলো মোতালেব। পিছে পিছে আসছেন মোকাব্বর হোসেন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s