আলো-আঁধারের খেলা (ধারাবাহিক উপন্যাস)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন জুবায়ের হুসাইন

সাত.
এই ঘটনাটার পর থেকেই মোতাহার কেমন বদলে যায়। চটপটে চঞ্চল ছেলেটা একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেয়। শরীরটাও ক্রমে শুকিয়ে যেতে থাকে।
অবশ্য পড়ালেখা আগের মতোই চলতে থাকে। দুষ্টুমিটা কমে গেলেও খেলাধুলা একেবারে ছেড়ে দেয় না।
লালন আর আগের মতো ওর সাথে মেশে না। দু’জনে হাত ধরাধরি করে হারিয়ে যায় না কোথাও।
মোতাহার স্কুলে যায়, বাড়ি ফেরে, খায়, খেলার মাঠে যায়। সন্ধ্যায় যথারীতি বাড়ি ফিরে আসে।
এভাবেই চলছিল দিনগুলো।
সামনে মেট্রিকের (এসএসসি) টেস্ট পরীক্ষা। প্রস্তুতিও ভালো ওর।
সেদিন ছিল কাস টেনের তথা স্কুল জীবনের শেষ কাস।
সকালে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গুছিয়ে নিয়েছে মোতাহার। খেতে বসেছে। কাচা লঙ্কা দিয়ে পান্তা ভাত।
‘মা, অন্যকিছু নেই?’ জিজ্ঞেস করল ও। আসলে আজকে এই খাবার খেতে ইচ্ছে করছে না। যদিও প্রায় প্রতিদিন সকালেই এই খাবারই খেয়ে অভ্যস্ত ও।
‘না বাজান। কষ্ট করে ওগুলো খেয়ে ন্যাও।’ বললেন মা।
‘ধুর! ডেলি ডেলি এই পান্তা ভাত আর ভাল্লাগে না।’ বিরক্তি ঝরে পড়ল মোতাহারের কণ্ঠে। উঠে পড়ল। তারপর চলে গেল।
পরিচন বিবি কেমন হতভম্ব হয়ে গেলেন। ছেলে কোনোদিন তো পান্তা ভাত খাওয়া নিয়ে এমন করে না। আজ হঠাৎ কী হলো তার? আজ স্কুলে যাওয়ার সময় বলেও গেল না ‘মা যাচ্ছি’।
বাতাসে সেদিন যেন কী একটা কথা ভেসে বেড়াচ্ছিল ফিসফিস করে। চারদিকে তারই ধ্বনি-প্রতিধ্বনি উঠছিল, খুব মৃদুভাবে। কান খাড়া করে না শুনলে শুনতে পাবার কথা না।
তবে পরিচন বিবি ঠিকই শুনতে পেলেন চিনমিনে সেই কষ্টের বারতা। আর তখনই তার কলজেটা ছ্যাঁত করে উঠল। কেমন কু-ডাক ডাকতে লাগল তার মনের মধ্যে।
তখন মাঝ রাত পেরিয়ে গেছে। মকোব্বর হোসেন ও মোতালেব হোসেন কেউই ফিরে আসেনি বাড়ি তখনও। সেই সন্ধ্যায় বেরিয়েছে।
পরিচন বিবি কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারছেন না।
মেয়েটাও কাছে নেই। গত মাসেই বিয়ে হয়েছে তার। এখন তাই তিনি বড় একা!
পাড়ার অনেকেই এসে সান্ত্বনা দিয়ে গেল পরিচন বিবিকে।
এখন পুরো পাড়ায় নিঝুম-নিশ্চুপ। কোথাও কেউ জেগে নেই নিশাচর কিছু প্রাণী বাদে। তবে এই বাড়িটা থেকে মাঝে মাঝেই কান্নার শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে ইথারে, খুব ধীর গতিতে।
প্রায় ফজর ছুঁই ছুঁই বাড়ি ফিরল মোকাব্বর ও মোতালেব।
পরিচন বিবি তখনও বারান্দার খুটিতে হেলান দিয়ে বসে আছেন। চোখজোড়া ফুলে গেছে।
মোতালেব সোজা ঘরে গিয়ে ধপাস করে খাটে শুয়ে পড়ল। অনেক ধকল গেছে শরীরের উপর দিয়ে। কান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে।
মোকাব্বর হোসেন ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলেন পরিচন বিবির সামনে। মুখটা থমথম করছে। মুখে কোনো কথা সরছে না। যেন বোবা হয়ে গেছেন।
পরিচন বিবিও চুপ। কিছুই বলছেন না। যেন বাকশক্তি লোপ পেয়েছে তার।

কারেন্ট চলে গেছে তা প্রায় একঘণ্টা হতে চলেছে। গ্রামের মানুষ লোডশেডিং-টেডিং অতসব বোঝে না। তাই বিরক্তি ঝেরে বলে ওঠে, ‘শালার কারেন্ট, যাওয়ার আর সুমায় পেল না!’ তারপর ‘আহ্ উহ্’ করে কষ্টে ছটফট করতে থাকে।
আগে অবশ্য কারেন্টের এই ঝামেলা ছিল না। তখন দিব্যি গাছের নিচে বসে শুয়ে কাটিয়ে দিত। গরম কাকে বলে তা উপরব্ধিতে আসত না। কিন্তু গ্রামে ইলেকট্রিসিটি আসার পর মানুষগুলো কেমন যেন অলস হয়ে গেছে। এখন আর গাছতলায় বসে শান্তি পায় না। ঘরের সিলিংয়ের বাতাস ছাড়া শরীর জুড়ায় না।
সন্ধ্যা উতরে গেছে অনেকক্ষণ হলো। বাড়িতে বাড়িতে হারিকেন আর মোমবাতির আলো জ্বলছে। হারিকেনও উঠে গেছে অনেকটা। মোমবাতিই বেশি জ্বলতে দেখা যায় লোডশেডিংয়ের রাতগুলোতে।
গরম একটু বেশি লাগাতে বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়ে ছিলেন পরিচন বিবি। শরীর তার অনেকটাই ভেঙে গেছে। গায়ের চামড়াগুলো ঢলঢলে হয়ে গেছে। দৃষ্টিশক্তিও কমে এসেছে।
আজ অনেক দিন পর ওই ঘটনাগুলো কেন মনে পড়ল তা তিনি নিজেও জানেন না। কেমন তাই আনমনা হয়ে রইলেন তিনি।
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। জোছনা ঢালছে পৃথিবীর বুকে। চাঁদকে ঘিরে কিছু তারাও ফুটেছে। ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে তারাদের মেলা। কিছু তারা মিটমিট করে জ্বলছে। ওগুলো থেকেই যেন বেশি আলো ঝরছে।
চাঁদের বেশ খানিকটা তফাতে একটা বড়সড় তারা জ্বলছে। ওটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন পরিচন বিবি। বোধহয় ওটার মধ্যেই নিজের ছেলেকে খুঁজলেন। ওই তারাটা যেন তারই মোতাহারের প্রতিচ্ছবি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s