দ্বীন প্রতিষ্ঠায় যুবসমাজের ভূমিকা- ১ম পর্ব

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী

এ পৃথিবীতে মানুষের জীবনকে মোটামুটি তিনটি স্তরে বিভক্ত করা যায়। শৈশব, কৈশোর ও বার্ধক্য। শৈশব ও কৈশোর অবস্থায় তেমন কোন সুষ্ঠু চিন্তার বিকাশ ঘটে না। পক্ষান্তরে বার্ধক্য অবস্থায় আবার চিন্তা শক্তির বিলোপ ঘটে। কিন্তু যৌবনকাল এ দুইয়ের ব্যতিক্রম। যৌবনকাল মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বা সম্পদ। এ সময় মানুষের মাঝে বহুমুখী প্রতিভার সমাবেশ ঘটে। যৌবনকালে মানুষের চিন্তাশক্তি, ইচ্ছা শক্তি, মননশক্তি, কর্মশক্তি, প্রবলভাবে বৃদ্ধি পায়। এক কথায় এ সময় মানুষের প্রতিভা, সাহস, বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি গুণের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। এ সময়েই মানুষ অসাধ্য সাধনে আত্মনিয়োগ করতে পারে। যৌবনের তরতাজা রক্ত ও বাহুবলে শত ঝড়-ঝাঞ্ঝা উপেক্ষা করে বীর বিক্রমে সামনে অগ্রসর হয়। এ বয়সে মানুষ সাধারণত পূর্ণ সুস্থ ও অবসর থাকে। তাই এটাই হচ্ছে আল্লাহর পথে নিজেকে কুরবানীর উপযুক্ত সময়। ডাঃ লুৎফর রহমান বলেন, ‘গৃহ এবং বিশ্রাম বার্ধক্যের আশ্রয়। যৌবনকালে পৃথিবীর সর্বত্র ছুটে বেড়াও, রত্নমাণিক্য আহরণ করে সঞ্চিত কর, যাতে বৃদ্ধকালে সুখে থাকতে পার’। জর্জ গ্রসলিভ বলেন, ‘যৌবন যার সৎ ও সুন্দর এবং কর্মময় তার বৃদ্ধ বয়সকে স্বর্ণযুগ বলা যায়’। তাই যৌবনকালকে নে‘মত বলে গণ্য করা যায়।

এই অমূল্য নে‘মতের যথাযথ সংরক্ষণ এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করা সকল মুসলিম যুবকের নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ছা.) মূল্যবান উপদেশ দিয়ে গেছেন। রাসূল (ছা.) জনৈক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘পাঁচটি বস্তুকে পাঁচটি বস্তুর পূর্বে গুরুত্ব দিবে এবং মূল্যবান মনে করবে। (১) বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে (২) অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে (৩) দরিদ্যতার পূর্বে সচ্ছলতাকে (৪) ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে এবং (৫) মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে’।*১*

উল্লেখিত হাদীছে বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকালকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং যুব সম্প্রদায়কে তাদের যৌবনকালকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে এবং স্বীয় বিবেককে সদা জাগ্রত রাখতে হবে। যাতে করে কোন অন্যায়-অনাচার, পাপাচার-দুরাচার ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড যৌবনকালকে কলঙ্কিত করতে না পারে। অপরদিকে ন্যায়ের পথে, কল্যাণের পথে যৌবনের উদ্যোগ ও শক্তিকে উৎসর্গ করতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তরুণ ও বৃদ্ধ সকল অবস্থায় বেরিয়ে পড় এবং তোমাদের মাল ও জান দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম পন্থা, যদি তোমরা বুঝ’ {তওবা ৪১}

মানব জীবনের তিনটি কালের মধ্যে যৌবনকাল নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ। মানুষের জীবনের সকল কল্যাণের সময়, আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় হবার সময়, নিজেকে পুণ্যের আসনে সমাসীন করার সময় এ যৌবনকাল। এ কালের উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষ সকলের কাছে সম্মানের পাত্র হয়। আবার একালই মানুষের জীবনে নিয়ে আসে কলংক-কালিমা, নিয়ে আসে অভিশাপ, পৌঁছে দেয় আল্লাহর আযাবের দ্বারপ্রান্তে। তাই যৌবনকাল মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। ক্বিয়ামতের দিন এই যৌবনকাল সম্পর্কে মানুষকে জওয়াবদিহি করতে হবে। হাদীছে এসেছে, ইবনু মাসঊদ (রা.) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করীম (ছা.) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন আদম সন্তানের পা তার প্রভুর সম্মুখ থেকে একটুকুও নড়াতে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি প্রশ্ন করা হবে। (১) সে তার জীবনকাল কি কাজে শেষ করেছে, (২) তার যৌবনকাল কোন কাজে নিয়োজিত রেখেছিল, (৩) তার সম্পদ কোন উৎস থেকে উপার্জন করেছে, (৪) কোন কাজে তা ব্যয় করেছে এবং (৫) যে জ্ঞান সে অর্জন করেছে, তার উপর কতটা আমল করেছে’।*২*

সাত শ্রেণীর লোককে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আরশের নীচে ছায়া দান করবেন। যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণী হ’ল ঐ যুবক যে, তার যৌবনকাল আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে। যৌবনের সকল কামনা-বাসনা, সুখ-শান্তির ঊর্ধ্বে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করাকেই সে কেবলমাত্র কর্তব্য মনে করত। শরী‘আত বিরোধী কোন কর্ম যেমন- শিরক, বিদ‘আত, যেনা-ব্যভিচার, সূদ-ঘুষ, লটারী-জুয়া, চুরি-ডাকাতি, লুটতরাজ, সন্ত্রাসী কোন অপকর্মে সে কখনো অংশগ্রহণ করত না। এইরূপ দ্বীনদার চরিত্রবান আল্লাহ ভীরু যুবককেই আল্লাহ পাক আরশের নীচে ছায়া দান করবেন।

হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘সাত শ্রেণীর লোককে আল্লাহ তাঁর ছায়া দিবেন; যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক, (২) সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতে বড় হয়েছে, (৩) সে ব্যক্তি, যার অন্তর সর্বদা মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, (৪) এমন দুই ব্যক্তি, যারা আল্লাহর ওয়াস্তে পরস্পরকে ভালবাসে। আল্লাহর ওয়াস্তে উভয়ে মিলিত হয় এবং তাঁর জন্যই পৃথক হয়ে যায়, (৫) এমন ব্যক্তি, যাকে কোন সম্ভ্রান্ত সুন্দরী নারী আহবান করে আর সে বলে, আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং (৬) ঐ ব্যক্তি, যে গোপনে দান করে। এমনকি তার বাম হাত জানতে পারে না, তার ডান হাত কি দান করে। (৭) এমন ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে আর তার দুই চক্ষু অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে’।*৩* সুতরাং যুবকদের শ্রেষ্ঠ সময়কে আল্লাহর রাস্তায় ও তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করতে হবে।

যুবকদের মাঝে দু’টি বৈশিষ্ট্য আছে : যেমন কোন কিছু প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুবকরা যেমন বদ্ধ পরিকর, তেমনি কোন কিছু ভাঙ্গনেও তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এদের শক্তি হচ্ছে এদের আত্মবিশ্বাস। এরা যৌবনের তেজে তেজোদ্দীপ্ত। তাই জাতীয় কল্যাণ প্রতিষ্ঠাও এদের কাছে অসম্ভব নয়। এদের দুর্দমনীয় শক্তিকে ন্যায়ের পথে চালিত করলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা হওয়া যেমন মোটেই অসম্ভব নয়, তেমনি অন্যায়ের পথে পরিচালিত করলে অন্যায় প্রতিষ্ঠা হওয়াও মোটেই অস্বাভাবিক নয়। যুবশক্তিকে তাই ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে কাজে লাগাতে হবে।

সংগ্রাম যৌবনের ধর্ম একথা সর্বজন বিদিত। যুবমন সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ। যুবমন সমাজে সংগ্রাম করতে চায় সকল অন্যায় ও অধর্মের বিরুদ্ধে, অসত্য ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে। অন্যায়ের প্রতিবাদ, মযলূমের পক্ষে জিহাদ, নিপীড়িতের পক্ষে আত্মত্যাগ নবীনেরা যতটুকু করতে পারে, প্রবীণেরা ততটুকু পারে না। নির্যাতিত মানুষের ব্যথায় তরুণেরা ব্যথিত হয় বেশী। নিজেদের ব্যক্তিগত ক্ষতি স্বীকার করেও তারা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যায়। যুবমন সংগ্রামী নেতৃত্বের পিছনে কাতারবন্দী হয় এবং নিজেরা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়। তাই দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাগ্রে যুবকদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে।

আজকের সমাজ এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবমান। ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কোথাও সুনীতি নেই। যার কারণে ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধ, হত্যা, লুণ্ঠন, যুলুম-অত্যাচার প্রভৃতি পাপাচার বিশৃংখলায় দেশ আজ অবক্ষয়ের প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছে। জাতির ভাগ্যাকাশে এখন দুর্যোগের ঘনঘটা। সামাজিক অবক্ষয়, সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকটে জাতীয় জীবন সংকটাপন্ন। সামাজিক জীবনে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি জাহেলিয়াতের যুগকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। বেকারত্বের অভিশাপে দেশে হতাশা ও নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিকৃত রুচির সিনেমা, রেডিও-টিভির অশালীন অনুষ্ঠান, অশ্লীল চিত্র জাতীয় যুবচরিত্রের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করছে। নারী প্রগতির নামে নানাবিধ বেহায়াপনার উৎস খুলে দেওয়া হয়েছে। দেশের এ যুগ সন্ধিক্ষণের ঘোর অমানিশায় আজকের সমাজ তাকিয়ে আছে এমন একদল যুবকের প্রতি, যারা হবে মানবতার মুক্তির দূত, শান্তি পথের দিশারী, ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন মহামানব রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর পদাংক অনুসারী এবং নির্ভেজাল তাওহীদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে দ্বিধাহীন। ইসমাঈল হোসেন সিরাজী তাদের কথাই বলেছেন এভাবে,

আশার তপন নব যুবগণ
সমাজের ভাবী গৌরব কেতন
তোমাদের পরে জাতীয় জীবন
তোমাদের পরে উত্থান পতন
নির্ভর করিছে জানিও সবে।

আগামী পর্বে সমাপ্ত ইন্‌শাআল্লাহ …

রচনাঃ
হারূনুর রশীদ
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

*১* তিরমিযী, মিশকাত হা/৫১৭৪; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/৩৩৫৫; ছহীহুল জামে‘ হা/১০৭৭।
*২* তিরমিযী হা/২৪১৬, ‘ক্বিয়ামত’ অধ্যায়।
*৩* বুখারী, হা/১৪২৩, ৬৩০৮; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৭০১।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s