আলো-আঁধারের খেলা (ধারাবাহিক উপন্যাস)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন জুবায়ের হুসাইন

আট.
মোকাব্বর হোসেন আজ একাই বেরিয়েছেন। ঘরে শুয়ে-বসে থাকতে আর একদম ভাল্লাগে না। এখানকার বাতাসও কেমন যেন ভারী, গুমোট বাধা। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়।
মোকাব্বর হোসেন হাঁটছেন। অবশ্য হাঁটাও অত সহজ নয়। মানুষে গিজগিজ করছে অলিগলি কিংবা মেইন রাস্তাÑ সর্বত্র।
প্রচণ্ড গরম পড়ছে। গায়ের পাঞ্জাবিটা ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে। কেমন অস্বস্তিকর একটা অনুভূতি তাকে কাবু করে দিচ্ছে।
একটু গাছের ছায়া খুঁজল মোকাব্বর হোসেনের চঞ্চল দৃষ্টি। কিন্তু গাছপালার কোনো চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না আশপাশে। না না, ওই তো একটা বড় গাছ। রাস্তার ঠিক ধারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কৃষ্ণচূড়া গাছটা।
দ্রুত সেদিকেই এগিয়ে গেলেন তিনি। যাওয়ার পথে কয়েকজনের সাথে ঢাক্কাও কেলেন।
কৃষ্ণচূড়ার নিচে বসে পড়লেন মোকাব্বর হোসেন। হাঁ করে হাঁফাতে লাগলেন।
গাছের নিচে কিছুটা বাতাস আছে। অল্পক্ষণেই শরীরটা একটু ঠাণ্ডা হয়ে এলো। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। গ্রামে কত গাছের নিচে কতবার তিনি শুয়ে থেকেছেন!
চারদিকে হইহট্টগোল। কান ভারী হয়ে আসে তার। মাথার ভেতরটা কেমন ঝিম মেরে আছে।
‘এই বাদেম বাদেএএম…’ এক বাদামওয়ালা হেঁকে যায়। ‘ছার বাদাম দিমু?’ কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় থেমে জিজ্ঞেস করে বাদামওয়ালা ছেলেটা।
‘না বাবা।’ জবাব দেন মোকাব্বর হোসেন।
বাদামওয়ালা চলে যায়।
মোকাব্বর হোসেন ঘাসের উপর শুয়ে পড়েন। মাথার নিচে দু’হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অনেকক্ষণ। এখান থেকে আকাশটাকে বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ঢাকা শহরে এসে এই প্রথমবার পরিষ্কার আকাশ দেখলেন তিনি।
মাথার ভেতর অনেকগুলো কথা ঘুরপাক খাচ্ছে তার। কোনোটাই স্পষ্ট হচ্ছে না। একটার সাথে আরেকটা কেমন জট পাকিয়ে ফেলছে।
আকাশের পানে শূন্য দৃষ্টি ফেলে তিনি ভেবে চলেছেন, অস্পষ্ট ভাবনা। হটাৎ তার চোখের বাম পাশটায় গরম কিছু একটা পড়ল। সম্বিৎ ফিরে পেলেন তিনি। একটা কাক বসে আছে কৃষ্ণচূড়ার ডালে। বুঝতে আর বাকি রইল না ব্যাপারটা।
উঠে বসলেন তিনি। বাম হাত দিয়ে চোখের পাশটা মুছে ঘাসে হাত ঘষলেন। কেমন বিদঘুটে একটা হালকা গন্ধ ছড়াচ্ছে জিনিসটা।
মনটাই তেতো হয়ে গেল মোকাব্বর হোসেনের। চোখেমুখে একরাশ ঘৃণা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ফিরে চললেন বাড়ির দিকে।

মোতালেব হোসেন তিনরুমের বাসাটা ভাড়া নিয়ে থাকেন। সাততলা বিল্ডিংয়ের তিনতলার বামের দিকের ফ্যাট এটি।
ড্রয়িং রুমে বসে আছেন তিনি, সালমা বানু এবং তাদের মেয়ে সাইমা বানু। তার ডান হাতের কনুইয়ের ঠিক ওপরটাতে একটা ব্যান্ডেজ বাধা। এক জায়গায় লাল মতো হয়ে উঠেছে। রক্তের চিহ্ন।
ঘটনাটা দ্বিতীয়বারের মতো বলছেন মোতালেব।
অফিস থেকে ফিরছিলেন তিনি। আসার পথেই ছিনতাইকারীর খপ্পড়ে পড়েন। মোবাইল, পাঁচ হাজার টাকাসহ মানিব্যাগ এবং হাতঘড়িটা ছিনিয়ে নেয় তারা। ধস্তাধস্তি করার এক পর্যায়ে তার ডান হাতে ধারাল ছোরা খোচা রাগে। পার্শ্ববর্তী একটি কিনিকে গিয়ে ব্যান্ডেজ করে বাড়ি ফেরেন তিনি।
মোকাব্বর হোসেন এখনও ফেরেননি। সন্ধ্যা উতরে যেতে বসেছে। কোথায় গেলেন তিনি? কোনো বিপদ ঘটল না তো?
সবার মধ্যেই টেনশন হতে লাগল।
মোতালেব অসুস্থ শরীর নিয়েই ঘরময় পাইচারি করতে লাগলেন।
সাইমা পড়তে যেতে পারছে না। ইচ্ছে করছে না বই নিয়ে বসতে। কোথায় গেলেন দাদুভাই? এই শহরের সবকিছুই তো তার অচেনা।
সালমা বানু চেয়ারে বসে মাতায় হাত দিয়ে চিন্তা করছেন।
টুকটুকিও চিন্তা করছে। এ কয়দিনে খালুজানের প্রতি বেশ মায়া জমে গেছে তার। খুব খারাপ লাগছে। তার কিছু হয়ে গেলে খুব কষ্ট পাবে বেচারি।
‘নাহ্,’ বললেন সালমা বানু। ‘আব্বার এভাবে বাইরে যাওয়া ঠিক হয়নি। যদি কোনো…’
‘আমার খুব টেনশন হচ্ছে।’ পাইচারি করতে করতেই বললেন মোতালেব।
সাইমা বলল, ‘দাদুর কী দোষ? সারাক্ষণ বদ্ধ ঘরের মধ্যে আটকা থাকতে থাকতে বোরিং হয়ে গেছেন। তাইতো একটু খোলা হাওয়া-বাতাসের জন্য বাইরে গেছেন। গ্রামের মানুষ, এই বদ্ধ জায়গায় নিশ্চয়ই দম আটকে যাচ্ছিল তার।’
‘কিন্তু তাই বলে এভাবে হুট করে বাইরে চলে যাবেন?’ কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না সালমা বানু। ‘যদি কিছু একটা হয়ে যায়…’
‘আহ্!’ স্ত্রীকে থামিয়ে দিয়ে বললেন মোতালেব হোসেন। ‘অলুুনে কথা বোলো নাতো। এখন কী করা যায় তাই বলো।’
এই সময় ‘কুক কুক কুক কুক’ করে কলিং বেল বেজে উঠল।
‘ওই বোধহয় এসেছেন দাদুভাই।’ বলে লাফিয়ে উঠল সাইমা। এগিয়ে গেল দরজা খুলে দিতে।
হ্যাঁ, মোকাব্বর হোসেন ফিরে এসেছেন।
‘কোথায় গিয়েছিলেন আব্বা কাউকে কিছু না জানিয়ে?’ দরজা দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই জিজ্ঞেস করলেন মোতালেব।
মোকাব্বার হোসেন হাঁফাচ্ছেন হাঁ হাঁ করে। কম্পিত পায়ে গিয়ে বসলেন সোফায়। সাইমা দাদুকে ধরে বসতে সাহায্য করল।
‘একটু বাইরে ঘুত্তি গিইলাম। বন্ধ ঘরে থাকতি আর ভাল্লাগছিল না।’ বেশ কষ্ট করেই কথাগুলো বললেন মোকাব্বর।
টুকটুকি ঠাণ্ডা এক গেলাস পানি নিয়ে এলো, কেউ কিছু বলার আগেই। পানিতে লেবুর রস ও চিনি গুলিয়ে দিয়েছে। ও জেনে গেছে লোকটি লেবুর শরবত বেশ পছন্দ করেন।
মোকাব্বর শরবতের গেলাসটা টুকটুকির হাত থেকে নিল। তারপর তিন নিঃশ্বাসে পান করা শেষ করল। স্বস্তির একটা শ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিরে।
তিন নিঃশ্বাসে পানি খাওয়া সুন্নাত। এটা তিনি বরাবরই পালন করেন। কখনও ব্যতিক্রম হয় না।
‘তোর হাতে কী হয়েছে মোতালেব?’ হঠাৎ মোতালেবের দিকে নজর পড়তেই জিজ্ঞেস করলেন মোকাব্বর হোসেন।
‘ও কিছু না আব্বা, রাস্তায় পড়ে গিয়ে ছড়ে গেছে।’ চটজলদি জবাব দিলেন মোতালেব। মিথ্যা কথাটা বলতে গিয়ে গলাটা বোধহয় একটু কেঁপেও উঠল।
সালমা বানু আড়চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন। চোখাচোখি হলো তাদের। মোতালেব ইশারায় চুপ থাকতে বললেন।
সাইমাও বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা। মানুষটাকে প্রকৃত ব্যাপারটা জানাতে চায় না। তিনি জানলে অসুস্থ শরীরে চাপ সহ্য করতে নাও পারেন। তাতে আরো অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন তিনি।
‘শোন্, আমি বাড়ি যাব। কালই আমারে বাড়িতি দিয়াসপি (দিয়ে আসবি)।’ বললেন মোকাব্বর।
‘না আব্বা, আপনাকে আরও কিছুদিন এখানে থাকতে হবে।’ মানা করলেন মোতালেব। ‘দশদিন পর আরেকটা চেকআপ আছে। ওটা করা হলেই আপনাকে বাড়িতে রেখে আসব।’
‘কিন্তু আমার তো আর ভালো লাগে না এখানে। ওদিকে তোর মা একলা রয়েছে।’
‘মায়ের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না আব্বা। আপনি চাইলে মাকেও এখানে নিয়ে আসি।’
‘না খোকা, এমনিতেই আমি তোদের অনেক কষ্ট দিচ্ছি। অনেক খরচ হচ্ছে তোদের। তোর মাকে এনে আরও খরচ বাড়াতি চাইনে।’
‘দাদুভাই,’ বলে উঠল সাইমা। ‘তুমি আমাদের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছ? এসব কী বলছ তুমি? খবরদার! এসব কথা আর কখনও বলবে না।’ দাদুর গলা জড়িয়ে ধরল সাইমা।
‘কথাটা তো মিছে না দাদুভাই। আমি জানি জিনিসপত্রের দাম কেমন। বাড়িভাড়া, কারেন বিল, পানি বিল, গ্যাসের বিল- এসব দিতি হয় তোদের। এরপরে আছে সাইমার পড়ালিখার খরচ। তাই আমি বলছিলাম…’
আব্বাকে থামিয়ে দিলেন মোতালেব হোসেন। বললেন, ‘আব্বা, আপনি খালি আমাদের খরচের দিকটাই দেখলেন। আপনি এবং মা কি আমাদের জন্যে কম করেছেন? আমাদের মানুষ করতে যেয়ে নিজেরা ভালোভাবে কিছু খাননি, ভালো কাপড় পরেননি। আর আপনার জন্যে কিছু করাকে আমাদের জন্য কষ্টের কারণ বলছেন!’ আবেগে জড়িয়ে এলো তার কণ্ঠ।
‘রাগ করিসনে খোকা। আসলে আমি…’
‘তোমরা ওসব আবেগময় কথা থামাও।’ মাঝখানে বলে উঠলেন সালমা বানু। ‘আমি চা-নাশতা নিয়ে আসছি।’ বলে কিচেনের দিকে চলে গেলেন।
চলবে .  . . . . . . .. . . .. . . . . . ………

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s