ধারাবাহিক উপন্যাস “প্রজ্জ্বলিত সত্য”

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন নাসু

১,
সকাল নিজেকে প্রকাশ করছে।তবে সে অস্থির বা চন্চল কোনটায় নয়।বরং শান্ত ওশুভ্রতার সমস্ত ধাপ পরিপূর্ণ করে সে প্রকাশিত হচ্ছে। খুব ধীরে ধীরে স্নীগ্ধ হয়ে উঠছে। হালকা ঠান্ডা বাতাস বুলিয়ে দিচ্ছে ফজরের নামাজ পড়ে ফিরে আসা মসজিদের মুসল্লী দের পবিত্র শরীরে।সকাল প্রকাশিত হচ্ছে।নিবিড় অনুগত হয়ে নিজেকে প্রকাশ করছে সকালের ধীরতা আর স্থীরতা সত্যেও ল্যাম্পপোষ্টে জ্বালানো বাল্পগুলো পরাজিত হতে চলেছে।এরপর পরিপূর্ণসকাল আগমণের বারোতায় ল্যাম্পপোষ্টের আলোগুলো ব্যর্থ হয়ে গেলো।পরাজিত সৈণিকের মতো মুখ গোমড়া লাগছে লাইটগুলোকে।পরাজিত তো হতেই হবে লা্ইটগুলো যে মানুষের তৈরী। আর সকাল তৈরী করেছেন মানুষের স্রষ্টা,একচ্ছত্র অধিপতি,রাহমানুর রহীম আল্লাহ রব্বুল আলামীন। দু ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লেঅ আনিকা আনজুমের দুচোখের কোণ বেয়ে কোমল কন্ঠে :মণিকা তুই যেমন সুন্দর করে বলতে পারছিস দেখতে বোধহয় আরো সুন্দর প্রাণবন্ত তা্ইনারে? মণিকা মুমতাজ বোনের অশ্রু মুছে দিলো :এ সৌন্দর্য় ভাষায় খুব কমই প্রকাশ করা যায় তুমি ঠিকই বলেছো আপু। আনিকা ও মণিকা বেলকণিতে বসে আছে দুজনই খুব ইমোশনাল দুজনের ব্যাপারে। ওরা দু বোন জমজ।

কিন্তু মণিকা আনিকার একঘন্টা পরে জন্মেছে বলে মাঝে মাঝে ভাবগম্ভীর মূহুর্ত গুলোতে আপু বলে। অন্য সবসময়ই নাম ধরে ডাকে। আনিকা চার বছর আগে সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে অন্ধ হয়ে গেছে।আনিকা অনার্স থার্ড ইয়ারে বায়ো কেমিষ্ট্রিতে পড়ছে আর মণিকা মেডিকেলে তিন বছর পেরিয়ে এসেছে।ওদের বাবা হারিয়ে গেছেন প্রায় বছর বিশ বছর আগে। আনিকার মায়ের সাথে কথা কাটাকাটি করে। আর ফেরেননি। ওদের বাবা আফসার উদ্দিন নামকরা ব্যারিষ্টার ছিলেন। আর ওদের মা রোকেয়া আফসার স্বামী চলে যাবার পর অনেক কষ্টে মেয়েদেরকে মানুষ করেছেন । দু বছর হলো তিনিও দুজনকে ছেড়ে পরোপারে পাড়ি জমান। ওরা ওদের নিজেদের বাড়িতেই আছে। অভিভাবক হিসেবে আছেন ওদের চাচা আকরাম উদ্দিন। এখনও বিয়ে করেননি। আনিকারা আশুলিয়ায় থাকে।

দো তলা বিল্ডিং,ওরা জন্মের পর থেকেই দেখছে।মণিকা সুন্দর কিছু দেখলেই আনিকাকে বর্ণনা করতে থাকে। আর আনিকা মনের চোখ দিয়ে উপলব্ধি করতে থাকে। মণিকা এবার বললো : আনিকা চলো নাস্তা করি,বুয়া মনে হয় অপেক্ষা করছে।আনিকা দাড়াতে দাড়াতে :চাচা কী বের হয়েছেন?
:না মনে হয়। আর যাবার আগেতো বলেই যাবেন। আমারো বেরুতে হবে।
টেবিলে বসে
আনিকা বললো,
:এই যাতায়াতে তোর কতো কষ্ট হয় বলতো? মণিকা আনিকার প্লেটে পরোটা তুলে দিয়ে :এই তুই চুপ করবি? এক কথা এতোদিন বলিস কী জন্য? আনিকা একটু অবাক হেসে :একেবারে তুই?
মণিকা মুখের জুস শেষ করে,
:আরে এক ঘন্টা খুব বেশী সময়না। একটু থেমে, :তোমার সাথে থাকতে পারি,একজন উত্তম সংগী হিসেবে তোমাকে কাছে পাই, সেক্ষেত্রে যাতায়াতের কষ্টটা কিছু নয়।তুমি কলেজ যাবে?
আনিকা বললো :না যাবোনা। এই প্রতিদিন সি এন জিতে কতো খরচ হয় বলতো?
ওদের চাচা আকরাম উদ্দিন চুল আচড়াতে আচড়াতে রুম থেকে বের হলেন,
:আনিকা ক্লাস না করলে ভালো রেজাল্ট করা যায়না মা,আর খরচ?এর জন্যতো আলাদা করে কারো কষ্ট করতে হয়না। মণিকাকে লক্ষ করে,তুমিতো ওদের কলেজ হয়েই যাও?
মণিকা বললো :হ্যা প্রায় । কিন্তু চাচা ওদের ক্লাসতো দশটায়।আমার যে এখুনই বেরুতে হবে।
আনিকা মলিন কন্ঠে:আজ আমার যেতে ইচ্ছে করছেনা।
আকরাম উদ্দিন চায়ে দুবার চুমুক দিলেন :আচ্ছা ঠিক আছে,বাসায় থাকো,আর নোটগুলো কী রেকর্ড করে দিয়েছো মণিকা?
মণিকা উঠে দাড়িয়ে:হ্যা চাচা দিয়েছি,তবে আর দুটো উত্তর রেকর্ড করা বাকী আছে,আজকে করে দেবো। মণিকা উঠে দাড়ালো, খুব দ্রুত রেডী হয়ে বেরুলো।
আবরাম উদ্দিন বুয়ার দিকে তাকিয়ে:বুবু আনিকার প্রয়োজনীয় সব দিয়ে যেও আর আনিকা আমি বা মণিকা ফিরলে তোমাকে মোবাইলে কল দেবো। বেল বাজলে খুলবেনা। আনিকা সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালে চলে গেলেন আকরাম উদ্দিন।

আনিকা বুয়াকে গেট লাগাতে বলে নিজের রুমে গেলো। রেকর্ডার অন করলো। গত পরশুদিন মণিকা দুটো উত্তর রেকর্ড করে দিয়েছে,আয়ত্ব করতে হবে। আনিকা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। প্রায় আধাঘন্টা ধরে একটা উত্তর শুনে খাতায় লিখে ফেললো। আনিকা রেজাল্টও ভালোই করে। ব্যাবহারিক গুলোতে ওর ফ্রেন্ডরা ওকে খুব হেল্প করে। আনিকার খুব প্রিয় একজন লেকচারার মিসেস তানিয় তানভীর আনিকার বাসায় এসে আনিকাকে ব্যাবহারিক গুলো শিখিয়ে দিয়ে যান। একটু খানি মানবিকতা থাকলে,এমন ভালো ষ্টুডেন্টদের জন্য অনেক কিছুই করতে পারেন টিচাররা। কিন্তু সবাই তা করেনা।আনিকার শালিন আচরণ তানিয়া তানভীর বেশ পছন্দ করেন। আনিকা দুটোই আয়ত্ব করে লিখে ফেললো। এবার কনফার্ম হওয়ার জন্য নিজে কিছু অংশ বলে আবার সেই অংশ রেকর্ডার অন করে শোনে। আবার বন্ধ করে পরের অংশ বলে। এভাবেই চলতে থাকে আনিকার পড়াশুনার অব্যাহত ধারা। পড়া শেষ করার সাথে সাথে ওর মোবাইল বেজে উঠলো, মোবাইল ড্রেসিনের উপরে রাখা আছে। শব্দ অনুসরণে এগিয়ে গিয়ে রিসিভ করলো। মনিকা কল করেছে।
আনিকা বললো:তোর কী ক্লাস শেষ?
মণিকা ওপাশ থেকে:না তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করলো,দশ মিনিটের অবকাশ পেয়েছিতো!
আনিকা খুশি হলো: তুমি খুব ভালো মণিকা।
মণিকা হেসে উঠে:ভালো বলতে বুঝি তুমি বলতে হয়!
আনিকাও হাসলো:বাসায় ফিরবি কখন?
:সন্ধার আগেই ফিরে আসবো। তুমি কী করছো?
:পড়া শেষ করলাম এখন গোসল সেরে নেবো।বুয়া এসে দাঁঢ়িয়ে আছে আনিকার পাশে,কিন্তু ও বুঝতে পারেনি। আনিকার কথা শেষ হলে বললো:খালা আইজ কী পাক কইরবো?
আনিকা একটু ভেবে:ফ্রিজে কী কী আছে?
বুয়া আয়েশ করে বলতে লাগলো:ইলিশ মাছ শিং মাছ,মুরগী,খাসির মাংস,কাঁচ কলা,বেগুন ঢেঁড়স,এরপরে……
আনিকা থামিয়ে দিলো: ঠিক আছে আপনি সরষে ইলিশ,খাসির মাংস,ডাল আর ঢেড়স ভাজি রান্না করবেন, আর খালা ওয়ার্থড্রোবের প্রথম ড্রয়ার থেকে আমার জামা বের করে সোজা করে দিয়ে রান্না করতে যাবেন।
বুয়া বের করতে করতে:সোজা আফনে নিজেই করতে ফারবেন,শুধু পাশে দ্যাখবেন সেলাই থাইককা কাফড় যদি বেশী থাকে,তাইলে উল্টা আর না থাইকলে সোজা।
আনিকা একটু হাসলো: সত্যিইতো ! ঠিক আছে আপনি রেখে যা ন আমি সোজা করে নেবো। আনিকা বাথরুমে ঢুকলো। আর বুয়া রান্নার প্রস্তুতি নিলো।

প্রায় দেড়টার মধ্যে রান্না শেষ করে আনিকাকে বললো:খালা আমি ঘরডা মুইছ্যা খাওন টেবিলে রেডি কইরা দিয়া যাবো , আফনে খাইয়া লইয়েন। আনিকা আধশোয়া অবস্থায় কানে ইয়ার ফোন লাগিয়ে ছিলো,ওটা খুলে:আপনি খাবার নিয়ে যাবেন।
বুয়া বললো :আইচ্ছা।
আনিকার ভালো লাগছেনা,টিভি দেখতে পারেনা,ম্যাগাজিন পড়তে পারেনা। ওর মনে পড়ে সেদিন,সিড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার কথা। তখন ও কেবল ইয়ার চেন্জ পরীক্ষা দিয়ে দ্বাদশ শ্রেণীতে উঠেছে। মণিকা আর ও খুব চন্চল ছিলো। দুজনই একই মাপের। কিন্তু আনিকা এখন যেন স্কব্ধ হয়ে গেছে।আগের চন্চলতা আর নেই। মণিকার চন্চলতা কমেছে কিন্তু স্তব্ধ হয়নি। আনিকা সেদিন গণিত টিচারের কাছে পড়তে যাচ্ছিলো,মণিকা সেদিন বাসায় ছিলো। আনিকা বেশ দ্রুত স্যারের বাসার কাছে নেমে সিড়ি বেয়ে উঠছিলো,তখনই উপর থেকে নামছিলো অদৈত বর্মন নামের একটি ছেলে,সে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছিলো কিনা আনিকা জানেনা। ওর শুধু মনে পড়ে অদৈতর ডান হাতের তালু আনিকার মুখ মন্ডলে পড়েছিলো,আর তখনই প্রচন্ড এক ধাক্কায় আনিকা নিচে পড়ে যায়। আনিকা ধারণা করে অদৈত ইচ্ছে করেই ধাক্কা দিয়েছিলো,কারণ একটা সরি পর্যন্ত সে বলেনি । কিন্তু ও একথা কাউকে বলতে পারেনি।অদৈতর মা বিষয়টি জানতে পেরে আনিকার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে,আর অনুনয় বিনয় করে, মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলো। আনিকার মনটা খুবই দয়ালু,তাই মণিকাকেও কথাটি বলেনি। ওর দুটি চোখে দৃষ্টি নেই বলে অনেক কথায় ওকে শুনতে হয়েছে। দুবার ওকে দেখতে এসেছে ছেলেপক্ষ,সবই পছন্দ, কিন্তু যখনই বুঝেছে অন্ধ আর এগিয়ে আসেনি। আনিকার ক্লাসমেটদের মধ্যে যারা ওকে হিংসা করতো তারাতো রেগুলার উপহাস করতে থাকে, স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় ওরা আরো বেশী বাজে কথা বলে। আনিকা কাঁদে,বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে,
আর বলে :আমিতো নিজেকে শোধরাতে চাই,আমি বুঝেছি, উচ্ছৃঙ্খল জীবনের চেয়ে ধীর স্থীর জীবন অনেক বেশী ভালো।আনিকার দুচোখের অশ্রুগুলো ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পড়তে থাকে। একটু পরে দুটা বাজার সংকেত পেয়ে, উঠে জায়নামাজে দাড়ায়,আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য। ……..চলবে

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s