পথপানে (ছোটগল্প)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

জুবায়ের হুসাইন

খবরটা শুনে প্রথমে কোনোই রিঅ্যাকশন হলো না ওর। পাক্কা ত্রিশ সেকেন্ড নিষ্পলক তাকিয়ে রইল সংবাদদাতার মুখের দিকে। তারপরই যেন প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেল, লণ্ডভণ্ড করে দিল সবকিছু। ‘আল্লাহগো!’ বলে একটা আর্তনাদ ছুড়ে দিল বাতাসে। সে আর্তনাদ দীর্ঘায়িত হয়ে ইথারে ভর করে ছড়িয়ে গেল অনেক দূর পর্যন্ত। ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন সকিনা বেগম।
জামসেদ তখন ছুট দিয়েছে, পেছনে ছুটছে সংবাদদাতাও।

সকিনা বেগম কিছুই বুঝতে পারলেন না। বুঝতে পারলেন না ছেলের আর্তনাদের কারণ, কিংবা তার ওভাবে ছুটে যাওয়ার বিষয়ও। কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়ার মতোও কেউ তখন নেই সেখানে। কী এক অজানা আশঙ্কায় ভরে উঠল তার দেহ-মন। কেমন অসাড় একটা অনুভব দেহের সমস্ত পেশিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
কী করবেন তিনি এখন? ছেলে যেদিকে গেছেন সেদিকে যাবেন? না কি অপেক্ষা করবেন তার ফিরে আসার। অথবা একটু এগিয়ে যাবেন, জানার চেষ্টা করবেন ঘটনা কী।
সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই কয়েক মিনিট কেটে গেল। শেষে এগিয়ে যাবারই সিদ্ধান্ত নিলেন।

কয়েকদিনের একটানা বৃষ্টিতে রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই করুণ। খানা-খন্দের সৃষ্টি হয়েছে জায়গায় জায়গায়। পানি জমে আছে সেসব খানা-খন্দে।
অবশ্য রাস্তাঘাটের এই হাল হবার পেছনের কারণ কেউই খুঁজে পাচ্ছে না। বৃষ্টি তো আগেও হয়েছে। কই, তখন তো এমন বেহাল দশা হয়নি রাস্তাঘাটের! তবে এখন কেন হচ্ছে? শোনা যাচ্ছে সরকারি দলের অবহেলার কারণেই সংস্কার হয়নি এসবের। বরাদ্দকৃত টাকা খরচ করা হয়নি কিংবা যেটুকু খরচ হয়েছে তার সিংহভাগ চলে গেছে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের পকেটে।
এমনই একটা ভগ্ন রাস্তার মাথায় জটলাটা। ভগ্ন রাস্তা এই কারণে যে, অসুখে পড়ে কয়েকদিন ঘরে বন্দি থাকলে মানুষের চেহারার যে দশা হয়, বোধকরি রাস্তাটার অবস্থা তারচেয়েও বেশি এবড়োখেবড়ো।
ছুটে এসে জটলাটার ভেতরে ঢুকে পড়ল জামসেদ। ঢুকে যা দেখল, তাতে ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেল প্রথমটায়। কিন্তু পরক্ষণই দ্বিতীয়বারের মতো আর্তনাদ বেরিয়ে এলো গলা চিরে।

এরপর পেরিয়ে গেছে এক সপ্তাহ। এই সাতদিন পরিবারটার কেউই হাসতে পারেনি। কান্নাও ভুলে গেছে যেন। আসলে কাঁন্নার ফোঁটাগুলে চোখের ভেতরেই শুকিয়ে গেছে। কিছু ফোঁটা অবশ্য অশ্রু হয়ে ঝরে পড়েছে বাইরে। মিশে গেছে জলীয় বাষ্পের সঙ্গে আর কিছু শুষে নিয়েছে শুষ্ক মৃত্তিকা।
জামসেদের বয়স কতই বা হবে, কেবল কৈশোর ছাড়িয়ে তারুণ্যে পা দিতে চলেছে। মনের তেজটাও তাই টগবগে। তারুণ্যের তেজে দীপ্তই ছিল সে- তার মনোবল, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন আর প্রত্যাশা। কিন্তু হঠাৎ করে যেন তার সেই তারুণ্যের সাম্পানে হুড়মুড় করে এসে পড়েছে সাইক্লোনের কালো আঘাত। দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে সব। থমকে গেছে তার তড়তড়িয়ে সামনে ছুটে চলার গতি। বিশাল আর ভয়ঙ্কর দর্শন ঢেউ একের পর এক তার বুকের ওপর আছড়ে পড়ে তাকে নিস্তেজ করে দিয়েছে। বরং তাকে তলিয়ে নেয়ার উপক্রম করেছে।

এমনই ভাঙা আর নিরাশ মনে বারান্দায় বসে ছিল জামসেদ। কয়েকদিন ধরে সে অনেক ভেবেছে। ভেবেছে আকাশ-পাতাল। কিন্তু কোনো কূল-কিনারা পায়নি। মাত্র অল্প দূরে অবস্থান করা গন্তব্যটা তার এখন বহু দূরে চলে গেছে। যোজন-যোজন দূরে। কিছুতেই তার নাগালটা দেখতে পাচ্ছে না সে। তাই চোখের সামনে কেবলই ঘন আঁধার ছাড়া আর কিছুই দেখছে না এখন।
অবশ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে কিছুটা হলেও আলোর সলতেটা জ্বালিয়ে রাখতে, মনের গহীন কোণে হলেও। তা না হলে যে পরিবারটাই শেষ হয়ে যাবে!
আজ পূর্ণিমা না হলেও চারপাশটা বেশ পরিষ্কার। আকাশে তারাদের আধিক্য এই আবহের কারণ।

উঠানে জোনাক পোকাদের জ্বলা-নেভা চলছে। পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়ের মধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকাদের একটানা ডাক ভেসে আসছে। আগের শিয়ালের ডাক শোনা যেত। এখন মাঝে মাঝে কিছু পোষা কুকুরের ডাক ছাড়া এই জাতীয় প্রাণীদের অস্তিত্ব বোঝা যায় না।
খুঁটিতে হেলান দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসেছিল জামসেদ। দৃষ্টি দূরের আকাশে থাকলেও তাতে ছিল না কোনো দর্শনের ইচ্ছা। ভোতা চেতনাটা নিজের মধ্যেই বন্দি হয়ে আছে যেন।

সকিনা বেগম এখন নিজেকে অনেকটায় সামলে নিয়েছেন। এ কয়দিনে আড়ালে আবডালে চোখের পানি ফেলেছেন অনেক। একসময় বুঝেছেন, এভাবে কান্নাকাটি করলে সমস্যার সমাধান হবে না। সমস্যার সমাধানের জন্য মনে বল ফিরিয়ে আনতে হবে। সবকিছু তো একেবারেই শেষ হয়ে যায়নি তার। জামসেদের মতো তারুণ্যে ভরা সন্তান রয়েছে তার। কাজেই আবার প্রথম থেকেই সব শুরু করতে হবে। ছেলেকে শক্তি জোগাতে হবে। মানুষ করতে হবে ছোট সন্তান দুটোকে। এক্ষেত্রে জামসেদের সহযোগিতা তার একান্ত দরকার।

ছোট ছেলেমেয়ে দুটোকে ঘুম পাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন সকিনা বেগম।
জাহাঙ্গীর তো আগেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। আসলে তার ঘুমিয়ে থাকা আর জেগে থাকা- একই কথা। বিছানায় অসাড় হয়ে পড়ে থাকের সারাক্ষণ। পারেন না একটুও নড়াচড়া করতে। চিত হয়ে পড়ে থাকেন শুধু। দৃষ্টিজোড়া নিবদ্ধ থাকে টিনের চালের দিকে। কথনও সে দৃষ্টি ঘুরে আসে আরেকটু ডানে বা বামে। ঠোঁটজোড়া নড়লেও এক বর্ণও কথা বের হয় না তা থেকে। কেবল অদ্ভুত ধরনের গোঙানির মতো দু’একটা শব্দ বেরিয়ে আসে স্বরযন্ত্র দিয়ে। আসলে এখন তার জিহ্বা বলতে যে কিছুই নেই। কথা বের হবে কোত্থেকে?

জামসেদের পাশে এসে দাঁড়ালেন সকিনা বেগম। নিজের ভেতরটা বেদনায় হু হু করে উঠছে। ছেলের প্রতি অসীম মমতায় ভরে উঠছে অন্তরটা। ঠোঁটজোড়া শক্ত করে একে অন্যের সাথে চেপে কান্না থামালেন তিনি। না, আর কাঁদা চলবে না। তাকে শক্ত হতেই হবে। সংসারটাকে বাঁচাতে হবে।
জামসেদ নিজের মধ্যে এতই মগ্ন ছিল যে মা কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তা খেয়াল করেনি। হুঁশ ফিরল যখন নিজের মাথাটা মায়ের উষ্ণ বুকে আবিষ্কার করল। ওই অবস্থায় থেকেই মুখ তুলে মায়ের মুখটা দেখার চেষ্টা করল। আবছায়ায় পরিষ্কার না হলেও বেদনাহত মায়ের মুখটা ওর ভেতরে বেদনা একটা প্রস্রবণ বইয়ে দিল যেন। হাইমাউ করে কেঁদে ফেলল ও। এ কয়দিনের চেপে রাখা কান্নাটা আর চেপে রাখতে পারল না।

পরদিন সকাল।
জামসেদকে আজ বেশ ফ্রেশ লাগছে। নিজের মধ্যে বেশ শক্তিও পাচ্ছে ও। তারুণ্য যেন আবারও ফিরে এসেছে।
উঠানে নেমে এলো ও। মা সকিনা বেগমও নামলেন। এগিয়ে গেলেন রান্নাঘরের পাশে লাগানো পেপে গাছটার কাছে। তারপর লগি দিয়ে খুচিয়ে চার-পাঁচটা পেপে পাড়লেন। কিছুটা আঠা ঝরিয়ে একটা প্যাকেটে ভরলেন পেপেগুলো। তারপর প্যাকেটটা ধরিয়ে দিলেন ছেলের হাতে।
সকিনা বেগমের ভীষণ ইচ্ছে করছিল ছেলের মাথায় পিঠে একবার হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু কী এক কারণে তা থেকে বিরত থাকলেন তিনি। হয়তো ভাবলেন, এতে ছেলে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বে। ফলে কাজে মন বসাতে পারবে না।
ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ঘরের দিকটা দেখে নিল জামসেদ। দরোজার ফাঁক দিয়ে আব্বার মুখটা দেখা যাচ্ছে। মুখটাতে কি বেদনায় মুষড়ে পড়া একটা ছায়া আছে? এত দূর থেকে বোঝা গেল না।

বুকের পেশিকে শক্ত করল জামসেদ। না, কোনো পিছুটানে থমকে দাঁড়ালে চলবে না। তাকে এগিয়ে যেতেই হবে। পাহাড়সম বোঝা এখন তার মাথার ওপর। ইচ্ছে করলেও সে বোঝা সরিয়ে ফেলা ওর পক্ষে সম্ভব নয়।
পেপের প্যাকেটটা নিয়ে এগিয়ে চলল জামসেদ।
আজ হাটবার হওয়াতে প্রচুর লোকের সমাগম হয়েছে। হাটে পৌঁছে জামসেদ প্রথমে কী করবে তা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। সে জন্য পাক্কা দুই মিনিট দাঁড়িয়ে রইল হাটে প্রবেশের মুখটাতে।
ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন পিয়ারু মুন্সি। তিনি ছিলেন জামসেদের আব্বা জাহাঙ্গীর হোসেনের বন্ধু। বললেন, ‘এসো বাবা, আমার সাথে এসো।’

তারপর জামসেদকে হাত ধরে হাটের মধ্যে নিয়ে গেলেন। বসালেন নিজের টোঙ দোকানটার পাশে।
ভীষণ কান্না পাচ্ছে জামসেদের। চোখ ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে অবাধ্য অশ্রুরা। কিন্তু ওর প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির কাছে পরাস্ত হয়ে আপাতত বের হলো না।
পেপের প্যাকেটটা খুলতে জামসেদকে সহায়তা করলেন পিয়ারু মুন্সি।
লজ্জা করছে এভাবে সবজি নিয়ে বসে থাকতে। তারপরও বসে রইল, অনেকটা মনের জোরে।

পেপেগুলো বিক্রি করতে পিয়ারু মুন্সিই ওকে সাহায্য করলেন। এরপর প্যাকেটভর্তি বাজারও করে দিলেন। জামসেদ বুঝল যে ওর পাওনা টাকার চেয়েও বেশি খরচ করলেন পিয়ারু মুন্সি। তারপরও কিছু বলল না জামসেদ, বলতে পারল না। কিসে যেন বাঁধল।
বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরল জামসেদ। রান্নাঘরের বারান্দায় বাজারের থলেটা রেখে ছলছল চোখে গিয়ে বসল লালনদের পুকুর পাড়ে।
তখন পড়ন্ত বিকেল। সূর্যটা প্রায় রক্তিম হয়ে উঠেছে।

অনেকদিন পর পুকুরের পানিতে এক ঝাঁক উড়ন্ত বকের ছায়া দেখল জামসেদ। ওর মনটাও কোথায় যেন উড়ে গেল নিমেষে।
জামসেদ ওর আব্বার আদরের সন্তান। বড় সন্তান হওয়ার কারণে আব্বার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে ও। বুঝেছে আব্বার চাওয়া-পাওয়ার অনেক বিষয়-আশয়। আব্বাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতাও করে এসেছে ও বরাবর। যখন যা-ই করেছে, তাকে শুধরে দেয়ার জন্য মাথার ওপর একজনের হাত থাকত সবসময়। তাই অনেকটা ভাবনাহীনভাবেই চলাফেরা করত ও। কিন্তু আজ হঠাৎ করে ওর নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছে। এতদিন মাথার উপরে যে বটগাছের ছায়াটা বিশাল ডালপালা বিস্তার করে ওকে আগলে রেখেছিল, প্রচণ্ড এক ঘূর্ণিঝড় এসে সেসব দুমড়ে-মুচে দিয়ে গেছে। ডালপালাহীন ন্যাড়া বটগাছ দেখতে কারোরই ভালো লাগে না। আর ও নিজেই তো এখন ডালপালা বিস্তার করতে যাচ্ছে মা-বাবা আর ছোট দুটি ভাইবোনের ওপর।

পুকুরের ওপাড়টা দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। স্থানীয় ভাষায় গাঙ বলা হয়। এখন তো গাঙের ওদিকটায় অনেক বাড়িঘর উঠে গেছে। দেখলে মনেই হয় না ওখান দিয়ে একটা স্রোতস্বিনী বয়ে যাচ্ছে। অথচ এই সেদিনও না ও এই গাঙের ধারে কত ঘুরে বেরিয়েছে! ঘুড়ি উড়িয়েছে আর কাটাকাটি খেলেছে। কখনও কাটা ঘুড়ি ধরতে দৌড়েছে, হাতে বাঁশের লম্বা কঞ্চি নিয়ে। তরতর করে উঠে গেছে ইয়া মোটা আর বড় বড় শাল, কড়ই, শিমুল, নারকেল এমনকি বাঁশগাছেও। লাল-নীল-বেগুনি-সবুজ-হলুদ-সাদা, মুখপোড়া-পাছাপোড়া-কেনিপোড়া, দো’রঙা-তেরঙা-চাপরাশি বিভিন্ন বর্ণের ও নামের ঘুড়ি উড়াতো ওরা। আব্বা মা ছেলের দুরন্তপনাকে কখনও থামিয়ে দিতে চাননি, তবে প্রশ্রয়ও দেননি। কেনই বা দেবে? ছেলে তো আর খারাপ কিছু করছে না। কেউ কখনও কোনো বিষয়ে ওর বিরুদ্ধে নালিশ তাদের কাছে আসেনি। বরং আড়ালে-আবডালে এমনকি প্রকাশ্যেও ওর প্রশংসা করেছে সবাই। সেজন্যেই তো ছেলেকে তার নিজের মতো চলতে দিয়েছেন। অবশ্য ভুলগুলো শুধরেও দিয়েছেন।
পিকুল এ পথ দিয়েই কোথাও যাচ্ছিল। পুকুর পাড়ে কাউকে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এলো। জামসেদকে দেখে একটু অবাক হলেও পরক্ষণই বুঝতে পারল ওর এখানে এভাবে বসে থাকার কারণ। জামসেদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আস্তে করে বলল, ‘কিরে, কী ভাবতিছিস?’
প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না জামসেদ। দ্বিতীয়বার একই প্রশ্ন করল পিকুল। এবার যেন বাস্তবে ফিরে এলো জামসেদ। বলল, ‘ও তুই? কখন আইছিস (এসেছিস)?’

‘এই তো এখন।’ জবাব দিল পিকুল।
জামসেদ আবারও আনমনা হয়ে গেল।
পিকুল তখনই ওকে কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘অত ভেঙে পড়লি তো চলবে না। তোর ঘাড়ে এখন ম্যালা দায়িত্ব।’
‘সে জন্যিই তো ভয় লাগতেছে। আমি কি পারব এ দায়িত্ব পালন কত্তি?’ ভেঙে পড়া কণ্ঠ জামসেদের।
‘দূর পাগল! এত কী ভাবতিছিস? আমরা আছি না।’ বলল বটে আমরা আছি, কিন্তু বন্ধুকে কতটুকুই বা সাহায্য করতে পারবে পিকুল, তা নিজেও জানে না। ওর উপরেও তো অনেক দায়িত্ব। যদিও আব্বা বেঁচে থাকাতে অনেকটাই ভারমুক্ত থাকতে পারে ও। আর জামসেদের আব্বা বেঁচে থেকেও তো নেই। নিঃসাড় হয়ে পড়ে থাকা একজন মানুষকে কিভাবে জীবিত থাকা বলা যায়?
‘এরকম কেন হলো ক তো পিকুল?’ হঠাৎ প্রশ্নটা করে বসল জামসেদ।
‘সব শালা ওই ওদের দোষ।’ বলল পিকুল।

শালা বলতে কাদের বোঝালো তা বুঝল জামসেদ। তাই বলল, ‘আমার আব্বা না হয় পঙ্গু হয়ে গেলেন, বাকশক্তি হারিয়ে ফেলালেন। কিন্তু সেদিন যে লোকটা মারা গেল, তার পরিবারের কী অবস্থা হয়েছে একবার ভাবতো!’
চোখটা ছলছল করে উঠল জামসেদের। সজল হয়ে উঠল পিকুলের চোজোড়াও।
সজল বলল, ‘বাংলাদেশের সব রাস্তাঘাটেরই এখন একই দশা। অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। মারা যাচ্ছে মানুষ। নিঃস্ব হয়ে পড়ছে কত পরিবার!’
‘জানিস আমি কয়দিন আব্বার মুখির দিকি তাকাতি পারিনে!’ এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না জামসেদ। হড়হড় করে চোখ ফেটে বেরিয়ে এলো নোনা পানির ধারা।

‘আমি সব বুঝিরে।’ সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে পিকুল। ‘কিন্তু কী করবি ক, সব যে নিয়তি। মেনে নিতিই হবে।’ একটুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর কী মনে হওয়াতে আবার বলল, ‘ও ভালো কথা, তোর সেই বইটার কী হলো?’
জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল জামসেদ। বলল, ‘আর বই! বাদ দে ওসব।’
‘জামসেদ…’
পিকুলকে থামিয়ে দিল জামসেদ, ‘আমি নিজেই তো এখন একটা বই হয়ে গিছিরে। তাই কী হবে আর বই বের করে? ওসব আর হবেটবে নারে।’ হতাশা ঝরে পড়ল জামসেদের কণ্ঠে।
‘নারে জামসেদ, আমি এটা মেনে নিতি পারছিনে। বই তোকে বের করতিই হবে। আমি সাহায্য করব।’
‘দূর! বাদ দে ওসব। এখন আর মুড নেই ওসবের। কিভাবে বাবা-মা আর ছোট ভাইবোনদের মুখের খাবার তুলে দেব, সেই চিন্তাই সর্বক্ষণ মাথা জুড়ে থাকে।’
‘কিন্তু এভাবে…’
কথা শেষ করতে পারে না পিকুল। ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো।
উঠে দাঁড়ালো ওরা। ঘুরল বাড়ি যাওয়ার জন্য। ততক্ষণে ভিজে একাকার হয়ে গেছে দুই বন্ধু।

অসাড় হয়ে বিছানায় চিত হয়ে পড়ে আছেন জাহাঙ্গীর। নড়াচড়ার এতটুকু শক্তি নেই তার। কোনো কথাও বের হয় না দু’ঠোঁটের মাঝখান থেকে।
এ অবস্থাতেই খেয়াল করেন স্ত্রী আর বড় ছেলের কর্মব্যস্ততা। ভেতরে ভেতরে দহনে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হন। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেন না। তাতে যন্ত্রণাটা আরো বাড়ে। দ্বিগুণ, তিনগুণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত শিরা-উপশিরায়।

ছোট ছেলেমেয়ে দু’টো প্রায়ই পাশে এসে বসে। নিষ্পলক চোখে বাবার দিকে চেয়ে থাকে। তারপর একসময় উঠে চলে যায়। অন্তরটা ভিজে ওঠে জাহাঙ্গীরের। ইচ্ছে করে নরম দুটো গালে চুমোয় চুমোয় ভরে দিতে। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে। কিন্তু এ সকলই নিষ্ফল চাওয়া এখন তার কাছে।
আজ সকালেই রিকশাটা ঠিক করেছে জামসেদ। মাকে বলতে শুনেছেন তিনি। তাতে করে কষ্টটা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বাপের রিকশা এখন ছেলে চালাবে। ভাবতেই হৃদয়টা গুড়িয়ে যেতে চায়।
জামসেদ এখনও ফিরে আসেনি। রাত বেশ হয়েছে, বুঝতে পারেন জাহাঙ্গীর। কাউকে যে জিজ্ঞেস করবেন, তারও উপায় নেই। তাই মনে মনে উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া উপায় কী?

এলাকার রাস্তাঘাটগুলো এবার বর্ষার প্রথম দিকেই ভেঙে যেতে থাকে। আর তিনি বেশ সাবধানেই রিকশা চালান। এ পর্যন্ত এগারো বছরের রিকশা চালানোকালে কখনও কোনো অ্যাক্সিডেন্ট তিনি করেননি। কিন্তু ওই দিন কী যে হলো, কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলেন না। আর পারবেনই বা কী করে? চেষ্টা কি তিনি করেননি? করেছেন। পেছন থেকে ট্রাকের ঢাক্কা আর সামনের গর্ত, হাতের মধ্য থেকে হ্যান্ডেল ছুটে যায়। কাঁত হয়ে পড়ে যান গর্তটার মধ্যে, একেবারে হুড়মুড় করে। রিকশায় যে ভদ্রলোক ছিলেন, তিনি নাকি সঙ্গে সঙ্গে মারা গেছেন। অল্পের জন্যে বেঁচে গেছেন তিনি। কিন্তু এ বাঁচাকে কি বাঁচা বলে? এর চেয়ে বোধহয় মৃত্যু অনেক ভালো ছিল। তাহলে আর বউ-ছেলেমেয়ের অসহায়ত্বটা দেখতে হতো না।
এখন আর বেশিক্ষণ কিছু ভাবতেও পারেন না জাহাঙ্গীর। মাথার মধ্যে কেমন চক্কর দিয়ে ওঠে। বোঁওও একটা আওয়াজ দিয়ে ওঠে মস্তিষ্কের কোষগুলো। বিদ্রোহ করতে চায়। চায় পুরোপুরি রেস্টে থাকতে।

কেমন যেন নেতিয়ে পড়লেন জাহাঙ্গীর। পাশেই গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে জনি ও মিলা। মাথাটা ঘুরিয়ে আদরের দুই সন্তানকে দেখতে চাইলেন একনজর। পারলেন না। এক ইঞ্চিও ঘোরাতে পারলেন না ঘাড়। যেন সুপার গ্লু আঠা দিয়ে জুড়ে দেয়া হয়েছে।
হু হু করে কাঁদছেন জাহাঙ্গীর, ভেতরে ভেতরে। তবে চোখের দু’পাশ বেয়ে অশ্রুধারা নেমে চলেছে। বিছানার নিচটা প্রায় ভিজে উঠেছে সে অশ্রুতে।
এভাবেই একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন জাহাঙ্গীর। তার কাছে তো এখন ঘুমিয়ে থাকা আর জেগে থাকা দুটোই সমান।

অন্যদিকে কঠিন সংগ্রামে নেমেছে জামসেদ। তার সহযোগী তারই জন্মদাত্রী মা সকিনা বেগম। আগে স্বামী জাহাঙ্গীরের সহযোগী ছিলেন তিনি। এখন জামসেদের। সারা জীবন কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কাটছে তার দিনগুলো। ছোটবেলা থেকেই তার এই সংগ্রাম শুরু। বারো বছর বয়সে মা মারা যান ছোট ছোট তিনটে ভাইবোনকে রেখে। তাদেরকে মানুষ করেছেন তিনি। বাবা ছিলেন দিনজুরে। কাজেই খাটনি তাকে একটু বেশিই করতে হয়েছে। তাই এসব দেখে এখন আর ভয় পান না। বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন নতুন প্রেরণা মনের মধ্যে লালন করে তা বাস্তবায়নে অগ্রণী হন।
আজও যেমন হচ্ছেন।
এই মুহূর্তে বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে ছেলের পথপানে চেয়ে আছেন। কখন ফিরবে জামসেদ?

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s