সূরা আন্-নিসাঃ ৫৮ থেকে ৫৯ নং আয়াত

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

اَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ

58)) إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّواْ الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُواْ بِالْعَدْلِ – إِنَّ اللّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ – إِنَّ اللّهَ كَانَ سَمِيعاً بَصِيراً .

59)) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنكُمْ – فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ – ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً .

অনুবাদ:

৫৮। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তা কত উৎকৃষ্ট! আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

৫৯। হে ঈমাদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর আরো আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের, কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ্ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও আখেরাতে বিশ্বাস কর। এ পন্থাই উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর।

নামকরণ পরিচিতিঃ

নাম সূরা আন্-নিসা। ‘আন্-নিসা’ শব্দটি এ সূরায় সর্বমোট নয় বার এসেছে এবং নিসা বা মহিলা সংক্রান্ত বিধানাবলী এ সূরাতেই সবচেয়ে বেশী এসেছে। এ কারণেই ‘সূরাত্ আন্-নিসা আল-কুবরা’ও বলা হয় যার বিপরীতে এ বিষয় সম্বলিত ছোট সূরা কুরআনুল কারীমে রয়েছে ‘সূরা আত্-তলাক’।

সূরাটি সর্বসম্মত মতে মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ সূরাসমূহের অন্তর্ভুক্ত, আয়াত- ১৭৬ টি, কুরআনের তারতীব অনুযায়ী এ সূরাটি চতুর্থ সূরা।

নাযিলের সময়কালঃ

সূরা আল-মুমতাহিনার পর এ সূরাটি নাযিল হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ

ইসলাম-পূর্বকালে কা’বা ঘরের সেবা করাকে এক বিশেষ মর্যাদার কাজ মনে করা হত। কা’বার কোন বিশেষ খেদমতের জন্য যারা নির্বাচিত হত, তারা গোটা সমাজ তথা জাতির মাঝে সম্মানিত ও বিশিষ্ট বলে পরিগণিত হত। সে জন্যই বায়তুল্লাহর বিশেষ খেদমত বিভিন্ন লোকের মাঝে ভাগ করে দেয়া হত। জাহেলিয়াত আমল থেকেই হজ্জের মওসূমে হাজীদেরকে ‘যমযম’ কূপের পানি পান করানোর সেবা মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতৃব্য আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র উপর ন্যস্ত ছিল। একে বলা হত ‘সেকায়া’। এমনি করে অন্যান্য আরো কিছু কিছু সেবার দায়িত্ব রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য পিতৃব্য আবু তালেবের উপর। কা’বা ঘরের চাবি নিজের কাছে রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে তা খুলে দেয়া ও বন্ধ করার ভার ছিল উসমান ইবনে তালহার উপর। এ ব্যাপারে স্বয়ং উসমান ইবনে তালহার ভাষ্য হল এই যে, জাহেলিয়াত আমলে আমরা সোমবার ও বৃহস্পতিবার দিন বায়তুল্লার দরজা খুলে দিতাম এবং মানুষ তাতে প্রবেশ লাভের সৌভাগ্য অর্জন করত। হিজরতের পূর্বে একবার মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় সাহাবীসহ বায়তুল্লার উদ্দেশ্যে গেলে উসমান (যিনি তখনো পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি) তাকে ভিতরে প্রবেশ করতে বাধা দিলেন এবং অত্যন্ত বিরক্তি প্রদর্শন করলেন। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত ধৈর্য ও গাম্ভীর্য সহকারে উসমানের কটুক্তিসমূহ সহ্য করে নিলেন। অতঃপর বললেন, হে উসমান! হয়ত তুমি এক সময় বায়তুল্লার এই চাবি আমার হাতেই দেখতে পাবে। তখন যাকে ইচ্ছা এই চাবি অর্পণ করার অধিকার আমারই থাকবে। উসমান ইবনে তালহা বলল, তাই যদি হয়, তবে সেদিন কোরাইশরা অপমানিত অপদস্থ হয়ে পড়বে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, তা নয়। তখন কোরাইশরা আযাদ হবে, তারা হবে যথার্থ সম্মানে সম্মানিত। এ কথা বলতে বলতে তিনি বায়তুল্লার ভিতরে প্রবেশ করলেন। (উসমান বললেন,) তারপর আমি যখন আমার মনের ভিতর অনুসন্ধান করলাম, তখন আমার যেন নিশ্চিত বিশ্বাস হয়ে গেল যে, তিনি যা কিছু বললেন, তা অবশ্যই ঘটবে। সে মুহূর্তেই আমি মুসলমান হয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে নিলাম। কিন্তু আমি আমার সম্প্রদায়ের মতিগতি পরিবর্তিত দেখতে পেলাম। তারা আমাকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করতে লাগল। কাজেই আমি আর আমার (মুসলমান হওয়ার) সংকল্প বাস্তবায়িত করতে পারলাম না। অতঃপর মক্কা বিজিত হয়ে যাওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে বায়তুল্লার চাবি চাইলেন। আমি তা পেশ করে দিলাম।

কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, উসমান ইবনে তালহা চাবি নিয়ে বায়তুল্লার উপরে উঠে গেলেন এবং আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পালনকল্পে তার নিকট থেকে বলপূর্বক চাবি ছিনিয়ে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে অর্পণ করলেন। বায়তুল্লায় প্রবেশ এবং সেখানে সালাত আদায় করার পর মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাইরে বেরিয়ে এলেন, তখন পুনরায় আমার হাতেই সে চাবি ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেনঃ এই নাও, এখন থেকে এ চাবি কেয়ামত পর্যন্ত তোমার বংশধরদের হাতেই থাকবে। অন্য যে কেউ তোমাদের হাত থেকে ফিরিয়ে নিতে চাইবে, সে হবে যালেম, অত্যাচারী। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তোমাদের হাত থেকে এ চাবি ফিরিয়ে নেবার কোন অধিকার কারুরই থাকবে না। এতদসঙ্গে তিনি এই হেদায়াত করলেন যে, বায়তুল্লার এই খেদমত তথা সেবার বিনিময়ে তোমরা যে সম্পদ প্রাপ্ত হবে, তা শরীয়তের রীতি মোতাবেক ব্যবহার করবে। উসমান ইবনে তালহা বলেন, যখন আমি চাবি নিয়ে হৃষ্টচিত্তে চলে আসছিলাম, তখন তিনি আমাকে ডাকলেন। বললেনঃ উসমান, আমি যা বলেছিলাম তাই হল নাকি? তৎক্ষণাৎ সে কথাটি আমার মনে হয়ে গেল, হিজরতের পূর্বে যা তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, ‘একদিন এ চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে’। তখন আমি নিবেদন করলাম, নিঃসন্দেহে আপনার কথা বাস্তবায়িত হয়েছে- আর এক্ষণে আমিও কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম। [দেখুন- তাবরানীঃ ১১/১২০]

৫৯ নং আয়াত আব্দুল্লাহ্ ইবনে হুযাফা ইব্ন কায়স ইবনে আদী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সম্বন্ধে নাযিল হয়েছে। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “একদা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক আনসার সাহাবীর নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী যুদ্ধে পাঠালেন। একটা সময়ে উক্ত আনসার কোন কারণে স্বীয় বাহিনীর উপর রাগান্বিত হয়ে তাদেরকে বললেনঃ আল্লাহর রাসূল কি আমার আনুগত্য করতে তোমাদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেন নাই? তারা বললঃ হাঁ। তিনি বললেনঃ তবে তোমরা আমায় জ্বালানী সংগ্রহ করে দাও। তারা তা করে দিলে তিনি সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সকলকে বললেনঃ আমি তোমাদেরকে এতে প্রবেশ করার নির্দেশ দিচ্ছি। তাদের মধ্যকার জনৈক যুবক বললেনঃ তোমরা আগুন হতে বাঁচার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পালিয়ে এসেছ, অতএব তার সাথে সাক্ষাত না করে তাতে প্রবেশ করো না। তিনি তোমাদেরকে তাতে প্রবেশ করার নির্দেশ দিলে তোমরা তাতে প্রবেশ করো। সেমতে তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফিরে এসে উপরোক্ত ঘটনা জানালেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ তোমরা তাতে প্রবেশ করলে তা থেকে কখনো বেরুতে পারতে না। শুধুমাত্র ন্যায় কাজের বিষয়েই আমীরের প্রতি আনুগত্য থাকতে হয়।” [আহমাদ (ইবনে কাসীর)]

বিষয়বস্তুঃ

আমানাত প্রত্যর্পণ এবং আনুগত্য ও যাবতীয় বিরোধের মীমাংসায় আল্লাহর বিধানের অনুসরণ।

ব্যাখ্যাঃ

৫৮নং আয়াত হতে- إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّواْ الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا

4 আমানতের ব্যাপকতাঃ একজন অন্য জনের নিকট কোন কিছু জমা বা গচ্ছিত রাখা। আমানতের বিষয়টি امانات অর্থাৎ, বহুবচনে এসেছে। ইঙ্গিত- কারো নিকট অপর কারো কোন বস্তু বা সম্পদ গচ্ছিত রাখাটাই শুধুমাত্র ‘আমানত’ নয়, যাকে সাধারণতঃ আমানত বলে অভিহিত করা হয় এবং মনে করা হয়; বরং আমানাত আরো ব্যাপক। শানে-নুযূলে- কোন বস্তুগত আমানত ছিল না। কারণ, বায়তুল্লার চাবি বিশেষ কোন বস্তু নয়; বরং তা ছিল বায়তুল্লার খেদমতের একটা পদের নিদর্শন।

4 উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন যে, সেদিন(মক্কা বিজয়) যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহ্ থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন তার মুখে এ আয়াতটি আবৃত্ত হচ্ছিল- إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّواْ الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا অর্থাৎ, “আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার অধিকারীর নিকট অর্পণ করে দাও।”

4 এ হুকুমের লক্ষ্য সাধারণ মুসলমানরাও হতে পারে কিংবা বিশেষভাবে ক্ষমতাসীন শাসকবর্গও হতে পারেন। তবে সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয় হল এই যে, এমন সবাই এর লক্ষ্য যারা আমানতের রক্ষক বা আমানতদার। এতে সাধারণ জনগণ ও শাসকবর্গ সবাই অন্তর্ভুক্ত। সালাম-যাকাত-সিয়াম থেকে শুরু করে বস্তুসামগ্রী এমনকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, যে কোন পর্যায়ের নির্বাচন, মতামত দান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, কথাবার্তা ইত্যাদি।

4 আমানত পরিশোধের তাকীদঃ যার দায়িত্বে কোন আমানত থাকবে, সে আমানত প্রাপককে পৌঁছে দেয়া তার একান্ত কর্তব্য। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, এমন খুব কম হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ভাষণ দিয়েছেন অথচ তাতে একথা বলেননি- “যার মধ্যে আমানতদারী নেই তার মধ্যে ঈমান নেই। আর যার মধ্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার নিয়মানুবর্তিতা নেই, তার দ্বীন নেই।” অন্য হাদীসে তিনি(সা) বলেনঃ “সকল প্রাপ্য ও হক তার প্রাপকের নিকট প্রত্যর্পণ করা হবে। এমনকি শিং বিশিষ্ট ছাগল শিংবিহীন ছাগলের উপর অত্যাচার করলে এর প্রতিশোধও তার কাছ থেকে নেয়া হবে।”

4 খেয়ানত মুনাফেকীর লক্ষণঃ আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “মুনাফিকের লক্ষণ হলো তিনটি- যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং আমানতের খেয়ানত করে।” [বুখারীঃ ৩৩ ও মুসলিমঃ ১৪৩]

৫৮নং আয়াত হতে- وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُواْ بِالْعَدْلِ

4 রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাসমূহ আল্লাহ্ তা’আলার আমানতঃ রাষ্ট্রীয় যত পদ ও পদমর্যাদা রয়েছে, সেসবই আল্লাহ্ তা’আলার আমানত। যাদের হাতে নিয়োগ-বরখাস্তের অধিকার রয়েছে, সে সমস্ত কর্মকর্তা ও অফিসারবৃন্দ হলেন সেসব পদের আমানতদার। কাজেই তাদের পক্ষে কোন পদ এমন কাউকে অর্পণ করা জায়েয নয়, যে লোক তার যোগ্য নয়; বরং প্রতিটি পদের জন্য নিজের ক্ষমতা ও সাধ্যানুযায়ী যোগ্য ব্যক্তির অনুসন্ধান করা কর্তব্য।

4 কোন পদে অযোগ্য ব্যক্তির নিয়োগদাতা অভিসম্পাতযোগ্যঃ যোগ্যতা ও পরিপূর্ণ শর্ত মোতাবেক কোন লোক পাওয়া না গেলে উপস্থিত লোকদের মধ্যে যোগ্যতা ও আমানতদারী তথা সততার দিক দিয়ে যে সবচেয়ে অগ্রবর্তী হবে, তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাদীসে রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ “যাকে সাধারণ মুসলমানদের কোন দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, তারপর যদি কাউকে তার যোগ্যতা যাচাই ছাড়াই একান্ত বন্ধুত্ব কিংবা সম্পর্কের কারণে নিয়োগ প্রদান করে, তবে তার উপর আল্লাহর লা’নত হবে। না তার ফরয (‘ইবাদাত) কবূল হবে, না নফল। এমনকি সে জাহান্নামে প্রবিষ্ট হবে।” এ বিধান কোন দেশের জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে দল, সংস্থা, সংগঠন, সমিতি ইত্যাদি সকল পর্যায়ে কার্যকর হবে।

4 ন্যায় বিচার বিশ্ব-শান্তির জামিনঃ আয়াতের প্রথম বাক্যটিতে আমানত পরিশোধের এবং দ্বিতীয় বাক্যটিতে ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে আমানত পরিশোধ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়ার কারণ সম্ভবতঃ এই যে, এর অবর্তমানে কোথাও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতেই পারে না।

4 কাজেই যাদের হাতে দেশের শাসনক্ষমতা থাকবে, তাদেরকে প্রথমে গচ্ছিত এই আমানতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সরকারী পদসমূহে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা কোন সুপারিশ অথবা ঘুষ-উৎকোচ যেন কোনক্রমেই প্রশ্রয় পেতে না পারে। অন্যথায়, এর ফলে অযোগ্য, অথর্ব, আত্মসাৎকারী ও অত্যাচারী লোক সরকারী পদের অধিকারী হয়ে আসবে। অতঃপর শাসকবর্গ যদি একান্তভাবে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, তবুও তাদের পক্ষে সে লক্ষ্য অর্জন কোন অবস্থাতেই সম্ভবপর হয়ে উঠবে না। কারণ, এসব সরকারী কর্মচারীরাই হবে সমগ্র রাষ্ট্রের হাত-পা।

4 মহান রাব্বুল ‘আলামীন সরকারী পদসমূহকেও আমানত বলে সাব্যস্ত করে প্রথমেই একথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আমানত যেমন শুধুমাত্র তাদেরকে প্রত্যর্পণ করতে হয় যারা তার প্রকৃত মালিক, কোন ফকীর-মিসকীনকে কারো আমানত দয়াপরবশ হয়ে দিয়ে দেয়া কিংবা কোন আত্মীয়-স্বজন অথবা বন্ধু-বান্ধবের প্রাপ্য হক আদায় করতে গিয়ে অন্য কারো আমানত তাদেরকে দিয়ে দেয়া জায়েয নয়। তেমনিভাবে সরকারী পদ-যার সাথে সর্বসাধারণের অধিকার জড়িত-তাও আমানতেরই অন্তর্ভুক্ত এবং একমাত্র সে সমস্ত লোকই এসব আমানতের অধিকারী, যারা নিজেদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সামর্থ্যরে দিক দিয়ে এসব পদের জন্য উপযোগী এবং উপস্থিত লোকদের মধ্যে উত্তম। আর বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীর দিক দিয়েও যারা অন্যান্যদের তুলনায় অগ্রগণ্য। এদের ছাড়া অন্য কাউকে এসব পদ অর্পণ করা হলে আমানতের মর্যাদা রক্ষিত হবে না।

4 সংবিধান সম্পর্কিত কয়েকটি মূলনীতিঃ

(১)      প্রথম বাক্য إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُكُمْ -এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, প্রকৃত হুকুম ও নির্দেশ দানের মালিক আল্লাহ্ তা’আলা। পৃথিবীর শাসকবর্গ তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না। শাসকবর্গ তো শুধুমাত্র ইচ্ছে ও প্রচেষ্টার কারণে শাস্তি কিংবা পুরস্কারের যোগ্য হবে। এভাবেই মূলতঃ শাসকবর্গ বিশ্ব পালনকর্তারই আজ্ঞাবহ। এতে প্রতীয়মান হয় যে, শাসনক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের মালিকও একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই।

(২)      সরকারী পদসমূহ অধিবাসীদের অধিকার নয়, যা জনসংখ্যার হারে বন্টন করা যেতে পারে; বরং এগুলো হল আল্লাহ্ প্রদত্ত আমানত, যা শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের পক্ষে যোগ্য ও যথার্থ লোককেই দেয়া যেতে পারে। অবশ্য কোন বিশেষ এলাকা বা প্রদেশের শাসনকল্পে সে এলাকার মানুষকে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে, যাতে বহুবিধ কল্যাণ নিহিত থাকবে। কিন্তু তাতে শর্ত হল এই যে, কাজের যোগ্যতা এবং আমানতদারীতার ব্যাপারে তার উপর পূর্ণ আস্থা থাকতে হবে।

(৩)      পৃথিবীতে মানুষের যে শাসন, তা শুধুমাত্র একজন প্রতিনিধি ও আমানতদার হিসেবেই হতে পারে। তারা দেশের আইন প্রণয়নে সে সমস্ত নীতিমালার অনুসরণে বাধ্য থাকবে যা একক ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে বাতলে দেয়া হয়েছে।

(৪)      তাদের নিকট যখন কোন মোকদ্দমা আসবে, তখন বংশ, গোত্র, বর্ণ, ভাষা এমনকি দ্বীন ও মতবাদের পার্থক্য না করে সঠিক ও ন্যায়সংগত মীমাংসা করে দেয়া শাসন কর্তৃপক্ষের উপর ফরয।

4 আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেনঃ “শাসনকর্তৃপক্ষের উপর ওয়াজিব হলো, আল্লাহর আইন অনুসারে বিচার করা, আমানত আদায় করা। যদি তারা সেটা করে তবে জনগণের উপর কর্তব্য হবে তার কথা শোনা, আনুগত্য করা, তার আহ্বানে সাড়া দেয়া।” [তাবারী]

৫৮নং আয়াত হতে- إِنَّ اللّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ – إِنَّ اللّهَ كَانَ سَمِيعاً بَصِيراً

4 রাষ্ট্রীয় সংবিধানের এসব মূলনীতি বর্ণনার পর বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তোমাদিগকে যে উপদেশ দিয়েছেন, তা খুবই উত্তম। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা সবার ফরিয়াদই শোনেন এবং যে লোক বলার কিংবা ফরিয়াদ করার সামর্থ্য রাখে না, তিনি তার অবস্থাও উত্তমভাবে দেখেন। অতঃএব তাঁর রচিত নীতিমালাই সর্বদা সকল রাষ্ট্রের জন্য সর্বযুগেই উপযোগী হতে পারে। পক্ষান্তরে মানব রচিত নীতিমালা ও সংবিধান শুধুমাত্র নিজেদের পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেগুলোরও পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অথচ আল্লাহ্ অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছু দেখেন এবং তাঁর সেরূপ মানব চিন্তায় অকল্পনীয় জ্ঞান দ্বারাই তিনি আমাদের জন্য জীবন বিধান পাঠিয়েছেন।

৫৯নং আয়াত হতে- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنكُمْ

4 পূর্ববর্তী আয়াতের লক্ষ্য যেমন শাসনকর্তৃপক্ষ ছিল, তেমনি এ আয়াতে সাধারণ মানুষকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্, রাসূল এবং তোমাদের সচেতন নেতৃবর্গের অনুসরণ কর”। আয়াতের এ অংশটি বুঝার জন্য আবারো শানে নুযূলের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। এছাড়াও হাদীসে এসেছে, আল্লাহর প্রতি ভালবাসা, আনুগত্য ইত্যাদি আল্লাহর রাসূলের প্রতি ভালবাসা ও তাঁর আনুগত্যের উপর নির্ভরশীল। তেমনিভাবে রাসূলের অবর্তমানে মুসলমানদের ইমাম বা নেতাগণের উপর নির্ভরশীল।

৫৯নং আয়াত হতে- وَأُوْلِي الأَمْرِ

4 ‘উলিল আমর’ আভিধানিক অর্থে সে সমস্ত লোককে বলা হয়, যাদের হাতে কোন বিষয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত থাকে। সে কারণেই ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা ও হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহ্ প্রমূখ মুফাস্সিরগণ ওলামা ও ফোকাহা সম্প্রদায়কে ‘উলিল আমর’ সাব্যস্ত করেছেন। তারাই হচ্ছেন মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নায়েব বা প্রতিনিধি। তাদের হাতেই দ্বীনী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত।

4 মুফাস্সিরীনের অপর এক জামা’আত-যাদের মধ্যে আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু প্রমূখ সাহাবায়ে কেরামও রয়েছেন-বলেছেন যে, ‘উলিল আমর’ এর অর্থ হচ্ছে সে সমস্ত লোক, যাদের হাতে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত।

4 ইমাম সুদ্দী এ মত পোষণ করেন। এছাড়া তাফসীরে ইবনে কাসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ শব্দটির দ্বারা (ওলামা ও শাসক) উভয় শ্রেণীকেই বোঝায়। কারণ, নির্দেশ দানের বিষয়টি তাদের উভয়ের সাথেই সম্পর্কিত।

4 আল্লামা আবু বকর জাস্সাস এতদুভয় মত উদ্ধৃত করার পর বলেছেন, সঠিক ব্যাপার হলো এই যে, এতদুভয় অর্থই ঠিক। কারণ, ‘উলুল আমর’ শব্দটি উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

4 অবশ্য এতে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন যে, ‘উলুল আমর’ বলতে ফকীহগণকে বোঝানো যেতে পারে না। তার কারণ, أولوا الأمر (উলিল আমর) শব্দটি তার শাব্দিক অর্থের দিক দিয়ে সে সমস্ত লোককে বোঝায়, যাদের হুকুম বা নির্দেশ চলতে পারে। বলাবাহুল্য, এ কাজটি ফকীহগণের নয়।

4 প্রকৃত বিষয় হলো এই যে, হুকুম চলার দু’টি প্রেক্ষিত রয়েছে। (এক) জবরদস্তিমূলক। এটা শুধুমাত্র শাসকগোষ্ঠী বা সরকার দ্বারাই সম্ভব হতে পারে। (দুই) বিশ্বাস ও আস্থার দরুন হুকুম মান্য করা। আর সেটা ফকীহগণই অর্জন করতে পেরেছিলেন এবং যা সর্বযুগে মুসলমানদের অবস্থার দ্বারা প্রতিভাত হয়। দ্বীনী ব্যাপারে সাধারণ মুসলমানগণ নিজের ইচ্ছা ও মতামতের তুলনায় আলেম সম্প্রদায়ের নির্দেশকে অবশ্য পালনীয় বলে সাব্যস্ত করে থাকে। তাছাড়া শরীয়তের দৃষ্টিতেও সাধারণ মানুষের জন্য আলেমদের হুকুম মান্য করা ওয়াজিবও বটে। সুতরাং তাদের ক্ষেত্রেও ‘উলুল আমর’-এর প্রয়োগ যথার্থ হবে।

4 এ আয়াতটি ইসলামের সমগ্র দ্বীনী, সামাজিক, সাংস্কৃকিত ও রাজনৈতিক জীবনের বুনিয়াদ। ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রের প্রথম ধারা। এখানে নিম্নলিখিত মূলনীতিগুলো স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়া হয়েছে-

4 (এক) ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় প্রকৃত আনুগত্যের হকদার হচ্ছেন আল্লাহ্ তা’আলা। একজন মুসলমানের সর্বপ্রথম পরিচয় হচ্ছে সে আল্লাহর বান্দা। এরপর অন্যান্য শরীয়তসম্মত আনুগত্য এবং হক আদায়। এসব আনুগত্য ও হক কেবলমাত্র তখনই আল্লাহর নিকট গৃহীত হবে যখন তা আল্লাহর আনুগত্যের অনুকূল ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে পালিত হবে। অন্যথায় সবকিছুই হবে পরিতাজ্য। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘স্রষ্টার নাফরমানি করে কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।’ [মুসনাদে আহমাদঃ ১/১২৯, ১৩১, সহীহ্ ইবনে হিব্বানঃ ১০/৪৩০]

4 (দুই) ইসলামী জীবন ব্যবস্থার দ্বিতীয় ভিত্তি হচ্ছে, রাসূলের আনুগত্য। এটি কোন স্বতন্ত্র কিছু নয়; বরং আল্লাহর আনুগত্যের বাস্তব ও কার্যকর পদ্ধতি। কেননা, আনুগত্যের এ বিধান আমাদের নিকট পৌঁছার একমাত্র বিশস্ত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলেন রাসূল। সুতরাং রাসূলের অনুমতি এবং নিষেধই হবে আনুগত্য ও ইবাদাত আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার একমাত্র মাপকাঠি। রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণেরই নামান্তর।

4 এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহর আনুগত্য করল এবং যে আমার নাফরমানি করল, সে আসলে আল্লাহরই নাফরমানি করল।’ [বুখারীঃ ২৭৯৭, মুসলিমঃ ১৮৩৫]

4 (তিন) আনুগত্যের তৃতীয় ভিত্তি হল ‘উলিল আমর’ অর্থাৎ, দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারীদের আনুগত্য। এ আনুগত্য ওয়াজিব। মুসলমানদের সামাজিক ও সামষ্টিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে দায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ অর্থাৎ, যারা মুসলমানদের মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাগত ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী উলামায়ে কেরাম, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, দেশের শাসক, বিচারপতি, গ্রাম ও মহল্লার শেখ বা প্রধানরা সবাই উলিল আমরের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।

4 এ ক্ষেত্রে দু’টি শর্ত পূর্ণ হওয়া অপরিহার্য- (১) তাকে মুসলিম দলভুক্ত হতে হবে এবং (২) আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অনুগত হতে হবে।

4 এ ব্যাপারে হাদীসের বর্ণনা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘নিজের নেতৃবৃন্দের কথা শুনা ও মেনে চলা মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য, তা তার পছন্দ হোক বা না হোক, যে পর্যন্ত না তাকে নাফরমানির হুকুম দেয়া হয়। আর যখন তাকে নাফরমানির হুকুম দেয়া হয়, তখন কিছু শোনা ও আনুগত্য করা উচিত নয়।’ [মুসলিমঃ ১৮৩৯]

4 হাদীসে এসেছে, ‘আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানির ক্ষেত্রে কোন আনুগত্য নেই, আনুগত্য করতে হবে শুধু ‘মারূফ’ বা বৈধ ও সৎকাজে।’ [ব্খুারীঃ ৬৮৩০, মুসলিমঃ ১৮৪০]

4 এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘তোমাদের উপর এমনসব লোকও শাসন-কর্তৃত্ব চালাবে, যাদের অনেক কথাকে তোমরা ‘মা’রূফ’ বা বৈধ এবং অনেক কথাকে ‘মুনকার’ বা অবৈধ পাবে। এক্ষেত্রে যে ব্যক্তি তাদের মুনকারের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে সে দায়মুক্ত হয়ে গেছে। আর যে ব্যক্তি তা অপছন্দ করেছে, সেও বেঁচে গেছে। কিন্তু যে ব্যক্তি সেসবে সন্তুষ্ট হয়েছে এবং তার অনুসরণ করেছে, সে পাকড়াও হবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ আমরা কি তাদের সাথে যুদ্ধ করব না? তিনি বললেনঃ না, যতক্ষণ তারা সালাত আদায় করতে থাকবে।’ [মুসলিমঃ ১৮৫৪] অর্থাৎ, সালাত পরিত্যাগ করা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যহীনতার আলামত। এ অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা ন্যায়সংগত হবে।

4 অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যতদিন তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম করতে থাকবে।’ [মুসলিমঃ ১৮৫৫, মুসনাদে আহমাদঃ ৩/২৮] এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তারা নিজেরা সালাত আদায় করলেই চলবে না; বরং সাথে সাথে তাদের আওতাধীন ব্যবস্থাপনায় ইকামতে সালাত বা সালাত প্রতিষ্ঠিত থাকা জরুরী। যদি এতটুকুও না হয় তাহলে এর অর্থ হবে যে, তারা ইসলামী শাসনব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের শাসন ব্যবস্থা উল্টে ফেলার জন্য প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালানো মুসলমানদের জন্য বৈধ ও জায়েয হবে।

4 এ কথাটিই এক হাদীসে এভাবে এসেছে, ‘যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের সাথে এ ব্যাপারেও অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, ‘আমরা আমাদের ক্ষমতাসীনদের সাথে ঝগড়া করব না, তবে যখন আমরা তাদের কাজে প্রকাশ্য কুফরী দেখতে পাব যে কুফরীর ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে পেশ করার জন্য আমাদের কাছে প্রমাণ থাকবে।’ [বুখারীঃ ৭১৯৯,৭২০০, মুসলিমঃ ১৭০৯] কিন্তু এ ব্যাপারেও মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। যদি শাসকদের সাথে ঝগড়া করার কারণে মুসলমানদের ক্ষতির সম্ভাবনা অধিক হয়, তবে এরূপ ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া নিষেধ।

4 (চার) চতুর্থ মূলনীতি হচ্ছে ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় আল্লাহ্ হুকুম ও রাসূলের সুন্নাত হচ্ছে মৌলিক আইন ও চুড়ান্ত সনদ। অতঃপর মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে অথবা শাসক ও জনগণের মধ্যে কোন বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে মীমাংসার জন্য কুরআন ও সুন্নার দিকে ফিরে আসতে হবে। এরপর কুরআন ও সুন্নাহ্ যে মীমাংসা করে দেবে তার সামনে মাথা নত করে দিতে হবে। কোন জীবন ব্যবস্থায় এ বিষয়টি যদি অনুপস্থিত থাকে তাহলে বুঝতে হবে যে, তা অনৈসলামিক ব্যবস্থা।

৫৯নং আয়াত হতে- فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ

4 আল্লাহ্ অন্যত্র বলেনঃ وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ “তোমাদের মধ্যে যে বিষয়েই মতবিরোধ দেখা দিক না কেন, তার মীমাংসা আল্লাহর নিকট।” [সূরা আশ্-শূরাঃ ১০]

4 মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ্ সহ একাধিক পূর্বসূরী মুফাসসির এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ ‘আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর নিকটই বিরোধীয় বিষয় উপস্থাপন করতে হবে।’ [ইবনে কাসীর]

৫৯নং আয়াত হতে- إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ – ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً

4 যদি আল্লাহ্ ও আখেরাতের উপর ঈমান এনে থাকে; অর্থাৎ, এর বিপরীত আচরণ এমনকি বিশ্বাস দ্বারা মুসলমানদেরও একটা বিরাট অংশ ঈমানহীনতারই পরিচয় দিচ্ছে মূলতঃ। অথচ আল্লাহ্ বলছেনঃ এটাই উত্তম ও পরিণামে প্রকৃষ্ট। এটা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রের জন্যই।

শিক্ষাঃ

১) আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দেয়া অতীব অপরিহার্য।

২) আমানত একটি ব্যাপক শব্দ যেখানে জীবনের সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম বিষয়াদি থেকে শুরু করে রাষ্টক্ষমতা, বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি শামিল।

৩) বিচারকার্যে ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করা; হোক তা রাষ্ট্রীয় প্রধান বিচারালয় কিংবা একান্ত পারিবারিক বৈঠক।

৪) মানুষের জন্য তিনিই সর্বোৎকৃষ্ট বিধান রচনা করতে পারেন, যিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একসাথে দেখতে পান অর্থাৎ, সর্বদ্রষ্টা অর্থাৎ, আল্লাহ।

৫) কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্য ওয়াজিব আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের শর্তে এবং সৎকাজে।

৬) বিরোধপূর্ণ বিষয়াদি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিধানাবলীর নিকট পেশ করা হচ্ছে আল্লাহ্ ও আখেরাতে বিশ্বাসের একটি মাপকাঠি।

৭) উল্লেখিত বিধানাবলী তথা আল্লাহর বিধানের অনুসরণ দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের পরিণামেই উৎকৃষ্টতর।

4 পরিশেষে,  বলেছেনঃrরাসূল  “কোন ব্যক্তি তোমার নিকট কিছু গচ্ছিত রাখলে তাকে তা পৌঁছে দাও। কেউ তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও তুমি তার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করো না।” [আহমাদ] এবং إِنَّ هُدَى اللّهِ هُوَ الْهُدَى “আল্লাহর হেদায়াতই প্রকৃত হেদায়াত।” [সূরা আল-বাকারাহ্ঃ ১২০]

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s