সূরা আল বাকারাহ্: ২১৪ নং আয়াত

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

জান্নাতের পথ বড়ই বন্ধুর

اَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ

তিলাওয়াত:
أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَزُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ.

বঙ্গানুবাদ: তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ এখনো তোমাদের কাছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত অবস্থা আসেনি? অর্থ-সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত-কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তাঁর সংগী-সাথী ঈমানদারগণ বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহ্‌র সাহায্য কখন আসবে?’ জেনে রাখ, অবশ্যই আল্লাহ্‌র সাহায্য অতি নিকটে।

নামকরণ: বাকারাহ মানে গাভী। এ সূরার ৬৭নং থেকে ৭১নং পর্যন্ত আয়াতগুলোতে গাভীর উল্লেখ ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা এসেছে। মূলতঃ এ সূরাটির নামকরণ হয়েছে শব্দচয়ন ভিত্তিক। শুধুমাত্র গাভী সম্পর্কিত আলোচনাই এসেছে, ব্যাপারটি তা নয়; বরং গাভী বা বাকারাহ্ শব্দটি শুধু নামের জন্য চয়ন করা হয়েছে।

সূরা আলবাকারাহ্ গুরুত্ব ফযীলত:
১) সূরাটি সবচেয়ে বড় সূরা।
২) সূরাটি সবচেয়ে বেশী আহ্‌কাম সমৃদ্ধ।
৩) রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সূরা পাঠ করার বিভিন্ন ফযীলত বর্ণনা করেছে: মুসলিম শরীফে আবু উমামাহ্‌ আল-বাহেলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর; কেননা কেয়ামতের দিন এই কুরআন তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হিসাবে আসবে। তোমরা দু’টি পুস্প সূরা আল-বাকারাহ্‌ ও সূরা আলে-ইমরান তিলাওয়াত কর, কেননা কেয়ামতের দিন এ দু’টি সূরা এমনভাবে আসবে যেন এ দু’টি হচ্ছে দু’খণ্ড মেঘমালা অথবা দু’টুকরো কালো ছায়া অথবা দু’ঝাঁক উড়ন্ত পাখি। এ দু’টি সূরা যারা তিলাওয়াত করবে তাদের থেকে (জাহান্নামের আযাবকে) প্রতিরোধ করবে। তোমরা সূরা বাকারাহ্‌ তিলাওয়াত কর। কেননা, এর নিয়মিত তিলাওয়াত হচ্ছে বারাকাহ্‌ বা সমৃদ্ধি এবং এর তিলাওয়াত বর্জন হচ্ছে আফসোসের কারণ। আর যাদুকররা এর উপর কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না’। [মুসলিম: ৮০৪]
ইমাম আহমাদ, দারেমী, হাকেম তার মুস্তাদরাকে বর্ণনা করেন: রাসূল (সা) বলেছেন: ‘তোমরা সূরা আল-বাকারাহ্‌ পাঠ কর। কেননা এর পাঠে বরকত লাভ হয় এবং পাঠ না করা অনুতাপ ও দুর্ভাগ্যের কারণ। যে ব্যক্তি এ সূরা পাঠ করে তার উপর কোন আহ্‌লে বাতিল তথা যাদুকরের যাদু কখনও প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। [ইমাম ইবনে কাসীর বলেন: সনদটি হাসান, মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী বর্ণিত]
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন: ‘তোমরা তোমাদের ঘরসমূহকে কবর বানিওনা, নিশ্চয়ই শয়তান ঐ ঘর থেকে পালিয়ে যায় যে ঘরে সূরা আল-বাকারাহ্‌ পাঠ করা হয়’। [মুসলিম: ৭৮০] অন্য বর্ণনায় এসেছে, যে  ঘরে সূরা আল-বাকারাহ্‌ পড়া হয় সেখানে শয়তান প্রবেশ করে না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘প্রত্যেক বস্তুরই উচ্চ স্তম্ভ রয়েছে, কুরআনের সুউচ্চ শৃংগ হলো সূরা আল-বাকারাহ্‌’। [সহীহ ইবনে হিব্বান, তিরমিযী, মুসান্নাফ আব্দুর রায্‌যাক, হাকেম]
৪) রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনের যুদ্ধের দিন সাহাবায়ে কেরামকে ডাকার সময় বলেছিলেন: ‘হে সূরা আল-বাকারাহ্‌র বাহক (জ্ঞানসম্পন্ন) লোকেরা’। [মুসলিম]
৫) সূরা আল-বাকারাহ্‌ তিলাওয়াত করলে সেখানে ফিরিশ্‌তাগণ আলোকবর্তিকার মত অবতরণ করে। এ প্রসংগে বিভিন্ন সহীহ্‌ হাদীসে বর্ণনা এসেছে। [বুখারী: ৫০১৮, মুসলিম: ৭৯৬, আহমাদ]
৬) যে সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম সূরা আল-বাকারাহ্‌ জানতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নেতৃত্বের যোগ্যতাসম্পন্ন মনে করতেন এবং তাদেরকে যুদ্ধে আমীর বানাতেন। [সহীহ ইবনে খুযাইমাহ, বায়হাকীর দালায়েলুন্‌নাবুওয়াত]
৭) অনুরূপভাবে যারা সূরা আল-বাকারাহ্‌ এবং সূরা আলে-ইমরান জানতেন, সাহাবাদের নিকট তাদের মর্যাদা ছিল অনেক বেশী। [মুসনাদে আহমাদ: ৩/১২০, ১২১। শেখ আরনাউত বলেন: সনদটি বুখারী-মুসলিমের শর্তে শুদ্ধ]
সর্বোপরি এ সূরাতে আল্লাহ্‌র “ইসমে ‘আযম” রয়েছে, যার দ্বারা দো’আ করলে আল্লাহ্‌ সাড়া দেন। এ সূরায় এমন একটি আয়াত রয়েছে যা কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত। এ আয়াতটি হচ্ছে আয়াতুল কুরসী, যাতে মহান আল্লাহ্‌ তা’আলার নাম ও গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে।

নাযিলের সময়কাল: সূরাটি মাদানী। বেশীর ভাগ মদীনায় হিজরতের পরে মাদানী জীবনের একেবারে প্রথম যুগে এবং কম অংশ পরে নাযিল হয়।

বিষয়বস্তু: জান্নাতের পথ খুব সহজ নয়। এর জন্য পরীক্ষা দিতে হবে। আর পরীক্ষাও খুব সহজ নয়। ঈমানের মান অনুযায়ী ছোট থেকে বড় হতে হতে এমন ভয়ংকর পরীক্ষাও এ পথে আসতে পারে, যার ভয়াবহতায় ঈমানদারগণ ও নবীগণ পর্যন্ত বলে উঠেন: “কবে আল্লাহর সাহায্য আসবে?” কিন্তু আল্লাহর সাহায্য আসবেই এবং তা অনিবার্য। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য্য ও ঈমানের সাথে জিহাদ চালিয়ে যাওয়া।

ব্যাখ্যা: এ আয়াত ও আয়াতের মাঝখান একটি পূর্ণাংগ কাহিনী অবর্ণিত রয়ে গেছে। আয়াতে এদিকে ইংগিত করা হচ্ছে এবং কুরআনের মক্কী সূরাগুলোয় (যেগুলো সূরা বাকারার পূর্ব নাযিল হয়েছে) এ কাহিনী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। দুনিয়ার যে কোন দেশে যখনই নবীদের আর্বিভাব ঘটেছে তখনই তাঁরা ও তাঁদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী গোষ্ঠী আল্লাহদ্রোহী মানব সমাজের কঠোর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছেন। দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। যে শয়তানী ও বিদ্রোহী শক্তি এ সংগ্রামের পথে প্রতিবন্ধকতা  সৃষ্টি  করেছে  তার  শক্তি  চূর্ণ  করার জন্য ঈমানদারদের পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করতে হয়েছে। ইবনে কাসীর উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন: রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে তার কুফরীর অবস্থায় জিজ্ঞেস করেছিলেন- ‘এই নবুয়তের দাবীদার (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে আপনাদের কোন যুদ্ধ হয়েছিল কি’? আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন- ‘হাঁ’। হিরাক্লিয়াস পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন- ‘যুদ্ধের ফলাফল কি হয়েছিল’? তিনি বলেন- ‘কখনো আমরা জয়যুক্ত হয়েছিলাম এবং কখনো তিনি।’ হিরাক্লিয়াস বলেন- ‘এভাবেই নবী আলাইহিমুস্ সালামদের পরীক্ষা হয়ে আসছে। কিন্তু পরিণামে প্রকাশ্য বিজয় তাদেরই হয়ে থাকে।’ [ইবনে কাসীর]
এ আয়াতে কয়েকটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য-
প্রথমত: পরিশ্রম ও সাধনা ব্যতীত এবং বিপদ-আপদে পতিত হওয়া ছাড়া কেউই জান্নাত লাভ করতে পারবে না।
লোকেরা কি এমনি এমনি জান্নাতে প্রবেশ করার আশা করে বসে আছে? অথচ আল্লাহ্ সূরা আলে ইমরানের ১৪২ নং আয়াতে ঘোষণা করে দিয়েছেন-
أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ.[آل عمران: 142]
“তোমরা কি মনে করে রেখেছ তোমরা এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ এখনো আল্লাহ দেখেনইনি, তোমাদের মধ্যে কে তাঁর পথে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে প্রস্তুত এবং কে তাঁর জন্য সবরকারী।”
পরীক্ষা ব্যতীত জান্নাতের যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হবে না। চাই তা যত বড় কিংবা যত ছোটই হোক না কেন। আল্লাহ্ তা’আলা সূরা আল ‘আনকাবূতের ২ ও ৩ নং আয়াতে বলেন-
أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ () وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ () [سورة العنكبوت: 2-3]
“লোকেরা কি মনে করে রেখেছে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’, কেবলমাত্র একথাটুকু বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে, আর পরীক্ষা করা হবে না? অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদের সবাইকে পরীক্ষা করে নিয়েছি আল্লাহ অবশ্যই দেখবেন কে সত্যবাদী এবং কে মিথ্যুক।” শুধু কি জান্নাতের জন্য আল্লাহ্ পরীক্ষা নেবেন? না; বরং আল্লাহ্ তা’আলা সূরা আল আনকাবূতের ২নং يُتْرَكُوا শব্দ ব্যবহার করে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন যে, জান্নাত লাভ করার জন্য পরীক্ষা নেয়া হবে, কিন্তু জান্নাত লাভ করতে না পারলে জাহান্নাম প্রস্তুত রয়েছে; কাউকেই ছেড়ে দেয়া হবে না। কারণ, আল্লাহর প্রতিদানে ‘জান্নাত’ ও ‘জাহান্নাম’-এর বাইরে আর কোন তৃতীয় জায়গা তিনি রাখেননি। অতঃপর ৩ নং আয়াতে বলেন- ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী আর মিথ্যাবাদীদের তিনি পরীক্ষার দ্বারা চিনে নেবেন।
সূরা আল বাক্বারার ১৫৫ থেকে ১৫৭ নং আয়াতে মূলতঃ কারা সত্যানুসারী তাদের পরিচয় দান প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন:
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ () الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ () أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ () [سورة البقرة: 155-157]
“আর নিশ্চয়ই আমরা ভীতি, অনাহার, প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে এবং উপার্জন ও আমদানী হ্রাস করে তোমাদের পরীক্ষা করবো। এ অবস্থায় যারা সবর করে এবং যখনই কোন বিপদ আসে বলে: “আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকে আমাদের ফিরে যেতে হবে, -তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দাও। তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের ওপর বিপুল অনুগ্রহ বর্ষিত হবে, তাঁর রহমত তাদেরকে ছায়াদান করবে এবং এই ধরণের লোকরাই হয় সত্যানুসারী।”
হাদীসে রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন: ‘সবচেয়ে অধিক বালা-মুসীবতে পতিত হয়েছেন নবী-রাসূলগণ। তারপর (মর্যাদার দিক থেকে) তাদের নিকটবর্তী ব্যক্তিগণ। [ইবনে মাজাহ্: ৪০২৩]

দ্বিতীয়ত: নবীগণ ও তাদের সাথীদের প্রার্থনা যে, ‘আল্লাহ্‌‌র সাহায্য কখন আসবে’ এতে সন্দেহ নয়; বরং আল্লাহর ওয়াদা সত্য কিন্তু এর জন্য সময় ও স্থান নির্ধারিত নয়। এমন প্রার্থনা আল্লাহ্‌‌র প্রতি ভরসা ও শানে নবুয়তের খেলাফ নয়। বরং আল্লাহ্‌ সবিনয় প্রার্থনাকে পছন্দ করেন।
এ প্রসঙ্গে খাব্বাব ইবন্ আরাছ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ সহীহ্ হাদীসে তিনি বলেন: আমি বল্লাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য দো’আ করছেন না? (উত্তরে) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তোমাদের পূর্ববর্তীগণও তাওহীদবাদী ব্যক্তি ছিল, যাদের মাথার উপরে করাত রেখে পা পর্যন্ত ফেঁড়ে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলা হয়েছিল, কিন্তু তথাপি তারা তাওহীদের বিশ্বাস ও দ্বীনের অনুসরণ থেকে বিন্দুমাত্র সরে পড়েননি। আর কারো কারো দেহ থেকে লোহার চিরুনী দিয়ে আঁচড়িয়ে গোশত আলাদা করা হয়েছিল, কিন্তু তবু তারা আল্লাহর দ্বীন ত্যাগ করেননি। তারপর বললেন: আল্লাহর শপথ! আমাদের এ দ্বীনকে আল্লাহ্ পরিপূর্ণ করবেনই। তখন যে কোন অশ্বারোহী সান’আ হতে হাদরামাউত পর্যন্ত আল্লাহর ভয় ছাড়া নির্ভয়ে পদচারণা করতে পারবে। তবে কারো এ ভয় আসা অন্য কথা যে, হয়ত তার ছাগলের উপর বাঘ আক্রমণ করবে। কিন্তু (আমি শংকিত) তোমরা দ্রুত বিজয় চাচ্ছো। [ইবনে কাসীর]
যে কোন আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে গেলে কিছু মানুষকে তো জীবন দিতেই হবে। ইসলাম আল্লাহর মনোনীত আদর্শ এবং এ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাই এর প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যাচারে লড়াইয়ে যারা জীবন দান করবেন, তাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ্ সূরা আল বাক্বারার ১৫৪ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন-
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ () [سورة البقرة: 154]
“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না। এই ধরনের লোকেরা আসলে জীবিত। কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে তোমাদের কোন চেতনা থাকে না।” এছাড়াও এ প্রসংগে কুরআনুল কারীমে আরো বহু জায়গায় আল্লাহ্ আলোচনা করেছেন। যেমন: বাকারাহ্: ২০৭, ২৪৫, আলে-ইমরান: ১৪২, ১৬৯, তাগাবুন: ১১, ১৫, ১৬, তাওবাহ্: ২৪, আহযাব: ১১, মুলক: ২, হাদীদ: ২২, মুহাম্মাদ: ৩১, মুনাফিকূন: ৯।
মূলতঃ এই পুরো দুনিয়াটাই তো মুমিনের জন্য একটি কারাগার স্বরূপ। তাই কারাগারে দুঃখ-কষ্ট থাকবেই। এ কথাটাই রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে জানিয়ে গেছেন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ-قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ. [رواه مسلم: 14/205، الشاملة: 5256]
আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু থকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “দুনিয়াটা হলো মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফেরের জন্য জান্নাত।” [মুসলিম: ১৪/২০৫]
আজকে যারা শাসক, অত্যাচার অবিচারের মাধ্যমে অতীষ্ট করে তুলছে সত্যপন্থীদের জীবন, তারাই যে চিরদিন ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকে, একথা সত্য নয়; বরং আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর সৃষ্ট এ পৃথিবীতে ক্ষমতার আবর্তন ঘটান। তিনি বলেন-
وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنْكُمْ شُهَدَاءَ. [سورة آل عمران: 140]
“মানুষের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আমরা এ দিনগুলোর আবর্তন ঘটাই, যাতে আল্লাহ্‌‌ মুমিনগণকে জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যককে শহীদরূপে গ্রহণ করতে পারেন।” [সূরা আলে ইমরান: ১৪০] এ সম্পর্কিত আরো আলোচনা এসেছে- হজ্জ: ৫৮-৫৯, আলে ইমরান: ১৫৭, ১৬৯, ১৯৫, বাকারাহ্: ১৫৪, মুহাম্মাদ: ৪-৬, ইয়াসীন: ২৬, মুমিন: ২৮ ও বুরূজ: ৮-৯।
কখনো কখনো বাতিলপন্থী শক্তির অত্যাচার এতটাই সীমা ছাড়িয়ে গেছে যে, নবীগণ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট দো’আ করেছিলেন এই বলে যে, “এখন আপনিই প্রতিশোধ গ্রহণ করুন!”-     [سورة القمر: 10] فَدَعَا رَبَّهُ أَنِّي مَغْلُوبٌ فَانْتَصِرْ ()
“তিনি তার রবকে ডেকে বললেন: আমি পরাভূত, এখন আপনিই প্রতিশোধ গ্রহণ করুন!” [সূরা কামার: ১০]
আল্লাহ্ রাব্বুল ‘আলামীন যাদেরকে যমীনের বুকে প্রতিষ্ঠা দান করেন, তিনি মাত্র চারটি কাজ দাবী করেন তাদের কাছ থেকে। অথচ তারা মাত্র এ চারটি কাজ ভুলে গিয়ে খোদ সে খোদার বিরুদ্ধেই সংগ্রাম করাকে নিজেদের কাজ মনে করতে থাকে এবং আল্লাহর নবী ও তাদের অনুসারীদের উপর অত্যাচারকে নিজেদের সাফল্য ভাবতে থাকে। আল্লাহ্ বলেন-
الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ. [سورة الحج: 41]
“তারা এমন লোক যাদেরকে আমরা যমীনের বুকে প্রতিষ্ঠিত করলে সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে; আর সব কাজের চুড়ান্ত পরিণতি আল্লাহ্‌র ইখতিয়ারে।” [সূরা আল-হজ্জ: ৪১]
যে জীবন নিয়ে মুমিনগণ শংকিত, আসলে কি সে জীবনের মালিক তারা নিজেরা? না; বরং ঈমান আনার সাথে সাথে তাদের রবের সাথে এমন এক ব্যবসায়িক চুক্তিতে জড়িয়েছে যার পণ্য হলো তাদের নিজ নিজ জীবন ও সম্পদ। ব্যবসার লাভ হিসেবে তারা পাবে ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের বিনিময়ে অনন্ত সুখের জান্নাত। তাই মুমিনদের জীবন ও সম্পদ যে সুযোগ্য ব্যবসায়ী ক্রয় করে আবার মুমিনদের নিকটই এর ব্যবহারের জন্য জমা রেখেছেন, মুমিনদের কি উচিত নয় চুক্তি অনুযায়ী তাঁর কথা মেনে চলা? অবশ্যই; বরং তাতেই রয়েছে মহাসাফল্য। যারা তা বুঝতে পারে, তারাই এগিয়ে যায় কষ্ট, ক্লেশ, গ্লানি ও মৃত্যুর বিভিষিকাময় আল্লাহর পথে। তারা সে পথে যুদ্ধ করে! তারা আল্লাহর শত্রুদের মারে ও নিজেরাও ইসলামের জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়। আল্লাহ্ বলেন-
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ () [سورة التوبة: 111]
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ কিনে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহ্‌র পথে যুদ্ধ করে, মারে ও মরে। তাওরাত, ইন্‌জীল ও কুরআনে এ সম্পর্কে তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহ্‌র চেয়ে শ্রেষ্ঠতর কে আছে? তোমরা যে সওদা করেছ সে সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং ওটাই তো মহাসাফল্য।” [সূরা তাওবাহ্: ১১১]
তদুপরি পৃথিবী তো নিঃশেষের জন্যই সৃজিত হয়েছে। এখানে কেউ থাকবে না; কিছুই থাকবে না। সবাইকেই চলে যেতে হবে। আর এতে রয়েছে ভাল ও মন্দ। যদি চলেই যেতে হয় তবে মন্দকে নিয়ে কেন যাবো? ভালো নিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য আল্লাহ্ ডাকছেন মানুষকে- كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَنَبْلُوكُمْ بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ. [سورة الأنبياء: 35]
“প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছি, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার দিকে ফিরে আসতে হবে।” [সূরা আল আন্বিয়া: ৩৫]

শিক্ষা: ১. জান্নাতে প্রবেশ করা খুব সহজ নয়। ২. জান্নাত লাভের জন্য পরীক্ষা দিতে হবে। ৩. পরীক্ষার বিষয়গুলো যথাক্রমে সম্পদের ক্ষতি, ক্ষুধা, ভয়, ব্যাধি; এমনকি জীবন বিনাশও হতে পারে। ৪. ঈমানের মান অনুযায়ী পরীক্ষায় কঠোরতা হয়ে থাকে। ৫. ধৈর্য্যের সাথে উত্তীর্ণ হলে সে অনুযায়ী ফলাফল ও মর্যাদা লাভ হয়ে থাকে। ৬. আল্লাহর সাহায্য মুমিনদের খুব নিকটেই থাকে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s