আলো-আঁধারের খেলা (ধারাবাহিক উপন্যাস)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন জুবায়ের হুসাইন

নয়.
স্বপ্ন দেখা একপ্রকার ভুলেই গেছেন মোতালেব হোসেন। রাতে ঘুমের ঘোরে হয়তো স্বপ্ন-টপ্ন দেখেন, কিন্তু জেগে উঠার পর সেটা আর মনে থাকে না।
একসময় অনেক স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কত রাতে স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছেন, হাউমাউ করে কেঁদেছেন। আবার স্বপ্নকে বুকে নিয়ে দিন অতিবাহিতও করেছেন। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা ছাড়াও দু’চোখে স্বপ্ন আঁকতে ভালোবাসতেন তিনি। কী এক সময়ই না ছিল তখন!
সেসব দিনগুলোর কথা মনে হলেই চোখে পানি এসে যায় মোতালেব হোসেনের।
নতুন করে আবারও স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে ইদানীং। কিন্তু ভয় করে, নিজের মধ্যে কেমন গুটিয়ে যান তিনি।
ডান হাতে ছুরির যখমটা বেশ গভীরই ছিল। তীব্র যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র শিরা-উপশিরায়। পেন কিলার খেয়েছেন দু’টো, কিন্তু ব্যথা খুব একটা কমছে না। রাত যত গভীর হচ্ছে, ব্যথার তীব্রতা ততই বাড়ছে।
শরীরে ব্যথা নিয়েই একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। অনেক দিন পর আজ স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্ন দেখলেন বলা হলো এই কারণে যে তিনি ঘুম থেকে জাগার পরও স্বপ্নের বিষয়টা মনে রাখতে পারছেন।
প্রকাণ্ড একটা লবণের দানা আকাশ থেকে মোতালেব হোসেনের মাথার উপর পড়ছে। মাথায় প্রচণ্ড চাপ অনুভব করছেন তিনি। যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছে কপালের রগ। নিচে পড়তে থাকা লবণের দানা অকস্মাৎ রূপ নিল আগুনের কুণ্ডলিতে। চোখে-মুখে ভীষণ তাপ ছড়াচ্ছে ওটা। পুড়ে যাচ্ছে।
ছটফট করছেন মোতালেব হোসেন। পরিত্রাণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই রেহাই পাচ্ছেন না।
দৃশ্যটা হঠাৎ পাল্টে গেল। বিকট দর্শন এক বাঘ তাড়া করছে মোতালেব হোসেনকে।
ভীষণ গতিতে তেড়ে আসছে বাঘটা। এক বিঘত পরিমাণ জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে বাইরে। টপ টপ করে লালা ঝরছে। হা হা শব্দ উঠছে বাতাসে।
পের উঠছেন না বাঘের সাথে দৌড়ে মোতালেব হোসেন। হাঁফ ধরে গেছে শরীরে। হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় দড়াম দড়াম করে বাড়ি খাচ্ছে। যেন পাজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে।
বাঘটা প্রায় ধরে ফেলেছে তাকে। এই সময় নিজেকে আবিষ্কার করলেন আকাশ থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছেন তিনি। পড়ছেন। পড়ছেন। দু’কানের পাশ ঘেষে বাতাসের শোঁ শোঁ বয়ে যাচ্ছে।
নিচে কোনো ডাঙা দেখছেন না তিনি। যেন অনন্তকাল ধরে নিচে পড়ছেন। এ পড়ার শেষ নেই।
আবারও লবণের দানাটা ফিরে এসেছে। শুয়ে আছেন তিনি। তীব্র যন্ত্রণায় কপালের রগ টন টন করছে। আর মাথার উপর ধেয়ে আসছে কয়েক মণ ওজনের লবণের দানা।
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন মোতালেব হোসেন। ঘামে ভিজে গেছে সমস্ত শরীর। এখনও ঘামছেন।
মুখ হা করে হাঁফাচ্ছেন মোতালেব হোসেন। স্ত্রীকে ডাকতে গিয়েও ডাকলেন না। ঘুমাক বেচারি।
খাট থেকে নামলেন তিনি। শরীরটা টলে উঠল। মশারী টানানোর কাঠের ফ্রেমটা ধরে পতন ঠেকালেন। নিজেকে ধাতস্থ হতে সময় দিলেন। তারপর টেবিলে রাখা জগ থেকে গেলাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে খেয়ে ফেললেন।
প্রচণ্ড জ্বর বয়ে যাচ্ছে মোতালেব হোসেনের শরীরে। একটু আগে শরীর ঘামিয়েছে। কিন্তু মুহূর্তেই আবার জ্বর চলে এসেছে। নাক দিয়ে নিঃশ্বাসের সাথে গরম হলকা বের হচ্ছে।
টেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটা দেখলেন তিনি। একটু পর ফজরের আজান হবে।
খাটে এসে বসলেন আবার। এই সময় বেজে উঠল মোবাইল ফোনটা। সালমা বানুর মাথার কাছে বাজছে ওটা।
নিজের মোবাইলটা তো আজই খুইয়েছেন। মনে পড়ল। কিন্তু এই অসময় কল দেয় কে?
জেগে উঠলেন সালমা বানু। আন্দাজের উপর তুলে নিলেন মোবাইল সেট। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললেন, ‘হ্যালো?… কে?… ও, নাজমা? হ্যাঁ নাও, তোমার মিয়াভাইকে দিচ্ছি।’ পাশে তাকালেন। কিন্তু মোতালেব হোসেনকে বসে থাকতে দেখে একটু অবাক হলেন। বললেন, ‘তোমার ফোন, নাজমা কথা বলবে।’
‘এই অসময়?’ মোবাইলটা নিতে নিতে বললেন মোতালেব। তারপর ওটা কানে ঠেকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ বল।’ ওপাশের কথা শুনলেন। তারপর বললেন, ‘আর বলিস না, আমার সেটটা আজ বিকেলে ছিনতাই হয়ে গেছে।… না না, আমার কিছু হয়নি। ওই ওদের একজনের ছুরির একটু খোঁচা লেগেছে হাতে।… আরে না, বললাম তো তেমন কিছু হয়নি।… হ্যাঁ ওষুধ খেয়েছি।… আব্বা?.. হ্যাঁ, আব্বা এখন অনেকটাই সুস্থ। তুই একবার আয় না। এসে দেখে যা। আব্বা খুব খুশি হবেন।… কী বললি? এখন আসতে পারবি না?… ও. আচ্ছা, ঠিক আছে।… মায়ের সাথে কাল কথা হয়েছিল। ভালো আছে।… সাইমার কথা বলছিস? ও-ও ভালো আছে।… হ্যাঁ, লেখাপড়া নিয়মিত করছে। তোদের কথা তো কিছু বললি না। জামাই কেমন আছে?… আর মারিয়া?… কী বললি? খুব দুষ্টু হয়েছে? এই বয়সে একটু তো দুষ্টুমি করবেই। তুই কি কম দুষ্টু ছিলি? আর…’ কী বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেলেনে মোতালেব। কেমন আনমনা হয়ে গেলেন।
তিনি এতটাই আনমনা হয়ে গেলেন যে ওপাশ থেকে নাজমা কী কী বলে গেল তার কিছুই বুঝলেন না। একসময় বললেন, ‘ও হ্যাঁ, কী যেন বলছিলি?… নারে, হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল কি না, তাই। তা তোর শ্বশুর শাশুড়ি কেমন আছে?… তাদেরকে আমার সালাম দিস।… আচ্ছা ঠিক আছে, রাখ।’
মোবাইল সেটটা কানের উপর থেকে নামিয়ে সালমাকে ফেরত দিলেন মোতালেব।
‘তুমি কখন উঠেছ?’ জিজ্ঞেস করলেন সালমা বানু।
‘এই তো কিছুক্ষণ হলো?’ জবাব দিলেন মোতালেব হোসেন।
‘শরীর কি খুব বেশি খারাপ লাগছে?’
‘গা-টা কেমন টলছে। কোনো বল পাচ্ছিনে। আর…’
‘আর কী?’ কিছুটা উদ্বিগ্ন শোনালো সালমার কণ্ঠ। ঘুম পুরোপুরি চলে গেছে চোখ থেকে।
‘না কিছু না।’ এড়িয়ে গেলেন মোতালেব।
‘অ্যাই, কী হয়েছে তোমার?’ উঠে সরে এসে স্বামীর কপালে হাত রাখলেন। ‘এ কী! জ্বরে যে গা পুড়ে যাচ্ছে! কখন এলো জ্বর?’
মোতালেবের শরীরটা এবার বেশ জোরেই টলে উঠল। মাথার ভেতর একটা চক্কর দিয়ে উঠল। পাশ ঘুরে পড়ে গেলেন বিছানায়।
(এরপর আগামীকাল)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s