আলো-আঁধারের খেলা (ধারাবাহিক উপন্যাস)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন জুবায়ের হুসাইন

দশ.
খিলখিল করে হেসে উঠল সাইমা। ওর দেখাদেখি অন্যরাও।
কলেজে ওদের কাস রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিল বান্ধবীরা। রানু কী একটা কথা বলে উঠতেই হেসে ওঠে সাইমা। ওর হাসার ঢং দেখে অন্যরাও হেসে ওঠে।
শরীর দুলিয়ে হাসতে থাকে পাঁচ বান্ধবী।
‘দারুণ বলেছিস রে।’ হাসতে হাসতেই বলল সাইমা।
‘তোকে এমনি এমনিই হাসি বেগম নাম দেয়া হয়নি। নামটার সার্থকতা দেখালি আজ আবার।’ বলে উঠল আফিফা, রানুর উদ্দেশ্যে।
‘আমি তো জাস্ট একটা জোক বলেছি, হাসানোর জন্যই বলেছি। শোন্, কেউ যখন কাউকে মারে তখন কিন্তু ব্যথা দেয়ার জন্যই মারে। কাজেই আমি জোকস বলব আর তোরা হাসবি না, তা তো হতে পারে না।’ আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলল রানু।
‘তা ঠিক।’ মুখ খুলল সানজিদা।
হাসি থামিয়ে দিয়েছে সবাই। কেউ কেউ পেট চেপে ধরে ধকল সামলাচ্ছে।
‘তা হাসি বেগম,’ বলল দিলু। ‘এরকম আর কতগুলো দম ফাটানো হাসির কৌতুক জানেন আপনি?’
‘নারে,’ বলল রানু। ‘আজ আর কৌতুক বলতে ইচ্ছে করছে না।’
‘সে কি,’ আঁতকে উঠল সাইমা। ‘রানুর কৌতুক বলতে ইচ্ছে করছে না, এটাও বিশ্বাস করতে হবে?’
অন্য সবাই ওর কথায় সায় দিল। প্রায় একইসাথে বলল, ‘তা হবে না, আরও অন্তত একটা মজার কৌতুক আমাদের শোনাতেই হবে।’
অগত্যা কী আর করা, রানু আরেকটা কৌতুক উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিল।
সবার ভেতরেই একটা টানটান উত্তেজনা ভাব। একটু পরেই আবার হাসতে হবে, তাই স্নায়ুগুলোকে জিরিয়ে নেয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
রানু বলল, ‘শোন্ তাহলে। এক লোক মারাত্মক আহত হয়ে অপারেশন টেবিলে শুয়ে কাতর চোখে ডাক্তারকে বলল, ডাক্তার সাহেব, একটা কথা। ডাক্তার তাকে থামিযে দিয়ে বলল, কী কথা বুঝতে পেরেছি, আর বলতে হবে না। সেলাইয়ের সময় যেন ব্যথা না দিই, এই তো? রোগী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, না না, তা নয় ডাক্তার সাহেব। সেলাই তো করবেনই, সাথে আমার শার্টের হাতার বোতামটা একটু সেলাই করে দিয়েন। ওটা ছুটে গেছে।’
আবারও হো হো হি হি করে হেসে উঠল সবাই। ক্যাম্পাসে যারা হাঁটছিল, তারা ওদের হাসিতে গড়িয়ে পড়া দেখে থমকে দাঁড়াল। কেউ কেউ হাসির কারণও জানতে চাইল। ওরা কিছুই বলল না।
ওদের হাসির মধ্যেই ওদের সাথে যোগ দিল হোসনেয়ারা। বলল, ‘এই, তোরা এহত হাসাহাসি করছিস কেন? লাফিং গ্যাস খেয়েছিস বুঝি?’
‘না রে হুসনি,’ বলল সাইমা। ‘আমরা লাফিং গ্যাস-ট্যাস খাইনি। আমাদের হাসি বেগমের কৌতুক শুনে হাসছি। আয় না, তুই ও শুনলে হাসতে থাকবি। থামতেই পারবিনে। কী বলিস তোরা?’ সমর্থনের আশায় বান্ধবীদের দিকে তাকাল ও।
ওরাও মাথা নেড়ে সায় দিল।
‘বেশ,’ বলল হোসনেয়ারা। ‘শোনাও তাহলে কৌতুক। দেখি হাসি কি না।
হোসনেয়ারা এমনিতেই গম্ভীর প্রকৃতির মেয়ে। তাকে হাসতে খুব কম মেয়েরাই দেখেছে। সব সময় মুখটা ভার করে রাখে। কেমন একটা ভারিক্কি ভাব থাকে চেহারা জুড়ে। সেই মেয়েকে হাসানোর দায়িত্ব এখন সাইমাদের।
রানু তো ভেতরে ভেতরে ঘামতে শুরু করেছে। চ্যালেঞ্জ তো নিয়েই নিয়েছে, এখন হাসাবে কী করে?
ধুর, উত্তেজনায় তো এখন আর ভালো কোনো কৌতুকও মনে পড়ছে না।
‘কই, শোনাও, হাসাও আমাকে।’ তাড়া দিল হোসনেয়ারা।
সবাই তাকিয়ে আছে রানুর মুখের দিকে।
রানুর মুখটা ক্রমে কালো অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। একটা কৌতুকও এই মুহূর্তে মনে আসছে না। অথচ কৌতুক ওর মগজ ভর্তি। সব পরিবেশে সব রকমের কৌতুক বলে ও অভ্যস্ত। সেই মেয়ের আজ কী হলো?
‘হ্যাঁ রানু, ফাইন একটা কৌতুক শোনা।’ বলল আফিফা।
‘যাহ্,’ বলল রানু। ‘একটা কৌতুকও মনে পড়ছে না!’
‘ঠিক আছে,’ মুখ খুলল সাইমা। ‘আমিই বলছি, শোনো তোমরা। দাঁতের ডাক্তার ও রোগীর মধ্যে কথা হচ্ছেÑ ডাক্তার বলছে, ভয় পাবেন না। এই ওষুধটা খেয়ে নিন, দেখবেন দাঁত তুলতে একদম ব্যথা পাবেন না, সাহসও বাড়বে। রোগী ওষুধটা খেয়ে বলল, ওষুধটা ঝাঁঝালো হলেও বেশ লাগছে। তাই শুনে খুশি হয়ে ডাক্তার বলল, এবার নিশ্চয়ই সাহস বেড়েছে? রোগী হাতের পেশি ফুলিয়ে বলল, বেড়েছে মানে! এবার দেখি কে আমার দাঁত তুলতে আসে।’
হা হা করে হেসে উঠল সাইমার বান্ধবীরা।
হোসনেয়ারা বহু কষ্টে মুখ বন্ধ করে রাখল। মনের ভেতরে হাসির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। তবে বেশিক্ষণ আর হাসি চেপে রাখতে পারল না, মুখ ফেটে অদ্ভুত হাসির আওয়াজ বেরিয়ে আসতে লাগল।
সাইমারা তো অবাকই হলো, এমনভাবে কেউ হাসে? এ যে সম্পূর্ণ অন্যরকম হাসি। যারা কখনও হাসে না, তারা হঠাৎ হাসতে শুরু করলে বুঝি এমনই দেখায়?
ওরা থেমে গেছে। কিন্তু থামার নাম নেই হোসনেয়ারার। শরীর ও আশপাশ কাঁপিয়ে হেসেই চলেছে সে।
‘হাসি বেগম তো দেখছি কেবল রানুই না, তোমরা সবাই-ই এক একটা হাসির বুলেট।’ হাসতে হাসতেই বলল হোসনেয়ারা।
এই সময় কাস শুরু ঘণ্টা বাজল। আড্ডা ভেঙে গেল ওদের। চলল কাসরুমের দিকে।

রাস্তার মোড়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে সাইমা। পাক্কা সাত মিনিট হলো রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। একটা রিকশাও দেখা যাচ্ছে না। রিবশারা আজ স্টাইক করল না তো?
বাম হাত উঁচু করে হাতঘড়ি দেখল।
প্রচণ্ড ক্ষিধে পেয়েছে। হাসাহাসিতে অনেক এনার্জি নষ্ট হয়েছে। তাছাড়া কাসগুলোও ছিল বেশ জটিল বিষয়ের। কিন্তু বাসায় যেতে না পারলে তো আর পেটে কিছু দেয়াও যাচ্ছে না!
একজন বৃদ্ধ লোক ওর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। ওকে উসখুস হয়ে রাস্তার এদিকে ওদিকে তাকাতে দেখে বললেন, ‘রিকশার জন্যে অপেক্ষা করছেন বুঝি মা জননী?’
সাইমা উপর-নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল।
বৃদ্ধ বললেন, ‘এদিকে আর রিকশা আসবে না। ও মাথা থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। এখন থেকে এ রোডে রিকশা চলাচল বন্ধ।’
আকাশ ভেঙে পড়ল যেন সাইমার মাথায়। বলে কী, এই রাস্তায় রিকশা চলবে না? তাহলে ও বাড়ি যাবে কী ভাবে?
বৃদ্ধ তখনও দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, ‘এক কাজ করেন, ওই সামনে চলে যান। ওখানে রিকশা পেয়ে যাবেন। শালারা যা শুরু করেছে!’ শেষের কথাটা কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দেয়া। এরপর হনহন করে সাইমার সামনে দিয়ে হেঁটে চলে গেলেন।
সাইমা আরও কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বৃদ্ধের দেখিয়ে দেয়া দিকে হাঁটা ধরল।
এই পাশটা সাইমাদের বাসার উল্টো দিক। এখানে রাস্তার মোড়ে অনেকগুলো খালি রিকশা আছে। ভাড়া যায় অনেক বেশি। উপায় নেই, তাই একটা রিকশায় উঠে বসল ও।
হঠাৎ মনটা কেমন ভারী হয়ে গেল সাইমার। কয়েক দিন ধরে আব্বা আম্মাকে কেমন চিন্তিত চিন্তিত মনে হয়েছে ওর কাছে। ভেতরে ভেতরে সবার যেন কিছু একটা ঘটে চলেছে। কী ঘটে চলেছে? জানতে চায় ও। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারে না। তাতে জানার কৌতূহলটা আরও বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে এক্ষণে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে জানার আগ্রহটা। কিন্তু কিভাবে জানা যায়?
ভাবতে থাকে সাইমা।
বাসার সামনে চলে আসার পরও কিছুই বেবে ঠিক করতে পারল না ও। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটাল। বাসার দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা লোক। বেশ সুপুরুষ সে। লম্বা চওড়া সুন্দর দেখতে লোকটা। মিষ্টি একটা হাসি লেগেই আছে তার চোখেমুখে। দেখলেই সুখ সুখ একটা অনুভূতি দৌড়ে বেড়ায় শরীরের শিরা-উপশিরায়।
লোকটাকে আগে কখনও দেখেনি সাইমা। তাই যার পরনাই অবাক হলো যখন লোকটা ওকে নাম ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছো সাইমা?’
মুখ ফুটে বেরিয়ে আসছিল, ‘কে আপনি?’ অনেক কষ্টে সেটা থামিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ ভালো আছি আমি। কিন্তু আপনি…’
‘আমাকে চিনতে পারলে না? আরে আমি, তোমার চাচ্চু!’ একইভাবে মুখটা হাসি হাসি করে রেখেছে লোকটা।
‘মানে?’ এবার সত্যিই অবাক হয়েছে সাইমা।
‘আরে বাবা, মানে-ফানে আবার কী! আমি তোমার চাচ্চু, তোমার আব্বার আপন ছোট ভাই। তোমার দাদুভাইয়ের ছোট ছেলে।’ একটু এগিয়ে এলো লোকটা সাইমার দিকে।
দু’কদম পিছে সরে গেল সাইমা। পেছন ও আশপাশ দেখল। না, কোনো লোকজন নেই। একেবারে ফাঁকা। কিন্তু এ সময়টাতে তো আশপাশে লোক গিজগিজ করে। আজ কী হয়েছে সবার? গেছে কোথায় মানুষগুলো?
‘আ-আ-আ-আপনি…’ কথা বের হতে চায় না সাইমার মুখ দিয়ে। মুখটা ওর দেখার মতো হয়েছে।
‘মা-মণি,’ বলল লোকটা। ‘অনেক বড় হয়ে গেছ তুমি। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছ।’
‘আ-আ-আপনি এসব জানলেন কিভাবে?’ তোতলায়ে জিজ্ঞেস করল সাইমা।
‘বারে, আমি না তোমার চাচ্চু, আমি জানব না তো কে জানবে শুনি?’ একটু থামল লোকটা। তারপর আবার বলল, ‘ও বুঝেছি, তোমার খুব ক্ষিধে লেগেছে তো, তাই। ইশ্! মুখটা কেমন পাংশুটে হয়ে গেছে। জানো সাইমা মা-মণি, ক্ষিধের জ্বালা না আমিও সইতে পারতাম না একদম। ক্ষিধে লাগলে মাঝে মাঝে আমি কানতাম। মা যখন বকা দিত, তখনও কানতাম। আব্বা আমাকে খুব আদর করত। হাটে গেলেই আমাকে টাকা দিত। আমি আর লালন বাতোসা কিনে খেতাম। কখনও কখনও দূরে কোথাও হারিয়ে যেতাম। আব্বা আর ম্যাভাই খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যেত। আর মা তো বাড়িতে বসে কেদে কেঁদে উঠোন-ঘর-বারান্দা ভিজিয়ে ফেলত। তুমিও তো দুঃখ পেলে খুব কাঁদো। আমি না দূর থেকে তোমার কান্না দেখি। খুব মায়া লাগে তখন আমার। ইচ্ছে করে তোমার কাছে এসে তোমার চোখের পানি মুছে দিই। কিন্তু কী করব বলো? ইচ্ছে করলেই তো আর আমি আসতে পারিনে!’ দম নেয়ার জন্য একটু থামল লোকটা।
এই সুযোগে কিছু কথা মনে করে ফেলল সাইমা। হ্যাঁ, লোকটার কথাবার্তা শুনে তাকে চাচ্চুর মতোই মনে হচ্ছে। আব্বু তো চাচ্চু সম্পর্কে এসব কথাই বলেন। কিন্তু উনি হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হলেন? উনি না…
সাইমার ভাবনায় ছেদ পড়ল। কথা বলে উঠেছে লোকটা আবার, ‘আব্বাকে দেখতে এসেছিলাম। আব্বা তো আমার কথা চিন্তা করতে করতে শরীরটাই নষ্ট করে ফেলেছেন। মাও এখনও গভীর রাতে ডুকরে ডুকরে কাঁদেন। চিন্তা করেন। আরে বাবা এতো কান্না ও চিন্তার কী আছে বলো? আমার জন্যে কেন এতো কাঁদতে হবে? আমি কি হারিয়ে গেছি? আছি তো সবসময় তাদের আশেপাশেই। সবসময় আমি তাদের দেখি। জানো সাইমা মা-মণি, আব্বা আর মায়ের কান্না আমার একদম ভালো লাগে না। যদি তাদের কান্নাকে দূর করে দিতে পারতাম…’
‘কিন্তু চাচ্চু,’ অনেকটা সাহস ফিরে পেয়েছে সাইমা। ‘তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?’
‘দেখ পাগলি বলে কী। আমি তো বললামই আমি সবসময় তোমাদের আশেপাশেই থাকি।’
‘কিন্তু আগে কখনও তোমাকে দেখিনি কেন আমি?’
এ কথার কোনো উত্তর দিল না সাইমার চাচ্চু।
‘বলো চাচ্চু,’ বলল সাইমা। ‘এতদিন তোমাকে আমি কেন দেখিনি?’
‘ছোট আম্মা,’ গেটের ভেতর থেকে টুকটুকি বলে ওঠে। ‘আপনে কার লগে কথা কন?’
সম্বিৎ ফিরে পায় যেন সাইমা। টুকটুকির কথায় এদিক ওদিক তাকায়। কোথায় গেল চাচ্চু? এই তো ওর সামনেই ছিল। কোথায় হাওয়া হয়ে গেল?
খুব কান্না পাচ্ছে সাইমার। হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
আরও কয়েকবার রাস্তার এদিক ওদিক দেখল ও। কিছুদূর হেঁটে গিয়ে দেখে এলো। না, চাচ্চুটা কোথাও নেই।
হাত দু’টো শরীরের দু’পাশে ছড়িয়ে পড়ল ওর। গায়ের বল যেন সব কোথায় মিলিয়ে গেছে। মাথার ভেতরটায় একটা চক্কর দিয়ে উঠল। ধপাস করে পড়ে গেল ও। জ্ঞান হারানোর আগে শুনল টুকটুকি চিৎকার করে আম্মুকে ডাকছে, ‘আম্মু, ছোট আপা…’
চলবে. . . . . . . . .

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s