আলো-আঁধারের খেলা (ধারাবাহিক উপন্যাস)

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

লিখেছেন জুবায়ের হুসাইন

এগারো
একটা মাইক্রো ভাড়া করা হয়েছে। বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওটা। ড্রাইভার নিজের সিটে একপ্রকার শুয়েই আছে। লং জার্নির জন্য প্রস্তুত করে নিচ্ছে যেন শরীর ও মনটাকে।
মোকাব্বর হোসেন এখন প্রায় পুরোপুরিই সুস্থ। কাশিটা নেই বললেই চলে। তাকে বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছে সবাই। মোতালেব হোসেন ব্যাংক থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়েছেন। ছুটি নিয়েছেন সালমা বানুও। আর সাইমার কলেজ আগামী দশদিন বন্ধ থাকবে। কাজেই গ্রামে কিছুদিন থেকেও আসা যাবে।
সাইমার খুব মজা লাগছে। কতদিন পর গ্রামে যাবে! দাদীর সাথে দেখা হবে। রাতে বারান্দায় বসে দাদুর মুখে গল্প শুনবে। কত মজার মজার গল্প জানেন দাদী! সেই ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিল দাদীর কাছে। এখন তার সবটা মনে করতে পারে না। সেই গল্পটাই আগে শুনবে ও।
দাদীও নিশ্চয়ই খুশি হবেন ওদেরকে কাছে পেয়ে। ছোট ছেলেটাকে তো সেই কবে হারিয়েছেন। ফুফুটাও আছে শ্বশুর বাড়ি। আসতে সময় পায় না। ফুফার ছুটি হয় না। ম্যালা বড় ব্যবসা ফুফার। একাই সব সামরাতে হয়। তাই বেড়াতে আসার সময় কোথায়? তবে এবার তারাও আসছেন। কাজেই আনন্দের মাত্রাটা বাড়বে বৈ কমবে না।
আনন্দে টগবগ করে ফুটছে সাইমা। গ্রামে গিয়ে কী কী করবে মনে মনে তার একটা লিস্টিও তৈরি করে ফেলল। শুনেছে শেফালি নামের মেয়েটা খুব ভালো। বেশ কাজের। আবার গল্পবাজও। তার কাছ থেকে গল্প শোনাও লিস্টিতে রাখতে ভুলল না।
আনন্দে আছে মোতালেব ও সালমা বানুও। শহরের একঘেয়েমী জীবনে বেশ হাঁফিয়ে উঠেছিলেন তারা। এখন একটু চেঞ্জও হবে। অন্তত গ্রামে থাকার কয়দিন তো শহরের কোলাহল তেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

গ্রামে আগেই সংবাদ পাঠানো হয়েছে। পরিচন বিবি নিজ হাতে কয়েক পদের রান্না-বান্না করে ফেলেছেন। সবগুলোই ছেলেমেয়েদের পছন্দের খাবার। তবে একটা পদের রান্না তিনি ইচ্ছে করেই করলেন না- নারকেলের দুধ দিয়ে কলার মোচার ঘন্টো। এটা ছিল মোতাহারের প্রিয় খাবার। উঁচু উঁচু একপ্লেট ভাত দিব্বি ও এই ঘন্টো দিয়েই শেষ করে ফেলত।
শেফালিও বেশ খুশি। কতদিন পর ভাইজান ও বুবু বাড়িতে আসছে। সঙ্গে থাকছে তাদের জামাই-বউ আর ছেলেমেয়েরা। তাদের করখাকলিতে বাড়িতে ভরে উঠবে। কতদিন এই বাড়িতে কোনো আনন্দ-হই হল্লা হয় না!
পরিচন বিবিকে রান্না-বান্নায় বেশ সহযোগিতা করল শেফালি। তারপর সাবান ডলে গোসল করে আলমারিতে উঠিয়ে রাখা লাল রঙের একটা ছাপা শাড়ি পড়ল। কেমন ন্যাথলিনের গন্ধ বের হচ্ছে শাড়ি থেকে।
পরিচন বিবিও গোসল সেরে নিয়েছেন। তার মনটাও আজ আনন্দে নেচে উঠছে। তবে মনের কোনো এক গোপন জায়গায় চিনমিনে একটা ব্যথা, একটা অজানা কষ্ট গুমড়ে উঠছে থেকে থেকে। বুকের কোন্ পাশটায় যেন শূন্য শূন্য একটা অনুভূতি টের পাচ্ছেন তিনি।
বিকেল হয়ে গেছে। পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ব্যথা হয়ে গেছে। পরিচন বা শেফালি কেউই এখন খায়নি। ওরা আসলে তবেই একসাথে খাবে। মোতালেবরা পথের মাঝখান থেকে নাজামাদের মাইক্রোতে উঠিয়ে নেবে। তেমনই কথা হয়েছে।
বেলা পড়ে আসছে। অপেক্ষার মুহূর্তগুলো আর কাটতেই চাচ্ছে না। যেন সময়টা ঝুলে আছে কোনো অদৃশ্য সুতায়, নাটাইতে জড়ানো সুতা নিয়ে কেউ বসে আছে। ধীরে ধীরে নাটাই থেকে সুতা ছাড়ছে। আর তীর তীর করে কাটছে সময়ের মুহূর্তগুলো।
বারান্দাতেই বসে ছিলেন পরিচন বিবি। মনের মধ্যে ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি আকুলি-বিকুলি করে ভেসে ভেসে উঠছে। আর ক্রমেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছেন তিনি। অবশ্য ক’দিন থেকেই ব্যাপারটা ঘটছে। স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ফলে শরীরটাও ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। আজকে ছেলেমেয়েরা বাড়িতে আসছে, তাই জোর করেই শরীরে শক্তি ধরে রেখেছেন। তবে সবাই কি আসছে? মোতাহার, মোতাহার কি আসছে? আসবে কি কোনোদিন? ‘মা খাতি দ্যাও’ কিংবা ‘মা যাচ্ছি’ বলে তার সামনে দিয়ে যাবে কি সে?
বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল পরিচন বিবির।

শেফালি পথের ধারে একটা কুল গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, এই পথেই আসবে সবাই।
হঠাৎ বারান্দার দিকে চোখ পড়তেই দেখল পরিচন বিবি নেতিয়ে পড়ছেন। ‘খালাম্মা!’ বলে ছুটল সেদিকে।

এইমাত্র মাইক্রোটা এসে থেমেছে। গাড়িটা থামতেই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এলো যাত্রীরা। একটু পরেই পরিচন বিবিকে ধরাধরি করে তাতে উঠিয়ে রওনা দিল।

(সমাপ্ত)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s