হযরত ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)- ১০ম পর্ব

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

বেনিয়ামীনকে আটকে রাখা হ’ল:
সহোদর ছোট ভাই বেনিয়ামীনকে রেখে দেবার জন্য ইউসুফ (আ.) আল্লাহর হুকুমে একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করলেন। যখন সকল ভাইকে নিয়ম মাফিক খাদ্য-শস্য প্রদান করা হ’ল এবং পৃথক পৃথক বস্তায় পৃথক নামে পৃথক উটের পিঠে চাপানো হ’ল, তখন গোপনে বেনিয়ামীনের বস্তার মধ্যে বাদশাহর নিজস্ব ব্যবহৃত স্বর্ণ বা রৌপ্য নির্মিত ওযন পাত্র, যা ছিল অতীব মূল্যবান, সেটিকে ভরে দেওয়া হ’ল। অতঃপর কাফেলা বের হয়ে কিছু দূর গেলে পিছন থেকে জনৈক রাজকর্মচারী ছুটে গিয়ে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করল, হে কাফেলার লোকেরা! তোমরা চোর। দাঁড়াও তোমাদের তল্লাশি করা হবে। ঘটনাটির বর্ণনা কুরআনের ভাষায় নিম্নরূপ:

‘অতঃপর যখন ইউসুফ তাদের জন্য খাদ্যশস্য প্রস্তুত করে দিচ্ছিল, তখন একটি পাত্র তার (সহোদর) ভাইয়ের বরাদ্দ খাদ্যশস্যের মধ্যে রেখে দিল। অতঃপর একজন ঘোষক ডেকে বলল, হে কাফেলার লোকজন! তোমরা অবশ্যই চোর’ {৭০}। ‘একথা শুনে তারা ওদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, তোমাদের কি হারিয়েছে’? {৭১}। ‘তারা বলল, আমরা বাদশাহর ওযনপাত্র হারিয়েছি। যে কেউ এটা এনে দেবে, সে এক উটের বোঝা পরিমাণ মাল পাবে এবং আমি এটার যামিন রইলাম’ {৭২}। ‘তারা বলল, আল্লাহর কসম! তোমরা তো জানো যে, আমরা এদেশে কোনরূপ অনর্থ ঘটাতে আসিনি এবং আমরা কখনোই চোর নই’ {৭৩}। বাদশাহর লোকেরা বলল, ‘যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও তবে যে চুরি করেছে, তার শাস্তি কি হবে’? {৭৪}। ‘তারা বলল, (আমাদের নবী ইয়াকূবের শরী‘আত অনুযায়ী) এর শাস্তি এই যে, যার খাদ্যশস্যের বস্তা থেকে এটা পাওয়া যাবে, তার শাস্তি স্বরূপ সে (মালিকের) গোলাম হবে। আমরা যালেমদেরকে এভাবেই শাস্তি দিয়ে থাকি’ {ইউসুফ ১২/৭০-৭৫}।

এভাবে ইউসুফ তার ভাইদের মুখ দিয়েই তাদের শরী‘আতের বিধান জেনে নিলেন এবং সভাসদগণ সবাই তা জানলো। যদিও ইউসুফ তার পিতার শরী‘আতের বিধান জানতেন এবং নিজেও নবী ছিলেন। আল্লাহ বলেন,

‘অতঃপর (ইউসুফের নির্দেশ মোতাবেক) তার ভাইয়ের বস্তার পূর্বে (ঘোষক) অন্য ভাইদের বস্তা তল্লাশি শুরু করল। অবশেষে সেই পাত্রটি তার (সহোদর) ভাইয়ের বস্তা থেকে বের করল। এমনিভাবে আমরা ইউসুফকে কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলাম। সে বাদশাহর (প্রচলিত) আইনে আপন ভাইকে কখনো নিজ অধিকারে নিতে পারত না আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত। আমরা যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি এবং (সত্য কথা এই যে,) প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরে জ্ঞানী আছেন {ইউসুফ ১২/৭৬}।

শিক্ষণীয় বিষয় :
(১) আল্লাহর উপরোক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে একথা বুঝানো হয়েছে যে, ভাইদের মর্যাদার চেয়ে ইউসুফের মর্যাদা আল্লাহ অধিক উন্নীত করেছেন (২) এতদ্ব্যতীত এ বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইয়াকূব (আ.) নিজ জ্ঞান মোতাবেক বেনিয়ামীনকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য ছেলেদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়ার মাধ্যমে যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তার চাইতে ইউসুফের মাধ্যমে আল্লাহ যে জ্ঞানের প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা ছিল অনেক ঊর্ধ্বের এবং অনেক সুদূর প্রসারী। কেননা এর ফলেই পরবর্তীতে ইয়াকূব (আ.) সব ছেলেদের নিয়ে সপরিবারে মিসরে উচ্চ সম্মান নিয়ে আগমনের সুযোগ পান।

প্রশ্ন হ’তে পারে যে, ইউসুফ (আ.) বেনিয়ামীনকে চোর বানিয়ে নিজের কাছে রেখে দেবার মত নিষ্ঠুর পন্থা বেছে নিলেন কেন? তাছাড়া এর দ্বারা তার বৃদ্ধ পিতা ইয়াকূব (আ.) যে আরও বেশী মনোকষ্ট পাবেন, তাতো তিনি জানতেন। তিনি এটাও জানতেন যে, তাকে হারিয়ে শোকে-দুঃখে তার পিতা কাতর হয়ে আছেন। এ প্রশ্নের জবাব আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন যে, ‘আমরাই ইউসুফকে এ কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলাম। নইলে বাদশাহর (প্রচলিত) আইনে আপন ভাইকে সে কখনো নিজ অধিকারে নিতে পারত না’ {ইউসুফ ১২/৭৬}। অতএব আল্লাহর হুকুমে ইউসুফ এ কাজ করেছিলেন। এখানে তার নিজের কিছুই করার ছিল না।

(৩) একটি সাধারণ নীতি এখানে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরে জ্ঞানী আছেন। অতএব মানুষ যেন তার জ্ঞানের বড়াই না করে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এখানে আল্লাহকেই সর্বোচ্চ জ্ঞানের অধিকারী বলে বুঝানো হয়েছে (কুরতুবী)।

ইনশাআল্লাহ চলবে …

রচনাঃ
প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s