নয়নাভিরাম হ্রদ আর প্রকৃতির রূপসীকন্যা রাঙ্গামাটি

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

– মো: তোফাজ্জল হোসাইন

Tour_1‘দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই দু’চোখ মেলিয়া
ঘরের বাইরে দু’পা ফেলিয়া
একটি ঘাসের শীষের ওপর একটি শিশির বিন্দু।’
বিশ^কবির এমন অনুভূতির চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যায় পাহাড়ের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সবুজ রূপ-বৈচিত্র্যের শ্যামলভূমি রাঙ্গামাটিতে। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আনন্দ দিতে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে যেন নৈসর্গের রাণী রাঙ্গামাটি।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের সীমান্তবর্তী অন্যতম বৃহৎ এই জেলাটির হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়গুলো যেন ঢেউ খেলানো শাড়ি। আকাশের মেঘ ছুঁয়ে যায় পাহাড়ের বুক। শরৎ, হেমন্ত এবং শীতে শুভ্র মেঘের খেলাও চলে সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে।
এখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে থাকে শান্ত পানির হ্রদ। সীমানার ওপাড়ে নীল আকাশ মিতালি করে হ্রদের সাথে, চুমু খায় পাহাড়ের বুকে। এখানে চলে পাহাড়, নদী আর হ্রদের এক অপূর্ব মিলনমেলা! চারিপাশ যেন পটুয়ার পটে আঁকা কোনো জলরঙের ছবি। মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে ভরপুর রাঙ্গামাটি। এখানকার প্রকৃতির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অদেখা এক ভুবন, যেখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে নয়নাভিরাম দৃশ্যপট।
রাঙ্গামাটিতে ভ্রমণ করার জন্য রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে কাপ্তাই লেক, পর্যটন মোটেল, ডিসি বাংলো, ঝুলন্ত ব্রিজ, পেদা টিং টিং, শুভলং ঝরনা, রাজবাড়ি, রাজবন বিহার, উপজাতীয় জাদুঘর, কাপ্তাই হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রজেক্ট, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

হ্যাঁ বন্ধুরা, এই সফর যাত্রী কিন্তু আর কেউ নয়; তোমাদের প্রিয় পত্রিকা কিশোরকণ্ঠ পরিবার। ঢাকা থেকে রাতের শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে চড়ে রাঙ্গামাটি অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। মোট সদস্য ২৩ জন হওয়ার কথা। কিন্তু নানা ব্যস্ততার কারণে সব সদস্য এই সফরে শরিক হতে পারেননি। তাই ১৭ জনেই যাত্র শুরু করলাম।
বাসের ভেতরে চলন্ত অবস্থায় জানালার পাশ দিয়ে শীতের ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করছে। ঠান্ডা থেকে রক্ষা পেতে সবাই শীতের পোশাক শরীরে মুড়িয়ে নিলো। ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটির দূরত্ব ৩৩৮ কিলোমিটার। মাঝে-মধ্যে দুই চোখে ঘুম চলে আসে। রাত ১.২০। বাস কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কিছুক্ষণ বিরতি দিলে ভুনা খিচুড়ি খাওয়ার পর আবার রাঙ্গামাটির উদ্দেশে। রাত ৪.৩০ টার দিকে চট্টগ্রাম পার হয়ে উঠলাম রাঙ্গামাটির পথে। পাহাড়ের কাছে বাস থেকে রাস্তার ডানে-বামে জেলার প্রবেশমুখের গেট দেখতে পেলাম। আগ্রহ বাড়ে গেলো। শুরু হলো আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা। ভোরের আলোয় ফোটার আগেই জোছনার আলোয় সারা পাহাড়ের অরণ্য আলোকিত হয়ে ওঠে। ইচ্ছে হলো গাড়ি থেকে নেমে বন-পাহাড়কে মন ভরে দেখার। রাতের মনোরম দৃশ্য সত্যিই অন্যরকম।
পাহাড়ের প্রকৃতির গর্ভে হ্রদের পানি দেখে লোভ আর সামলাতে পারিনি। আমাদের বাস শ্যামলী কাউন্টারে গিয়ে থামল। সেখানে অনেক হোটেল রয়েছে। আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন রাঙ্গামাটি জেলার কিশোরকণ্ঠ পাঠক ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা ইউসুফ বিন সিরাজ ভাই।
আমরা সবাই সিএনজি করে ‘প্রিন্স’ হোটেলের উদ্দেশ রওনা হলাম। সেখানে পৌঁছে সবাই ফ্রেশ হয়ে বনরূপার ‘গ্রিনভ্যালি’ হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে নিই। নাস্তা শেষে একটা ইঞ্জিনচালিত বোটে করে নির্ধারিত স্পট রাঙ্গামাটি হ্রদের দিকে এগোতে লাগলাম। কিন্তু তখন পর্যন্ত আমাদের সাথে শরিক হননি কিশোরকণ্ঠের সহকারী নির্বাহী পরিচালক তারেক হোসাঈন ভাই। তিনি চট্টগ্রাম থেকে আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার কথা।
রাঙ্গামাটির হ্রদটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হ্রদ। এর আয়তন ৭২৫ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৬০ সালে কাপ্তাইয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে এ হ্রদটি নির্মাণ করা হয়।
রাজবাড়ি : হ্রদ ছাড়াও রাঙ্গামাটির অন্যতম নিদর্শন হচ্ছেÑ রাজবাড়ি। রাঙ্গামাটি শহরেই অবস্থিত রাজবাড়ি। চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় ও তার মা রানী আরতি রায়ের বসবাস এই রাজবাড়িতেই। চারদিকে হ্রদবেষ্টিত এই রাজবাড়ি পুরনো হলেও দেখতে ও বেড়াতে ভীষণ ভালো লাগে। রাজদরবার, কাচারি, সজ্জিত কামানসহ দেখার মতো অনেক কিছু আছে। রাজবাড়ির নিরিবিলি পরিবেশ, সবুজ বাঁশের ঝাড়, আর পাখির কলকাকলি আপনাকে এক মুহূর্তেই আনমনা করে দেবে। সারি সারি ডাব গাছ, যে ডাবের পানি খেয়ে সফরকারীদের সারা দিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। রাজবাড়ির পাশেই উপজাতীয় নারীরা তাদের হাতেবোনা বস্ত্রসম্ভার নিয়ে বসে থাকে বেচাবিক্রির জন্য। আমরা সকলেই যে যার মত কেনাকাটা সেরে ফেললাম সেখান থেকে। হাতেবোনা বস্ত্রগুলো দেখতে খুব সুন্দর এবং দামেও অনেকটা সস্তা। এসব পণ্য আপনার প্রয়োজনের পাশাপাশি মেটাবে রুচির তৃষ্ণা।
রাজবন বিহার : রাজবাড়ির পাশেই আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত এই বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি অবস্থিত। এখানে অবস্থান করেন বৌদ্ধ আর্য পুরুষ শ্রাবক বুদ্ধু সর্বজন পূজ্য শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থাবির (বনভান্তে)। পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় তীর্থস্থান রাঙ্গামাটির ঐতিহ্যবাহী রাজবন বিহার। চাকমারা অবশ্য বিহার বা মন্দিরকে কিয়াং বলে থাকে। এটি মূলত আমাদের দেশের একটি প্রধানতম বৌদ্ধবিহার হিসেবে পরিচিত। রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের রাজবাড়ির পাশেই এর অবস্থান। ১৯৭৬ সালে রাজবন বিহার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থাবির (বনভান্তে) অধ্যক্ষরূপে বিরাজিত। ৩৩.৫ একর বিস্তৃত বিহার এলাকায় ৪টি মন্দির, ভিক্ষুদের ভাবনাকেন্দ্র, বেইনঘর, তাবতিংশ স্বর্গ, বিশ্রামাগার ও হাসপাতাল রয়েছে। প্রতি বছর বিহারে কঠিন চীবরদান অনুষ্ঠানে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে, যা দেশের আর কোন বৌদ্ধধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিরল।
বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির, বিশ্রামাগার, হাসপাতাল, তাবতিংস স্বর্গসহ অনেক কিছু রয়েছে দেখার মতো। সেখানে বৌদ্ধ ধর্মগুরুর দেহাবশেষ মমি করে একটি কাচের ফ্রেমে রাখা হয়েছে এবং চেয়ারে বসা তার একটি মূর্তিও রয়েছে।
সেখানে আমরা অনেক ছবি তুললাম। তবে সাবধান! ধর্মগুরুর ছবি তোলা যাবে কিন্তু তাদের ধর্মগুরুর সাথে কেউ কোনো ছবি তুলতে পারবে না।
শুভলং পাহাড় বিজয় : আমরা ইঞ্জিনচালিত বোট ভাড়া করে পানিপথে রওনা হলাম শুভলং জলপ্রপাত ও পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। স্বচ্ছ টলটলে পানির দৃশ্য আর রোদের আলোয় পানি ঝিকিমিকি করছে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা মনোরম পানির মধ্য দিয়ে শুভলং পাহাড়ে পৌঁছলাম। তবে শুভলং জলপ্রপাতের দৃশ্যগুলো অতি মনোরম। শুভলং পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ২২০০ফিট। আমরা সেই উচ্চতাকে বিজয়ের লক্ষ্যে পাহাড়ে ওঠা শুরু করি। কিন্তু পথিমধ্যে অনেকেই ছিটকে পড়ে। কারণ এত উচ্চতায় ওঠার মত সক্ষমতা সবার ছিল না। অনেক কষ্টসাধ্য পথ পেরিয়ে অবশেষে আমরা ১২ জন সেই দুর্গম পাহাড় জয় করি। এত উঁচু পাহাড়ে ওঠা যে কত কষ্টকর না উঠলে বোঝা যাবে না।
শুভলং জলপ্রপাত থেকে ফিরে এলাম রাঙ্গামাটি শহরে। রাঙ্গামাটি শহর দেখতে খুবই সুন্দর। শহরের চারপাশে হ্রদের পানি আর পানি। তবে রাঙ্গামাটি শহরে কোনো রিকশা নেই, আছে রিকশার বিকল্প সিএনজি। অল্প কিছুক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়ালে সিএনজি পাবেন।
শুভলং ঝরনা : রাঙ্গামাটির অন্যতম সুন্দর দর্শনীয় স্থান এটি। চমৎকার একটি জলপ্রপাত এই স্থানকে দিয়েছে ভিন্ন একটি আকর্ষণীয় চরিত্র। রাঙ্গামাটি শহর থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মনোরম এই ঝরনাটি। এ ঝরনার রূপ আপনাকে মোটেও আশাহত করবে না। সময়টি যদি হয় বর্ষাকাল, তবে আপনি সত্যিই ভাগ্যবান বলতে হবে। কেননা এই সময় ঝরনা হয়ে ওঠে নবযৌবনা, স্বয়ম্ভরা। অপলক দৃষ্টিতে সে ঝরনার রূপ আপনি দেখবেন সম্মোহিত হয়ে। এই স্থানটি বেশ সাজানো-গোছানো। ফুলের বাগান, উঁচু বসার স্থান এবং হাঁটার জন্য ব্রিজ ও রাস্তা আপনাকে বিমোহিত করবে। ঝরনায় গোসল কিংবা দর্শন শেষে আপনি সামনে এগিয়ে গেলে পাবেন শুভলং বাজার। হ্রদের তীরে অবস্থিত স্থানীয় এই বাজারে রয়েছে একটি সেনাক্যাম্প। বাজারটি একেবারে ছোট নয়। এখানকার খাবার বেশ সুস্বাদু। দুপুরের খাবারটি চাইলে এখানে সেরে নিতে পারেন। হ্রদ থেকে ধরা মাছের ঝোল আর আলুভর্তা রসনা বিলাসের জন্য মন্দ নয়।
ঝুলন্ত ব্রিজ ও পর্যটন মোটেল : রাঙ্গামাটি শহরের শেষ প্রান্তে কাপ্তাই হ্রদের তীর ঘেঁষে অবস্থিত সরকারি পর্যটন মোটেল। পর্যটকদের জন্য খুবই নজরকাড়া ও আকর্ষণীয় স্থান এটি। পর্যটন মোটেলেই অবস্থিত ঝুলন্ত ব্রিজ, যা পর্যটন এলাকাকে আরো বেশি সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দিত করেছে। সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে এটি। পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ এবং এর নির্মাণশৈলীর কারণে ঝুলন্ত ব্রিজ রাঙ্গামাটির আকর্ষণীয় নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা বিকেলে সেখানে পৌঁছলাম। এরপর ইঞ্জিনচালিত বোট থেকে নেমে আমরা সকলেই সেই বহু প্রতীক্ষিত ঝুলন্ত ব্রিজে উঠলাম। ঝুলন্ত ব্রিজের যে সৌন্দর্য তা বাস্তবে অবলোকন না করলে বোঝা যাবে না। আমরা সকলেই সেই সৌন্দর্য উপভোগ করে সন্ধ্যায় আমাদের নির্ধারিত ‘হোটেল প্রিন্স’-এ পৌঁছালাম।
পেদা টিং টিং : কাপ্তাই হ্রদের চারদিকে কেবল পাহাড় আর হ্রদ, যেন প্রকৃতির মাঝে আপনি এক আগন্তুক মাত্র। বুনো প্রকৃতি ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না এখানে। কিন্তু আপনি অবাক হবেন যখন চলতি পথে কোনো একটি টিলার ওপর দেখবেন ‘পেদা টিং টিং’। এমন এক পরিবেশ যেখানে আপনি এক গ্লাস খাবার পানি পাবেন না, সেখানে পেদা টিং টিং আপনার জন্য চা, কফি আর চিকেন ফ্রাই নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সত্যিই অবাক করার মতো ব্যাপার।
পেদা টিং টিং একটা চাকমা শব্দগুচ্ছ, যার অর্থ হচ্ছেÑ পেট টান টান। অর্থাৎ ভূরিভোজের পর পেটের যে টান টান অবস্থা থাকে, সেটাকেই বলা হয় পেদা টিং টিং। রাঙ্গামাটি শহর থেকে মাত্র ৪-৫ কিলোমিটার দূরে কাপ্তাই হ্রদের ভাসমান একটি পাহাড়ে অবস্থিত এই পর্যটন সংস্থা। এখানে রেস্তোরাঁ, কটেজ, নৌবিহার, সেগুন বাগান ও অসংখ্য বানর রয়েছে। ইচ্ছে করলে মনোজ্ঞ কোনো অনুষ্ঠানও আয়োজন করা যায়। শুধু তাই নয়, আপনি চাইলে রাত্রিযাপনও করতে পারবেন এখানে। থাকার জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি কক্ষসদৃশ ঘর। চাঁদনিরাতে এমন একটি পাহাড়ের ওপর রাতযাপন সত্যিই দুর্লভ।
রাঙ্গামাটি সফর শেষে রাতেই আমরা কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হই। এরপর দীর্ঘপথ অতিক্রম করে রাত ৩টায় আমরা নির্ধারিত হোটেল ‘হোটেল সি-বিচ’-এ উঠলাম।
সকালে ঘুম থেকে ওঠে আমরা অনেকেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে যাই। সারাদিন সমুদ্রসৈকত ঘুরে বিকেলে রওনা হই সোনাদিয়া দ্বীপের দিকে।
Tour_3সোনাদিয়া দ্বীপ : পর্যটনের অপার সম্ভাবনার দ্বীপ সাগরকন্যা সোনাদিয়া। এই দ্বীপ দেখার বা ঘোরার জন্য ছোট-বড় নৌকা ও স্পিডবোট রয়েছে। আমরা কিশোরকণ্ঠ পরিবার দু’টি স্পিডবোটযোগে সোনাদিয়া দ্বীপে পৌঁছালাম। দ্বীপে কিছুক্ষণ ঘোরঘুরি করি। একটি কথা না বললেই নয়, পর্যটক আকর্ষণের দিক দিয়ে বাংলাদেশে প্রথম হচ্ছে কক্সবাজার। শুধু বাংলাদেশি নয়, বছরজুড়েই বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনায়ও পৃথিবীর এই বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত মুখরিত থাকে।
কক্সবাজার জেলারই একটি দৃষ্টিনন্দন স্থান হলো মহেশখালী দ্বীপ। পর্যটন শহর কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলা পাহাড়সমৃদ্ধ একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। মূল মহেশখালী দ্বীপের সঙ্গে আরো তিনটি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে মহেশখালী উপজেলা গঠিত। মহেশখালীর তিনটি দ্বীপের মধ্যে একটি হচ্ছে পর্যটন সম্ভাবনাময় সাগরকন্যা সোনাদিয়া দ্বীপ। এটি মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের একটি ওয়ার্ড। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে উত্তর-পশ্চিমে ১৫ কিলোমিটার দূরে এই বালুর দ্বীপটি অবস্থিত, যার আয়তন মাত্র ৭ বর্গকিলোমিটার। মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারে অবস্থিত এই দ্বীপটি মহেশখালী থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে ছোট-বড় আঁকাবাঁকা খালবিশিষ্ট ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল দ্বারা। দ্বীপের দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্বে বঙ্গোপসাগর। জানা গেছে, এই দ্বীপে মানুষের স্থায়ী বসবাস শুরু হয় ১০০-১২৫ বছর আগে। দ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮ শ’। প্রতি বছর শীতের সময় এই দ্বীপে ৭০ প্রজাতির জলজ ও উপকূলীয় অতিথি পাখির আগমন ঘটে। এটি অতিথি পাখির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র। গভীর সুমদ্রবন্দরের জন্য নির্বাচিত কয়েকটি স্পটের মধ্যে সর্বাধিক উপযোগী এই দ্বীপে প্রতি বছর শীত মৌসুমে মাছ আহরণ করে হাজার হাজার টন শুঁটকি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। মাছ ধরা এবং মাছ শুকানো এই দ্বীপে বসবাসরত মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম। শুটকির জায়গায় এলাম আর শুটকি কিনবো না তা কী হয়? এই দ্বীপের পানিতে স্পীডবোট নিয়ে ঘোরার মজাই আলাদা। এখানে এলে স্পীডবোটে ঘুরতে ভুলবেন না যেনো!
সোনাদিয়া দ্বীপকে ঘিরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রয়েছে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনাও। প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপিত হলে ঘুরে যাবে বসবাসকারীদের ভাগ্যের চাকা। সোনাদিয়া দ্বীপের সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দেখার জন্য ভ্রমণপিপাসু মানুষ দুর্গম এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে হাজির হয়। প্রকৃতির এই অকৃপণ সৌন্দর্য যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমিকের মনে প্রশান্তি এনে দেবে। অপরূপ সৌন্দর্যে বিমোহিত ভাবুকের ভাবনার বাতায়ন খুলে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
দ্বীপের বেলাভূমিতে হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার ঝাঁক আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে, কিন্তু কাছে যেতে না যেতেই অদৃশ্য হয়ে যাবে। তবে এই দ্বীপের সমুদ্রসৈকতের পানিতে নামা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ এখানকার সমুদ্রসৈকতে পানির গভীরতা সব সময় বেশি থাকে। সৈকতের বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে ছোট ছোট পাহাড়সদৃশ বালিয়াড়ি আপনার ভ্রমণপিপাসু মনকে নাড়া দিতে পারে। এগুলো তিল তিল করে যুগ যুগ পর এক-একটি বালিয়াড়িতে পরিণত হয়। এই বালির পাহাড় তৈরির রহস্যে যে ‘জাদুকরী উদ্ভিদ’ রয়েছে তা-ও স্বচক্ষে দেখা যাবে সোনাদিয়া সৈকতে।
দ্বীপের বেলাভূমিতে কাঁকড়ার কারুকাজ দেখে মনে হতে পারে এগুলো প্রাচীন কোনো শিল্পীর হাতের ছোঁয়া। তা ছাড়া সোনাদিয়া দ্বীপের এই বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে লুকিয়ে আছে ইউরেনিয়ামসহ বেশ কয়েকটি মূল্যবান খনিজপদার্থ। এসব সৌন্দর্য উপভোগ করে আমরা হোটেলে ফিরে আসি। তখন সন্ধ্যা ৬টা। সবাই একটু ফ্রেশ হয়ে আমরা রওনা হলাম বার্মিজ মার্কেটের উদ্দেশে।
বার্মিজ মার্কেট : কক্সবাজার শহরেই বার্মিজ মার্কেট অবস্থিত। বার্মিজদের তৈরী বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র এখানে আছে। রূপচর্চা থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব কিছুই এখানে পাওয়া যায়। আমরা সাধ্যমতো কেনাকাটা করে আবার হোটেলে ফিরে আসি। রাত তখন ৯টা।
এবার ফেরার পালা। আমরা খুব দ্রুত রাতের খাবার খেয়ে নির্ধারিত কাউন্টারে চলে যাই। রাত সাড়ে ১০টায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি গাড়িতে আমরা ঢাকা অভিমুখে রওনা হলাম। সব আনন্দকে স্মৃতির পাতায় এঁকে গাড়ি চলছে আর পেছন থেকে যেনো হাত বাড়িয়ে ডাকছে সাগরের ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s