রাসূল সা:-এর উত্তম আচরণ

আদর্শ পোস্ট ফরম্যাট

-মো: তোফাজ্জল হোসাইন

Celebration-Special-Islamic-Fine-Wallpaperপ্রাথমিক কথা
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা: ছিলেন সর্বদিক দিয়ে দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বোত্তম মহামানব; সর্বোপরি তিনি একজন রাসূল। এ সম্পর্কে আল্লাহ  রাব্বুল বাণী “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতকে ভয় করে তাঁদের জন্য রাসূল সা:-এর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।
(সূরা আহজাব : ১১)
আদি পিতা হজরত আদম আ: থেকে শুরু করে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা: পর্যন্ত যত নবী রাসূল প্রেরিত হয়েছেন, তারা সবাই ছিলেন উত্তম চরিত্রের মূর্ত প্রতীক। তাঁদের মধ্যে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা: ছিলেন সবার শীর্ষে। তিনি ছিলেন, উত্তম চরিত্রের বাস্তব রূপ। যে চরিত্রের সার্টিফিকেট দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ  রাব্বুল আলামিন। তিনি আল কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “হে রাসূল! নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। (সূরা কলম : ৪)
মক্কায় রাসূল সা:-এর আচরণ
নবুওয়ত লাভের পূর্বে রাসূল সা: দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর্যন্ত মক্কার অধিবাসীদের সাথে চলাফেরা করেছেন। তার এই দীর্ঘ জীবনে কারো সাথে কোনো খারাপ আচরণ করেছে বলে কোনো একজন ব্যক্তিও বলতে পারবে না।
এ ব্যাপারে উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কোবরা রা: বলেন, যিনি নবুওয়তের পূর্বে ও পরে দীর্ঘ পঁচিশটি বছর পর্যন্ত পতিসেবায় নিয়োজিত ছিলেন; তিনি ওহিপ্রাপ্তির প্রাথমিক পর্যায়ে রাসূল সা: কে এ বলে সান্ত¡না দান করতেন যে, “কখনও নয়, খোদার কসম! আল্লাহ  আপনাকে কখনও দুশ্চিন্তায় ফেলবেন না, আপনি আপনজনের প্রতি সদ্ব্যবহার করে থাকেন, ঋণগ্রস্তদের দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকেন, দরিদ্রজনের সাহায্য করে থাকেন, অতিথি সেবা করে থাকেন, সত্যের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে থাকেন, বিপদে মানুষকে সাহায্য করেন। (বুখারি)
নবুওয়ত লাভের পর সকল মানুষের সাথে রাসূল সা:-এর আচরণ এমন ছিল। সবাই যেন ইসলামের সুশীতল ছায়া তলে  আসে। যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মক্কায় আসতো, অমনি ইসলামের শত্রুরা তাকে ঘিরে ধরতো এবং রাসূল সা:-এর প্রভাব থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতো। কিন্তু অধিকাংশ সময় উল্টো ফল ফলতো। এ ধরনের কয়েকটা ঘটনার উল্লেখ করা জরুরি মনে হচ্ছে।
তোফায়েল বিন আমর দাওসি একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও নামকরা কবি ছিলেন। একবার তিনি মক্কায় বেড়াতে এলে কোরায়েশদের কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তার সাথে দেখা করতে গেল। তারা গিয়ে বললো, ‘তোফায়েল সাহেব, আপনি আমাদের শহরে আগমন করেছেন, এতে আমরা আনন্দিত। তবে এখানে যে ক’টা দিন থাকবেন একটু সাবধানে থাকবেন। এখানে মুহাম্মাদের সা: কার্যকলাপ আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এ লোকটা আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করে দিয়েছে এবং আমাদের স্বার্থ ধ্বংস করে দিয়েছে। ওর কথাবার্তা জাদুর মতো। সে পিতা-পুত্রে, ভাইয়ে-ভাইয়ে এবং স্বামী-স্ত্রীতে বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছে। আপনার ও আপনার গোত্রকে নিয়ে আমরা শঙ্কিত, পাছে আপনারা ওর ধাপ্পার শিকার হয়ে যান। তাই মুহাম্মাদের সা: সাথে আপনার একেবারেই কোনো কথা না বলা ও তার কোনো কথা না শোনা সবচেয়ে উত্তম।’
name_of_muhammad_wallpaper-852x480তোফায়েল বলেন, আমি মুহাম্মাদের সাথে কোনো কথা বলবো না এবং তাঁর কোন কথা শুনবো না-এই মর্মে ওয়াদা না করায় তারা আমার পিছু ছাড়েনি। তাই মসজিদুল হারামে যাওয়ার সময় কানে তুলো দিয়ে যেতাম। এই সময় হঠাৎ একদিন দেখলাম, রাসূল সা: কা’বার কাছে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন। আমিও তাঁর খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি তাঁর আবৃত্তি করা খুবই মধুর বাণী শুনলাম। মনে মনে বললাম : আমি কি মায়ের দুধ খাওয়া শিশু? আল্লাহর কসম, আমি তো একজন বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। আমি একজন কবি। ভালো-মন্দ বাছবিচারের ক্ষমতা আমার আছে। তাহলে মুহাম্মাদের কথা শুনতে আমাকে কে বাধা দিতে পারে? তিনি যে দাওয়াত দেন তা যদি ভালো হয় তাহলে গ্রহণ করবো। আর খারাপ হলে প্রত্যাখ্যান করবো।’
এই চিন্তা-ভাবনায় খানিকটা সময় কেটে গেল। নামায শেষে রাসূল সা: বাড়ির দিকে রওনা হলেন। তোফায়েল তাঁর সাথে সাথে চললেন। পথে তাঁকে সব কথা জানালেন যে, তাঁর কাছে তাঁর সম্পর্কে কিরূপ অপপ্রচার করা হয়েছে এবং কিভাবে তাকে রাসূল সা: এর কাছ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। বাড়িতে পৌঁছে তিনি রাসূল সা: এর দাওয়াত কী, সবিস্তারে জানতে চাইলেন। রাসূল সা: তাঁকে ইসলামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে এবং কোরআন পড়ে শোনালেন। তোফায়েল বলেন, ‘আল্লাহর কসম, এত সুন্দর বাণীও আমি কখনো শুনিনি, এমন নির্ভুল ও সত্য দাওয়াতও আমি কখনো পাইনি। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। অতঃপর তিনি নিজ গোত্রের কাছে গিয়ে ইসলাম প্রচার করলেন। এতে তাঁর সমগ্র গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে।
তোফায়েল এমন আবেগোদ্দীপ্ত প্রচারকে পরিণত হন যে, বাড়িতে গিয়ে বৃদ্ধ পিতার সাথে দেখা হওয়া মাত্রই বলেন, ‘আপনিও আমার কেউ নন, আমিও আপনার কেউ নই।’ পিতা বললেন, ‘সে কী? তোমার কী হয়েছে বাবা!’ তোফায়েল বললেন, ‘আমি এখন মুহাম্মদ সা:-এর ধর্ম গ্রহণ করেছি এবং তাঁর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করেছি।’ পিতা বললেন, ‘বাবা, তোমার ধর্ম যা, আমার ধর্মও তাই হবে।’ তিনি তৎক্ষণাত গোসল করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তোফায়েল একই পন্থায় নিজের স্ত্রীকেও দাওয়াত দিলেন। সেও ইসলাম গ্রহণ করলো। এরপর গোত্রের সবার মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। পরে তিনি রাসূল সা: এর কাছে এসে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন এবং তাঁর গোত্রের বিভিন্ন চারিত্রিক দোষের উল্লেখ করে তাদের জন্য আজাবের দোয়া করতে রাসূল সা:কে অনুরোধ করেন। কিন্তু রাসূল সা: হেদায়াতের ও সংশোধনের দোয়া করেন এবং তোফায়েলকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেন, যেন ধৈর্যের সাথে নিজের গোত্রের সংশোধনের জন্য কাজ করে যেতে থাকে এবং তাদের সাথে ন¤্র আচরণ করে। (ইসলাম প্রচারে তার জবরদস্তির প্রবণতা ইসলামী কর্মনীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল ছিল না।) (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড : ৪০৭-৯ পৃষ্ঠা)
সবচেয়ে মজার ঘটনা ছিল মুরদ আরাশীর। বেচারা একটা উট নিয়ে মক্কায় এসেছিল। আবু জাহলের সাথে উট বিক্রির বিষয়ে তার কথাবার্তা পাকা হয়। কিন্তু আবু জেহেল দাম দিতে গড়িমসি করতে থাকে। বাধ্য হয়ে সে কোরায়েশদের বিভিন্ন নেতার কাছে গিয়ে উটের দাম আদায় করিয়ে দেয়ার জন্য কাকুতি মিনতি করতে থাকে। পবিত্র কা’বার চত্বরে কোরায়েশদের একটা  বৈঠক চলছিল। আরাশী ঐ বৈঠকে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের কাছে আবেদন জানালো যে, আপনাদের কেউ আবু জাহলের কাছে থেকে আমার পাওনাটা আদায় করে দিন। আমি একজন বিদেশী। আমার ওপর যুলুম করা হচ্ছে। ৗবঠকের লোকদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না, যে আবু জাহলের কাছে গিয়ে বিদেশীর হক আদায় করে দেয়ার দুঃসাহস দেখায়। এ জন্য তারা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললো, ঐ যে একটা লোক (মুহাম্মদ সা.) বসে আছে, ওর কাছে যাও। সে আদায় করে দেবে। আসলে এটা ছিল একটা পরিহাস মাত্র। কেননা সবাই জানতো মুহাম্মাদের সা. সাথে আবু জাহলের কি সাংঘাতিক শত্রুতা। আরাশী রাসূল সা. এর কাছে এসে তার সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। রাসূল সা. তৎক্ষণাত উঠলেন এবং বললেন, আমার সাথে এসো। সবাই অপেক্ষা করতে লাগলো কী ঘটে তা দেখার জন্য। রাসূল সা. হারাম শরীফ থেকে বেরিয়ে সোজা আবু জাহলের বাড়িতে গেলেন এবং দরজায় করাঘাত করলেন। ভেতর থেকে আওয়াজ এলো কে? তিনি বললেন: আমি মুহাম্মদ। বাইরে এসো। আমার জরুরি কথা আছে।
আবু জাহল বেরিয়ে এলো। মুখ তার ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। তিনি বললেন, এ লোকটার যা পাওনা আছে, দিয়ে দাও। আবু জাহল বিনা বাক্যব্যয়ে পাওনা পরিশোধ করে দিল। আরাশী সানন্দে হারাম শরীফের বৈঠকরত লোকগুলোর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা জানালো।
মুহাম্মদ সা. এর নির্মল চরিত্রের প্রভাবেই ঘটেছিল এ ঘটনা। আবু জাহল নিজেও এর স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং বৈঠকরত কোরায়েশ নেতাদের কাছে তা ব্যক্তও করেছিল। সে বললো, মুহাম্মদ এসে দরজায় করাঘাত করলো। আমি তার আওয়াজ শুনতেই কেন যেন ভয় পেয়ে গেলাম। (ইবনে হিশাম)
স্বয়ং আরাশী এবং মক্কাবাসীর ওপর এ ঘটনার কেমন প্রভাব পড়ে থাকতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
যেসব নওমুসলিম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তাদের কল্যাণে ঐ এলাকায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছিল। সেখান থেকে ২০ জন খ্রিস্টান মক্কায় এলো। তারা হারাম শরীফে রাসূল সা. এর সাথে সাক্ষাৎ করে। রাসূল সা. তাদের সাথে কথা বলেন, তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন, কোরআন শোনান এবং ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। তাদের চোখে পানি এসে যায় এবং তারা নির্দ্বিধায় ঈমান আনে। তারা যখন উঠে বেরুলো, তখন মসজিদের বাইরে কোরায়েশরা জটলা পাকাচ্ছিল। আবু জাহল আবিসিনিয়ার প্রতিনিধিদলকে বললো, তোমরা কেমন নির্বোধ! নিজেদের ধর্মকে পরিত্যাগ করলে! প্রতিনিধিদল বললো, ‘আপনাদেরকে আমরা সালাম জানাচ্ছি। আমরা আপনাদের সাথে কোন বিবাদ বিসম্বাদে যেতে চাইনে। আমাদের পথ ভিন্ন এবং আপনাদের পথও ভিন্ন। আমরা একটা কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হতে চাইনি।’
মদিনার ভিন্নতর পরিবেশ
ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা যে, মদিনার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবেশ ছিল মক্কা থেকে একেবারেই ভিন্নতর। এ কারণে ইসলামের যে চারাগাছ মক্কায় চরম প্রতিকূল পরিবেশে বেড়ে উঠতেই পারছিল না, মদিনায় এনে লাগানো মাত্রই তা দ্রুত পত্র পল্লবে বিকশিত হয়ে উঠলো ও ফল দিতে শুরু করলো।
প্রথম পার্থক্যটা ছিল এইযে, মক্কা ও তার আশপাশের গোটা জনবসতি পরস্পরে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল। তারা ছিল একই ধর্মাবলম্বী গোত্র ও পারস্পরিক চুক্তির বন্ধনে আবদ্ধ এবং তাদের ওপর কোরায়েশদের ছিল পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য। কিন্তু মদীনা ও তাঁর আশেপাশে দুটো ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির জনগোষ্ঠী বাস করতো এবং তাদের পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব কলহ ও উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
মদিনা ছিল ইহুদিদের প্রতিষ্ঠিত ‘ইয়াসরিব’ নামক প্রাচীন শহর। এখানে তাদের ক্রমান্বয়ে বংশ বিস্তার ঘটতে থাকায় মদিনার আশপাশে তাদের নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠেছিল। সেই সাথে তাদের ছোট ছোট সামরিক দুর্গও নির্মিত হয়েছিল। এভাবে সমগ্র  এলাকা ইহুদিদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবাধীন ছিল।
দ্বিতীয় জনগোষ্ঠীটা ছিল আনসারদের। তাদের আসল জন্মভূমি ছিল ইয়েমেন। কাহতানের বংশধর ছিল তারা। ইয়েমেনের ইতিহাস খ্যাত বন্যায় যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়,তা থেকে বেঁচে যাওয়া লোকেরা এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। কাহতান গোত্রের দু’ভাই আওস ও খাজরাজ তৎকালে মদিনায় এসে বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীকালে অন্যান্য লোকও এসে থাকতে পারে। তবে এই নবাগতদের মাধ্যমেই এ অঞ্চলে নতুন অধিবাসীর সমাগম ঘটে। পড়ে বংশ বিস্তার ঘটতে থাকে এবং ক্রমান্বয়ে একটা নতুন শক্তির উদ্ভব ঘটে। প্রথম প্রথম তারা ইহুদি সমাজ ও কৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবন যাপন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আগে থেকে জেঁকে বসা ইহুদি জনগোষ্ঠীর প্রভাব ও শক্তির চাপে বাধ্য হয়ে তাদের সাথে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তিভিত্তিক মৈত্রী দীর্ঘকাল সুষ্ঠুভাবে চলতে থাকে। কিন্তু ইহুদিরা যখনই অনুভব করলো যে, আনসারদের ক্রমবর্ধমান শক্তি তাদের প্রভাব প্রতিপত্তির জন্য একটা হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন তারা মিত্রতার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেললো।
ইহুদিদের সাথে আনসারদের সম্পর্ক সব সময়ই দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে পূর্ণ ছিল, কিন্তু কোন আদর্শ বা লক্ষ্য না থাকায় আনসারদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য কোন মযবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কলহে তাদের শক্তি ঘুনের মত খেয়ে নষ্ট করে দেয়। ফলে এক সময় আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে বুয়াস নামক যুদ্ধ পর্যন্ত সংঘটিত হয় এবং উভয় পক্ষের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ নিহত হয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইহুদিরা প্রায়শ আনসারদের সামনে আস্ফালন করতো যে, শিগগীরই শেষ নবী আসবেন। তিনি এলে আমরা তার সাথে মিলিত হয়ে তোমাদেরকে দেখে নেব। ইহুদিদের এই হুমকী ও ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে আনসাররাও প্রতীক্ষিত নবীর অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকে। তারা মনে মনে সংকল্প নেয়, ঐ নবীর আবির্ভাব ঘটলে তারা সবর্প্রথম তাঁর দলে ভিড়বে। হলোও তাই। যারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তারা বঞ্চিত থেকে গেল। ইহুদিরা যাদেরকে মার খাওয়াতে চেয়েছিল, তাদের হাতে নিজেরাই মার খেয়ে গেল। (সিরাতুন্নবী : শিবলী নুমানী)
ইহুদিদের আধিপত্য ও আভিজাত্যের একটা কারণ ছিল তাদের ধর্মীয় মোড়লিপনা। তাদের কাছে তাওরাত ছিল। এই সুবাদে তারা একটা স্বতন্ত্র ধর্মীয় বিধানের পতাকাবাহী ছিল, তাদের কাছে আলাদা আকিদা ও আদর্শগত পুঁজি ছিল, কিছু চারিত্রিক নীতিমালা ছিল, কিছু ধর্মীয় আইন ও বিধি ছিল, কিছু ঐতিহ্য ছিল এবং এবাদত পালনের স্বতন্ত্র বিধান ছিল। এদিক দিয়ে আনসারদের বলতে গেলে কিছুই ছিলনা। এ সব বিষয়ে তারা ইহুদিদের মুখাপেক্ষী ছিল। তাদেরই ‘বাইতুল মাকদাস’ (তৎকালে ইহুদিদের ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র) থেকে তারা শিক্ষা লাভ করত। এমনকি যদিকোন আনসারীর সন্তান না বাঁচতো, তাহলেসে এই বলে মান্নত মানতযে, সন্তান বেঁচে থাকলে তাকে ইহুদি বানানো হবে। আনসারদের মধ্যে এদিক থেকে হীনমন্যতাবোধ বিরাজ করতো। তাদের আত্মসম্মানবোধ ও আভিজাত্যবোধ ক্ষুন্ন হওয়ায় তারা মনে মনে সব সময় বিব্রত থাকতো। এই সমস্ত তথ্য দ্বারা বুঝা যায়যে, মদিনার পরিমন্ডলে ইহুদি ও আনসারদের মাঝে দ্বন্দ্ব কলহ বিরাজ করতো এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল গভীর প্রতিদ্বন্দ্বীসুলভ।  যেসব শর্তের ভিত্তিতে ইহুদিরা চুক্তিতে সই করেছিল, তাঁর কারণে তারা ইসলামী আন্দোলনের উন্নতি ও বিস্তার লাভে বাধা দিতে পারছিল না। তাদেও চোখের সামনে সাধারণ মানুষ ও তাদের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হচ্ছিল। অথচ তাদের আধ্যাত্মিক নেতারা, পীর দরবেশরা ও মুফতিরা নীরব দর্শক হয়ে তা দেখছিল। এমনকি শেষ পর্যন্ত তাদের ঘরে ঘরেও ইসলাম প্রবেশ করা শুরু করেছিল। তাদের নিজেদেও লোকেরা, বিশেষত গণ্যমান্য লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকায় ধর্মব্যবসায়ী মানসিকতার অধিকারী এই সম্প্রদায়ের ধৈর্যের বাঁধ না টুটে গত্যন্তর ছিল না। তাছাড়া প্রত্যেক বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা এত অপ্রতিরোধ্য হয়ে থাকেযে, নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে যারা তার প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসে, তাদেও মোকাবিলা করার জন্য তাদের পরিবারের নবীনরাই ঐ বিপ্লবী আদর্শে দীক্ষিত হয়ে থাকে। ফলে ছেলে বাপের সাথে, বউরা শাশুড়ির সাথে, মেয়েরা মায়ের সাথে, পৌত্রেরা দাদা নানার সাথে এবং দাসেরা মনিবের সাথে বিরোধে লিপ্ত হয়ে থাকে।
ইহুদি সমাজে এ ধরনেরই এক অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন সালাম। তাঁর প্রাগৈসলামিক নাম ছিল হাসীন। তিনি একজন উঁচুদরের আলেম ও খোদাভীরু ধর্মীয় নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন বনু কাইনুকা গোত্রেরলোক। রাসূল সা. এর সাথে সাক্ষাতের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজের পরিবার পরিজনকেও ইসলামে দাওয়াত দেন ও উদ্বুদ্ধ করেন। শেষ পর্যন্ত গোটা পরিবারই ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁর এক আত্মীয় তাঁর কাছথেকে শুনে তাঁর ইসলাম গ্রহণের যে কাহিনী বর্ণনা করেছেন, তা শুনুন, “আমি যখন আল্লাহর বার্তাবাহকের আগমনের খবর প্রথম শুনলাম, তখন তাঁর নাম, গুণবৈশিষ্ট্য ও আগমনের দিনক্ষণ জেনে নিলাম। কেননা আমরা তাঁর প্রতীক্ষায় ছিলাম। তাই এই খবরটা শুনে মনে মনে আনন্দিত হচ্ছিলাম। কিন্তু মুখে কিছু বলছিলাম না। তিনি যখন মদিনায় চলে এলেন, তখন পর্যন্ত আমি চুপচাপ ছিলাম। যখন তিনি কোবায় বনু আমর ইবনে আওফের বসতিতে পৌঁছলেন, তখন একটা লোক এসে আমাকে তাঁর আগমন বার্তা শোনালো। এ সময় আমি আমার খেজুর গাছের মাথার ওপর চড়ে কাজ করছিলাম। আমার ফুফু খালেদা বিনতে হারেস নিচে বসা ছিলেন। আমি আগমন বার্তা শোনামাত্র উচ্চস্বরে আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুললাম। ফুফু আমার ধ্বনি শুনে বললেন, “আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করে দিক! হযরত মূসা বিন ইমরানের আগমনের খবর শুনলেও তুই এমন উল্লাস প্রকাশ করতিনা।” আমি বললাম, “ফুফুজান! আল্লাহর কসম, ইনি মূসা বিন ইমরানের ভাই এবং তাঁরই ধর্ম পালনকারী। মূসা বিন ইমরানযে বিধান এনেছিলেন, ইনিও তাই নিয়ে এসেছেন।” ফুফু বললেন, “হে আমার ভাতিজা, যে নবীর কথা আমাদেরকে বলা হয় যে, কেয়ামতের আগে আসবেন, ইনি কিসেই নবী?” আমি বললাম, “হাঁ, ইনিই তো সেই নবী।” এরপর আমি আল্লাহর নবীর সান্নিধ্যে পৌঁছলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করলাম। তারপর নিজের পরিবার পরিজনের কাছে এলাম এবং তাদেরকেও দাওয়াত দিলাম। ফলে তারা সবাইও ইসলাম গ্রহণ করলো। (সিরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড)
এই নওমুসলিম আলেম যেহেতু ইহুদিদের দুর্বলতাগুলো জানতেন এবং তাদের বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতা ও নিকৃষ্ট চরিত্র সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন, তাই তাঁর ইসলাম গ্রহণে কী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হবে, তাও জানতেন। স্বার্থপরতার ভিত্তিতে যখন দল ও গোষ্ঠী গঠিত হয়, তখন চরিত্রের এত অধোপতন ঘটে থাকে যে, ভালোকে ভালো ও মন্দকে মন্দ বলার পরিবর্তে নিজেদের মন্দকে ভালো এবং প্রতিপক্ষের ভালোকে মন্দ বলা হয়। নিজের গোয়ালের গরু কালো হলেও তাকে সাদা এবং অন্যেও গোয়ালের গরু সাদা হলেও তাকে কালো বলা হয়। এমনকি নিজের গোয়ালের সাদা গরু গোয়াল ভেঙ্গে বেরিয়ে যাওয়ামাত্রই কালো বলে আখ্যায়িত হয়ে থাকে। সকল যুগেই এ ধরনের ধর্মচারীদের চরিত্র একই রকম হয়ে থাকে। যতক্ষণ কোন ব্যক্তি তাদের সাথে থাকে অথবা অন্তত পক্ষে এই তার সম্পর্কে এই আশংকা জন্মে না যে তার তৎপরতা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, ততক্ষণ তার গুণাবলী খোলামনে স্বীকার করা হয়। বরং কখনো অতিরঞ্জিত করে ঢালাওভাবে তার বিদ্যা ও চরিত্রের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়। কিন্তু সময়ের কিছু পরিবর্তনের সাথে সাথে এ ধরনেরকোন মহান ব্যক্তিত্বের ভূমিকা কারো ধর্মব্যবসায়ের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হলে তৎক্ষণাত মতামত পালতে যায়। আগে যিনি আলেম ছিলেন এখন তাকে মূর্খ বলা হয়। আগে যিনি মুমিন ছিলেন, এখন তাকে বলা হয় কাফের, ফাসেক এবং আরো অনেক কিছু। আগে যে ব্যক্তি জাতির সেবক বলে গণ্য হতো, এখন তাকে বলা হয় বিপথগামী। আগেযে ব্যক্তি ভক্তিশ্রদ্ধার পাত্র ছিল, এখনসে হয়ে যায় গালাগালের শিকার। বিকৃত স্বভাবের অধিকারী ইহুদি জাতির চরিত্রের এইসব হীনতা ও নীচতা আব্দুল্লাহ ইবনে সালামের জানা ছিল। তিনি এই হীনতা ও নীচতার ওপরথেকে আবরণ তুলে ফেললেন। মনে মনে একটা নাটকের পরিকল্পনা করে নিজের ইসলামের গ্রহণের বিষয়টা গোপন রেখেছিলেন। উপযুক্ত সময় রাসূল সা. এর কাছে হাজির হয়ে বললেন, ইহুদিরা একটা বাতিলপন্থী জাতি। তাদের বিকারগ্রস্ত স্বভাবের মুখোশ খুলে ফেলার জন্য আপনি আমাকে আপনার গৃহে পর্দার আড়ালে বসিয়ে রাখুন। তারপর তাদেও চোখের আড়ালে রেখে আমার সম্পর্কে তাদের মতামত জানতে চাইবেন। তারপর দেখবেন, আমার ইসলাম গ্রহণের কথা নাজানা অবস্থায় তারা আমার সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করে। তারা যদি আমার ইসলাম গ্রহণের খবর জেনে ফেলে, তাহলে আমার ওপর অপবাদ আরোপ করবে ও দোষ বদনাম করবে। রাসূল সা. অবিকল তাই করলেন। আব্দুল্লাহ বিন সালামকে তাঁর ঘরে পর্দার আড়ালে বসিয়ে রাখলেন। এদিকে ইহুদি নেতারা এলো এবং আলাপ আলোচনা চললো। তারা নানা প্রশ্ন করলো এবং তাঁর জবাব দেয়া হলো। সবর্শেষ রাসূল সা. জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যকার হাসীন বিন সালাম কেমন লোক? তারা বলল, ‘উনি আমাদের সরদার এবং সরদারের ছেলে। উনি আমাদের একজন মহৎ ব্যক্তি এবং একজন বড় আলেম। এভাবে তারা গুণকীর্তন করার পর আব্দুল্লাহ বিন সালাম পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন এবং তাদেরকে সম্বধন করে বললেন, “হে ইহুদি সম্প্রদায়, আল্লাহকে ভয় করো এবংযে ধর্ম মুহাম্মাদ সা. নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহর কসম, তোমরা ভালোভাবেই জান যে, ইনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। তোমরা মুহাম্মাদ সা. এর পবিত্র নাম ও গুণাবলী তাওরাতে লিখিত দেখে থাক। তাই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছিযে, তিনি আল্লাহর রাসূল। তাঁর ওপর ঈমান আনছি, তাঁকে সত্য বলে জানি এবং স্বীকার করছি।” ইহুদিরা এই নাটকে যারপর নাই বিব্রত হলো এবং তৎক্ষণাত বলল, “তুমি মিথ্যুক।” এরপর আব্দুল্লাহ বিন সালামের নিন্দাবাদ ও কুৎসা রটানো শুরু করে দিল। এক্ষুনি কয়েক সেকেন্ড আগে যাকে মহান ব্যক্তি ও আলেম বলে আখ্যায়িত করেছে, তাকেই মিথ্যুক বলতে শুরু করে দিল। আব্দুল্লাহ রাসূল সা.কে বললেন, “আমি আপনাকে বলেছিলাম নাযে, এরা একটি বাতিলপন্থী সম্প্রদায়। এরা অহংকার, মিথ্যাচার ও অসদাচারের দোষে দুষ্ট।” এভাবে একটা নাটকীয় পদ্ধতিতে আব্দুল্লাহ বিন সালাম নিজেরগোটা পরিবারের ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন। এ ঘটনায় ইহুদিদের মনমগজে কি সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকতে পাওে ভেবে দেখুন। (সিরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, ১৩৮-১৩৯ পৃ:)
এর অল্প কিছুদিন পর ওহুদ যুদ্ধের দিন প্রখ্যাত আলেম ও সম্মানিত ব্যক্তি মুখাইরিকের বেলায়ও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। ইনি ইহুদিদের মধ্যে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর ছিল অনেকগুলো খেজুরের বাগান। তিনি নিজের জ্ঞানের আলোকে রাসূল সা. এর গুণাবলী দেখে তাঁকে চিনে ফেলেছিলেন। ঘটনাক্রমে ওহুদের দিন এসেগেল এবং তা ছিল শনিবার। একটা মজলিশে তিনি বললেন, “হে ইহুদি জনমন্ডলী, আল্লাহর কসম তোমরা জান যে, মুহাম্মাদ সা. এর সাহায্য করাতোমাদের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।” তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, মক্কার মোশরেকদেও মোকাবিলায় মুসলমানদের দলকে সাহায্য করা তোমাদের ওপর নীতিগতভাবে ফরয। এর জবাবে ইহুদিরা যা বললো তা তাদের ধাপ্পাবাজি ও খল মানসিকতারই ঘৃণ্য ছবি তুলে ধরে। তারা বললো, “আজ তো শনিবার।” এ জবাব শুনে মুখাইরিক তেজোদীপ্ত কণ্ঠে বললেন, “তোমাদের জন্যকোন শনিবার নেই।” অতঃপর তিনি অস্ত্র হাতে নিয়ে ওহুদের ময়দানে গিয়ে রাসূল সা. এর সাথে মিলিত হলেন। যাওয়ার সময় নিজের পরিবার পরিজনদের সাথে দেখা করে বলে গেলেন, আমি যদি আজ নিহত হই, তবে আমার সমস্ত ধন সম্পদ রাসূল সা. এর হাতে সমর্পন করবো। তিনি আল্লাহর নির্দেশে যেভাবে ভালো মনে করেন, তা খরচ করবেন। সত্যিই এই ত্যাগী সৈনিকটি ঐদিন মারা গেলেন। রাসূল সা. তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি গ্রহণ ব্যয় করেন। তবে মুখাইরিক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কিনা, সে সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ আছে।
ইসলামী আন্দোলনের এই বিজয়াভিযানে ইহুদিদের ভন্ডামি যে গোপন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে, তা একটা মজার ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উম্মুল মুমিনীন হযরত সফিয়া বিনতে হুয়াই বিন আখতার বর্ণনা করেন, আমি আমার বাবা (ইহুদি সরদার হুয়াই) ও চাচার কাছে অন্য সব সন্তানের চেয়ে বেশি প্রিয় ছিলাম। তারা উভয়ে সব সময় আমাকে সাথে সাথে রাখতেন। রাসূল সা. যখন মদিনায় এসে কোবায় অবস্থান করতে লাগলেন, তখন আমার বাবা হুয়াই বিন আখতার ও চাচা ইয়াসার বিন আখতার খুব ভোরে তাঁর সাথে দেখা করতে গেলেন। সূর্যাস্তের সময় ফিরে এলেন। মনে হলো, তারা খুবই ক্লান্ত ও অবসন্ন। তারা খুব ধীরগতিতে চলছিলেন। আমি অভ্যাস মত মুচকি হেসে তাদের সামনে গেলাম। কিন্তু ক্লান্তির কারণে তারা আমার দিকে ভ্রুক্ষেপই করলো না। আমার চাচা আবু ইয়াসার বাবাকে জিজ্ঞাসা করলো, “কি হে, ইনিই কিসেই (প্রতিশ্রুত নবী) ব্যক্তি?” বাবা বললেন, “হাঁ, আল্লাহর কসম।” চাচা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি তাঁকে চিনেফেলেছ? তুমি কি নিশ্চিত?” বাবা বললেন, হাঁ। চাচা জিজ্ঞেস করলেন, “এখন তাঁর সম্পর্কে তোমার মনোভাব কী?” বাবা বললেন, “শুধুই শত্রুতা। যতদিন বেঁচে আছি, খোদার কসম, শত্রুতাই করে যাবো।”
Muhammad-SAW-Islamic-Wallpaper-800x600এই ছিল ইহুদিদের আসল মানসিকতা। তারা খুব ভালো করেই জানতোযে, তাদের কাছে যিনি এসেছেন তিনি সত্যের আহ্বায়ক এবং নবী। তাঁর প্রতিটি কথা তার সত্যতার সাক্ষ্য বহন করছে। তাঁর সমগ্র  চরিত্র তাঁর মর্যাদাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। তাঁর চেহারা তাঁর নবুওয়তের লক্ষণ প্রতিফলিত করছে। তারা শুধু জানতো ও বুঝতো তা নয়, বরং গোপন বৈঠকে তা মুখ দিয়ে স্বীকারও করতো। কিন্তু ঈমান ও আনুগত্যের পথ অবলম্বন না করে তারা বিরোধিতা ও শত্রুতার জন্য কৃতসংকল্প হতো। এটাই ছিল ইহুদিদের চিরাচরিত স্বভাব। সূর্য উঠলেযে আলোর বান ডাকে তাকে না জানে। মানুষ ও জীবজন্তুও চোখ আছে, তাই তারা এ দৃশ্যদেখতে পায়। কিন্তুযে ঘাসপাতার চোখনেই, তারাও টের পায় যে, প্রত্যেক অন্ধকার রাতের শেষে যে ঘটনা প্রতিদিন ঘটে থাকে, তা ঘটে গেছে। এমনকি তাপ, উষ্ণতা, মাটির নিষ্প্রাণ কণাগুলো, পানির ফোঁটাগুলো এবং বাতাসের ঝাপটাগুলোও জেনে ফেলে যে, আলোর বার্তাবাহক আবির্ভূত হয়েছে। সূর্যোদয় এমন এক বিপ্লবাত্মক ঘটনা যে, চামচিকে ও বোবা পর্যন্ত তা জেনে ফেলে। কিন্তু তাদের স্বভাবের বক্রতা এই যে, রোদ ওঠার পর আর সব জীব জানোয়ারের চোখ খুলে যায়, কিন্তু পেঁচা ও চামচিকের চোখ বন্ধ হয়ে যায়। উপরন্তু তাদের জন্য সূর্যোদয়ের আলামতই হয়ে থাকে সূর্য রশ্মিতে তাদেও চোখ ঝলসে যাওয়া ও বুজে যাওয়া। মানুষ এত অন্ধ হতে পারেনাযে, তাঁর সামনে আল্লাহর নবীগণ অলৌকিক পর্যায়ের জ্ঞান ও চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হবেন এবংসে অনুভবই করবেনা যে, কোন অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ও মহান ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে। এসব লোক দেখে, জানে, বোঝে এবং এ সব কিছুর পরও চোখ বন্ধ করে রাখে। তারপরও যদি আলো চোখের ভেতর প্রবেশ করে, তবে চোখের ওপর পট্টি বেঁধে নেয়; হাত দিয়ে ঢেকে নেয়, মুখ বালুতে লুকায়, কক্ষের দরজা জানালা বন্ধ করে তাঁর ওপর কালো পর্দা ফেলে দেয়। প্রবাদ আছে যে, ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগানো যায়, কিন্তু জাগ্র ত ব্যক্তিকে জাগানো যায়না। অনুরূপভাবে, অজ্ঞ লোককে জ্ঞান দান করা যায়। কিন্তু যে ব্যক্তিজেনেও না জানার ভান করে, তাকে অজ্ঞতার জগত থেকে বের করে আনা সম্ভব নয়। ইহুদি জাতির অধিকাংশ এবং তাদের বড় বড় আলেমদের এই অবস্থাই হয়েছিল। কোরআনও তাদের এই বিকৃতির উল্লেখ করে বলেছে যে,
“অর্থাৎ তারা নিজের সন্তানদেরকে যেমন নিশ্চিতভাবে জানে ও চেনে, রাসূল সা.কেও ঠিক তেমনি জানে ও চেনে।”
ইহুদি নেতারা রাসূল সা. এর উচ্চমর্যাদা ও সাধারণ মানুষরা তাঁর নতুন দাওয়াতের প্রতি ধাবমান হতে দেখে হিংসায় জ্বলতে থাকতো এবং তাদের হৃদয়ের জগতে ঘোরতর অবস্থার সৃষ্টি হতো।
বেদুইন আরবদের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা.) ব্যবহার
রাসূলুল্লাহ (সা.) মূলত বেদুইন আরব সমাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, শুধুমাত্র আরব সমাজ নয়। সুতরাং বেদুইনদের আচার আচরণগুলো খুব নিম্নস্তরের ছিল যা রাসূলুল্লাহকে (সা.) সহ্য করতে হতো। একটি রেওয়ায়েতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক আরব বেদুইন মদিনায় আসলো এবং মসজিদ যে কি জিনিস তা সে জানতো না। সে মসজিদের এক কোণায় গিয়ে প্রস্রাব করে দিলো। সাহাবীরা অসন্তুষ্ট হলেন এবং তাকে তিরস্কার করতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: তাকে কষ্ট দিও না, অতঃপর তাকে ডাকলেন এবং বোঝালেন যে, মসজিদ আল্লাহকে স্মরণ ও ইবাদত করার জায়গা, এরকম অশ্লীল কাজ করার জায়গা নয়।
মুয়াবিয়া ইবনে হাকাম বলেন: আমি নামাজরত অবস্থায় ছিলাম এমতাবস্থায় কোন ব্যক্তি হাঁচি দিল, আমি বললাম: ইয়ারহামুকুমুল্লাহ। অন্য সবার দৃষ্টি আমার দিকে আকৃষ্ট হলো। লোকটি আবারও হাঁচি দিল এবং আমিও পুনরায় বললাম: ইয়ারহামুকুমুল্লাহ। যখন দেখলাম অন্যরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তাদেরকে বললাম: তোমাদের মা তোমাদের শোকে বসুক, কেন আমার দিকে চেয়ে আছো? অন্যরা তাদের রানের উপর হাত চাপড়াতে লাগল এবং আমিও চুপ হয়ে গেলাম। যখন রাসূলুল্লাহর (সা.) নামাজ শেষ হলো, আমাকে ডাকলেন। আল্লাহর কসম কোন শিক্ষক তার আগে ও পরে আমি পাইনি যে, আমাকে এভাবে শিক্ষা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) না আমাকে কোন প্রকার শাস্তি দিলেন না কোন প্রকার খারাপ ব্যবহার করলেন। তিনি বললেন: তুমি যে নামায পড়েছ তার কোন লাভ নেই, কেননা তুমি নামাজের মাঝে কথা বলেছ, আর নামাজ হচ্ছে তসবিহ, তকবির ও কোরান তেলাওয়াতের স্থান। (সোবোলোল হুদা, ৭/১৯)
অন্য এক রেওয়ায়েতেও আল্লাহর রাসূল (সা.) এর দ্বীনি শিক্ষা দানের ধরন বর্ণিত হয়েছে। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করে: হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমি জোনোব অবস্থায় রয়েছি কি করবো? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: আমার সাথেও অনেক সময় এরকম হয়। ঐ লোকটি বলল: আপনি আমাদের মতো নন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: আল্লাহর কসম; আমিও আল্লাহর বিনয়ীতম বান্দা হতে চাই আর তাকওয়ার ব্যাপারে অধিক জ্ঞানী। (মুসলেম, ১১১০)
মায়া’য ইবনে জাবাল ও আবু মুসা আশআরী যখন ইয়ামানে যাচ্ছিলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন তাদেরকে বললেন: يَسّرا و لا تُعَسّرا، بشّرا ولا تنفرّا (بخاري ـ فتح الباري ৬১২৪.১০) জনগণের সাথে সহজ ব্যবহার করো কঠিন ব্যবহার করো না, সুসংবাদ দিও বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না। কিছু লোক মদিনায় এলো এবং জনগণকে জিজ্ঞাসা করলো: রাসূলুল্লাহ (সা.) কেমন ইবাদত করেন। যখন শুনল এবং অনুভব করলো যে তিনি খুব বেশি পরিমাণে ইবাদত করেন না, তখন বলল: খুব ভাল, যেহেতু তিনি আল্লাহর রাসূল তাই আল্লাহ তায়ালা তার সকল কিছুকে ক্ষমা করেছেন। তাদের মধ্য থেকে একজন বলল: আমি নিয়মিত রাত থেকে সকাল পর্যন্ত ইবাদত করি, আরেকজন বলল: আমি সর্বদা রোজা রাখব, অন্য আরেকজন বলল: আমি বিয়ে করব না শুধু আল্লাহর ইবাদত করব। রাসূলুল্লাহ (সা.) এলেন এবং তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন: তোমরা এরকম কথা বলছ কিন্তু আমি তোমাদেও চেয়ে বিনীত ও পরহেজগার হওয়া সত্ত্বেও রোজা রাখি ও খাদ্যও খাই, নামাজ পড়ি, বিয়েও করেছি আর এটি হচ্ছে আমার সুন্নত, যে কেউ আমাকে মানে সে যেন আমাকে অনুসরণ করে।
অমুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্ক :
ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে মুসলিম সম্প্রদায়ের আচার অনুষ্ঠানগুলো অন্য কোনো অমুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেয় না ইসলাম। এ বিষয়ে আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘দ্বীন তথা জীবনবিধান গ্রহণের ব্যাপাওে কোনো জবরদস্তি নেই; কেননা সত্য পথ হতে ভ্রান্ত পথ সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।’ (সূরা বাকারা : ২৫৬)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন আর আমাদের জন্য আমাদের দ্বীন।” (সূরা কাফিরূন : ৬)। বস্তুত ইসলামের মূল কথা হচ্ছে এক দিকে মুসলিম সম্প্রদায় পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান ইসলামের ধর্মীয় ও বৈষয়িক অনুশাসন জীবনের সব ক্ষেত্রে পুরোপুরি মেনে চলে একটি আদর্শ সমাজ ও পৃথিবী গড়ে তুলবে যার সুফল অন্য সব সম্প্রদায়ের লোকেরা ভোগ করবে এবং এর প্রতি আকৃষ্ট হবে। অপর দিকে অন্য সম্প্রদায়ের লোকদের স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করার সুযোগ দেবে এবং তাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে না।
অমুসলিমদের সাথে নবী করিম (সা)-এর ব্যক্তিগত আচরণ ছিল খুবই অমায়িক। সাহাবী আবু বছরা বর্ণনা করেন, ‘‘ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমি এক রাতে নবী করিম (সা)-এর মেহমান হই। তাঁর ঘওে যে ক’টি বকরি ছিল, সব ক’টির দুধ আমি একাই পান কওে ফেলি। ফলে সে রাতে নবী করিম (সা) সহ পরিবারের সবাই অভুক্ত অবস্থায় রাত যাপন করেন। তবুও তিনি আমার প্রতি বিন্দুমাত্রও বিরক্ত হন নি।’’ (মুসনাদে আহমদ)। এ বিষয়ে হজরত আসমা (রা) বর্ণনা করেন, “হুদায়বিদায় সন্ধির পর তিনি তাঁর অমুসলিম মায়ের সাথে আচরণ সম্পর্কে নবী করিম (সা)-কে জিজ্ঞেস করলে জবাবে তিনি বললেন, ‘‘মা যেই হোন না কেন তার সাথে সদাচরণ করতেই হবে।’’ (বুখারি)।

Muhammad-PBUH24

রাসূল সা:-এর মহানুভবতায় ইসলামের সুশীতল ছায়ায়
বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-সহ জিন্দাদিল আল্লাহপ্রেমিকদের চারিত্রিক সৌন্দর্যে ব্যাকুল হওয়া মানুষের জীবনবিপ্লবের চমকপ্রদ গল্প।
এক. প্রিয় নবীর ক্ষমা ও ঔদার্যে প্রভাবিত ছামামা (রা.)-এর মুসলমান হওয়ার ঘটনা
ষষ্ঠ হিজরির ১০ মহররম রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মুহাম্মদ ইবনে মাসলামার নেতৃত্বে ৩০ জন অশ্বারোহী সৈনিককে ‘কারতা’ (এটি বনু বকর গোত্রের শাখা; মদিনা থেকে সাত দিন সফরের দূরত্বে ‘দারবা’ এলাকায় তাদের অধিবাস) অভিমুখে প্রেরণ করেন। বিদ্রোহী অধ্যুষিত এ অঞ্চলে তাদের পরিচালিত ঝটিকা আক্রমণে ১০ জন নিহত ও বাদ-বাকি লোকেরা পালিয়ে যায়। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে ১৫০টি উট এবং তিন হাজার ছাগল হস্তগত হয়। অভিযান পরিচালনাকারী সাহাবীগণ সব কিছু নিয়ে রাসুলের দরবারে হাজির হন। ১৯ দিন পর ২৯ মহররম তাঁরা মদিনায় পৌঁছেন। রাসূল (সা.) লব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ ‘গনিমত’ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বণ্টন কওে দেন। গনিমত বণ্টনে ১০টি ছাগল একটি উটের সমান বিবেচনা করা হয়। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) সূত্রে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত : অভিযান পরিচালনাকারী সৈনিকরা বনু হানিফার গোত্রপ্রধান ছামামা বিন আ’সালকে বন্দি করে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। রাসূলের সামনে তাঁকে হাজির করার পর তিনি মসজিদে নববীর একটি স্তম্ভের সঙ্গে বেঁধে রাখার নির্দেশ দেন, যাতে মুসলমানদের নামাজ, আল্লাহর দরবারে বিগলিত হৃদয়ে কান্নাকাটি ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি প্রত্যক্ষ করে তার অন্তরে ইতিবাচক প্রভাব সঞ্চারিত হয়। আল্লাহর কথা স্মরণে আসে; পরকালীন জীবনের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। মুসলমানদের ইমান-আমলের অপার্থিব জ্যোতিতে তার অন্তর্লোক আলোকিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছামামা! আমার ব্যাপাওে তোমার ধারণা কিরূপ? তিনি উত্তর দিলেন, ‘আপনার ব্যাপারে আমার ধারণা ভালোই। আপনি যদি আমাকে মৃত্যুদন্ডের হুকুম দেন, তাহলে একজন খুনিকে প্রাণনন্ড দেওয়া হবে,যে শাস্তির সে উপযুক্ত। আর যদি ক্ষমা কওে দেন, তাহলে সেটা একান্ত আপনার উদারতা। যদি আপনার সম্পদের চাহিদা থাকে তবে বলুন! যত চান তা আপনার সামনে হাজির করব। দ্বিতীয় দিন আবারও রাসূল (সা.) তাকে একই প্রশ্ন করেন। তিনি রাসূল (সা.)-এর দয়ার্দ্রতা অনুভব করে প্রথম ও তৃতীয় বাক্য উহ্য কওে কেবল এটুকু বললেন- ‘যদি দয়া করেন তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপরই দয়া করা হবে।’ দ্বিতীয় দিনও রাসূল (সা.) চুপচাপ চলে গেলেন। মহানবী (সা.) তৃতীয় দিন একই জায়গায় আগের জিজ্ঞাসারই পুনরাবৃত্তি করলেন। ছামামা বলল, ‘গতকাল যা বলেছি আপনার ব্যাপারে তা-ই আমার ধারণা।’ আজকের (তৃতীয় দিনের) জবাবে ছামামা ‘যদি অনুগ্রহ করেন, তবে তা একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির প্রতিই করা হবে’- বাক্যটিও অনুক্ত রেখে তার বিষয়টি পুরোপুরি রাসুলের নৈতিক উচ্চতা ও অনুগ্রহ-উদারতার ওপর ছেড়ে দেয়। তিনি ছামামার উদ্দেশে বলেন, ‘ছামামা! আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম, যাও, তুমি মুক্ত।’ মুক্তি পেয়েও ছামামা রাসূলের এমন বিরল উদারতা আর দয়া-ক্ষমাশীলতার প্রত্যক্ষ পরিচয় পেয়ে মসজিদের অদূওে খেজুর বাগানে গিয়ে গোসল সেরে ফিরে এলেন। তিনি ঘোষণা করলেন- ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ইবাদতের উপযুক্ত নয় এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নির্বাচিত প্রেরিত পুরুষ তথা রাসূল। রাসুলের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘হে মুহাম্মদ (সা.)! এ পরিস্থিতির আগ পর্যন্ত আপনার চেহারাই আমার কাছে সর্বাধিক ঘৃণ্য ছিল, এখন থেকে পৃথিবীতে আপনার চেহারাই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় মুখ।’ (বোখারি, খন্ড-১, পৃ. ৬৬)
পরবর্তী জীবনে ছামামা (রা.)-এর কীর্তি
ছামামা ইবনে আ’সাল (রা.) অন্যতম মর্যাদাবান সাহাবী। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইয়ামামা অঞ্চলের অধিবাসীরা ধর্ম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়। তিনি লোকদের সামনে এ আয়াতগুলো তিলাওয়াত কওে শোনাতে থাকেন- ‘হা-মীম, এ গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর পক্ষ থেকে, যিনি পাপ মোচনকারী, তাওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা ও পূর্ণ সামর্থ্যবান। তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্যনেই। তাঁরই দিকে হবে প্রত্যাবর্তন।’ (সুরা মু’মিন, ১-৩) এরপর তাদের উদ্দেশে বলেন, বিবেকবোধ থেকে ন্যায়সংগতভাবে বলো দেখি! মিথ্যাবাদী মুসাইলামার বেহুদা বকবকানির সঙ্গে মহান আল্লাহর এ অমিয় বাণীর তুলনা কী করে চলে? হজরত ছামামার নিষ্ঠা ও ইমানবিধৌত এ কয়টি বাক্য শত-সহগ্র  মানুষের অন্তরে গিয়ে করাঘাত করে। মুসাইলামার তিন হাজার অনুসারী তাকে ত্যাগ করে ইসলামের ছায়াতলে আবার ফিরে আসে। তারা আবার কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে মুসলমান হয়ে যায়। – জুরকানী, খন্ড-২, পৃ. ১৪৪
দুই. রাসুলের আদর্শমুগ্ধ খাযরাজ গোত্রে এক হাজার লোকের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা
সহিহ মুসলিমে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর বরাতে বর্ণিত হয়েছে, যখন মুনাফিকদেও নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলের মৃত্যুর পর তারছেলে আবদুল্লাহ রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, আমার পিতার জন্য আপনার জুব্বাটি দিয়ে দিন, তা দিয়ে তাকে কাফন হিসেবে পরাতে চাই। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের জুব্বাটি তাঁকে দিয়ে দিলেন। এরপর হজরত আবদুল্লাহ তাঁর পিতার জানাজা পড়ানোর জন্য রাসূল (সা.)-কে অনুরোধ করেন। এতে ঘোরতর আপত্তি তোলেন হজরত উমর (রা.)। তিনি বললেন, আপনি মুনাফিকের জানাজা পড়াবেন? অথচ আল্লাহ আপনাকে তার জানাজা পড়াতে বারণ করেছেন! রাসূল (সা.) জবাব দিলেন, আল্লাহ তো আমাকে এখতিয়ার দিয়েছেন। আমি চাইলে পড়াতেও পারি আবার না পড়াতেও পারি। সে আয়াতে তার জন্য ৭০ বার ‘ইস্তিগফার’ করলেও মাগফিরাত হবে না বলা হয়েছে; আমি এর চেয়েও বেশি ইস্তিগফারও করতে পারি। এখানে সুরায়ে তাওবার এ আয়াতটির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
‘আপনি তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন বা না করুন; আপনি ৭০ বার ক্ষমা প্রার্থনা করলেও তাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না।’- কোরআন, ৯ : ৮০
তারপরও রাসূল (সা.) তার জানাজা পড়ান। পরে ‘তাদের কারো জানাজা আপনি পড়বেন না’- আয়াতটি নাজিল হলে তিনি আর কোনো মুনাফিকের জানাজা পড়েননি।
অন্তর্নিহিত রহস্য
তাকে (মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই) আল্লাহ ক্ষমা করবেন না, এটা জেনেও রাসূল (সা.) কেন নিজের জামা দিলেন এবং তার জানাজাই বা কেন পড়ালেন? এর উত্তর হলো- প্রথমত, লোকটির ছেলে, যিনি নিষ্ঠাবান সাহাবি ছিলেন, তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর মন রক্ষা ও প্রবোধ দেওয়ার জন্যই তা করা হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ হলো, সহিহ বুখারিতে হজরত জাবের (রা.) বদরের যুদ্ধে কুরাইশ গোত্রের নেতৃস্থানীয় লোকদের সঙ্গে বন্দি হওয়া রাসূল (সা.)-এর চাচা হজরত হামজা (রা.)-কে, যিনি সাধারণ লোকদেও চেয়ে একটু লম্বা ছিলেন বলে অন্য কারো জামা তার মাপসই ও সুসংগত না হওয়ায় আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের জামাটি তাঁকে পরানো হয়েছিল। রাসূল (সা.) বস্তুত এ উপকারের প্রতিদান দিলেন। তৃতীয় কারণটি (প্রকৃতপক্ষে এটিই মূল কারণ) রাসূল (সা.) স্বয়ং একটি হাদিসে বলেছেন, আমি কাজটি এ কারণে করেছিযে এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার গোত্রের হাজার হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করবে। পরে দেখা গেছে, রাসূল (সা.)-এর এরূপ অসাধারণ উদারতায় মুগ্ধ-অভিভূত হয়ে খাযরাজ গোত্রের এক হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করে।-বোখারি শরিফের টীকা ভাষ্য, খন্ড-২, পৃ. ৬৭৪ ও মা’আরেফুল কোরআন, খন্ড-৪, পৃ.২০৬
রাসূল সা. এর রহমতের ছায়া দোস্ত-দুশমন, কাফের-মুসলিম, শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ এমনকি হিংস্র জীব জন্তুর উপর পর্যন্ত সমভাবে বিস্তৃত ছিল। এক কথায় দুনিয়ার সব কিছুই তাঁর সে রহমতের ছায়ায় অংশীদার ছিল। এক ব্যক্তি রাসূল সা. এর নিকট এসে কোন এক দুশমনের প্রতি অভিশাপ করার আবেদন জানালে ক্রোধান্বিত হয়ে ইরশাদ করলেন “আমি কারোর প্রতি অভিশাপ করার জন্য আগমন করিনি, আমাকে দুনিয়ার সবার প্রতি রহমত স্বরূপ পাঠানো হয়েছে”।
রাসূল সা. দুনিয়াবাসীর উদ্দেশে বলেছেন- “তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ পোষণ করো না। একের দিক থেকে অন্যে মুখ ফিরিয়ে রেখো না আল্লাহর সমস্ত বান্দা পরস্পর ভাই হয়ে যাও।”
অপর এক হাদিসে আছে “তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ করো, অন্য সব মানুষের জন্যও তাই পছন্দ করো। তাহলে পরিপূর্ণ মুসলমান হতে পারবে। তিরমিযি]
রাসূল সা.যে আমাদের পথ প্রদর্শক এবং পথের আলোক স্বরূপ,সে সম্পর্কে আল্লাহ  রাব্বুল আলামিন আল কুরআনে ঘোষণা করেছেন-
“হে রাসূল সা. নিশ্চয়ই তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীস্বরূপ, সংবাদাতা স্বরূপ, সতর্ককারী স্বরূপ ও আল্লাহর দিকে আকর্ষণকারী স্বরূপ এবং আলোক বিচ্ছুরণকারী মশাল স্বরূপ।” (সুরা আল আহযাব : ৪৫-৪৬)
উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা.কে রাসূল সা. এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবহ শব্দে বলেন: “তার চরিত্র ছিল আল কুরআন। অর্থাৎ কুরআন মজীদে যে সব উত্তম চরিত্র ও মহান নৈতিকতার উল্লেখ রয়েছে সে সবই তাঁর মাঝে বিদ্যমান ছিল। কুরআনে বর্ণিত চরিত্র অপেক্ষা মহত্তর চরিত্র আর কী হতে পারে? তিনি ছিলেন কুরআনি চরিত্রমালার জীবন্ত প্রতীক।
রাসূল সা. পরিপক্ব ঈমান বিশিষ্ট মু’মিনের এক মাপকাঠি নির্ণয় করতে গিয়ে বলেন: “মুমিনের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ সেই ব্যক্তি যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে চরিত্রবান।” (তিরমিযি)
তিনি আরও বলেন : “ তোমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি সেই যে চরিত্রে সবার সেরা।” (বুখারি ও মুসলিম)
হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত আছে, একবার কোন এক ব্যক্তি তাঁর নিকট হুযুর সা. এর বিস্ময়কর ঘটনা শুনতে চাইলে তিনি বললেন হুযুর সা. এর এমন কোন কাজ আছে কি, যা বিস্ময়ের উদ্রেক করে না? অতঃপর বললেন, একরাতে হুযুর সা. আমার বিছানায় শয়ন করার ক্ষণিক পরেই বললেন আমাকে যেতে দাও। আমি আল্লাহর ইবাদাত করব। এ কথা বলেই তিনি উঠে অজু করলেন। অতঃপর নামাযে দাঁড়ালেন এবং কান্না আরম্ভ করলেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর বক্ষদেশ অশ্রুতে ভেসে গেল। অতঃপর রুকুতে ও সিজদায় অনুরূপ কাঁদলেন। এভাবে ভোর হয়ে গেল। বিলাল রা. এসে নামাযের জন্য ডাক দিলেন। আমি বললাম ”ইয়া রাসূল সা.! আল্লাহ  আপনার অগ্রপশ্চাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা কওে দেয়ার পরও আপনি কেন এত কান্নাকাটি করেন? তিনি ইরশাদ করলেন আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হিসাবে পরিচয় দিব না?”
আমাদের প্রিয় নবী সা. এতো ইবাদাতে মশগুল থাকার পরও তিনি কিন্তু দুনিয়াদারী ছেড়ে দেননি। তিনি বললেন: “লা রাহবানিয়াতা ফিল ইসলাম”। অর্থাৎ, ‘ইসলামে বৈরাগ্য নেই।”874347637
শেষ কথা
মানবতার নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর পরিপূর্ণ জীবন ছিল মানুষের জন্য গ্রহণীয় আদর্শ, তিনি একজন মানুষ হয়েই মানবতার আদর্শরূপে প্রেরিত হয়েছেন, তাই আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে “আল্লাহর সবচাইতে বড় অনুগ্রহ তোমাদের প্রতি এই যে, তোমাদের মধ্য হতেই একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, তিনি তোমাদেরকে আল্লাহর আয়াত শিক্ষা দিয়েছেন, পবিত্র, বিশুদ্ধ, সুসভ্য ও সংস্কৃতিবান করেছেন, আল্লাহর কিতাব তোমাদেরকে হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছেন, আর তোমাদেরকে শিখিয়েছেন বিজ্ঞান ও কৌশল, যদিও এর আগে তোমরা ছিলে অজ্ঞ। (আলে ইমরান)
রাসুলে পাক সা. এর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন অনুপম আদর্শ। একজন শিশু হিসেবে, এতিম হিসেবে, যুবক হিসেবে, ব্যবসায়ী হিসেবে, সমাজ সংস্কারক হিসেবে, স্বামী হিসবে, ধর্ম প্রচারক, কৃষিজীবী, শ্রমিক, যোদ্ধা, রাষ্ট্রনায়ক, আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম অনুগত বান্দা, পিতা, ভাই, প্রতিবেশী, অমুসলিমদের সাথে সৎভাব, তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় কাজের প্রতি কোন প্রকার বাধা সৃষ্টি না করার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদানকারী হিসেবে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।
রাসূল সা. পৃথিবীবাসীর জন্য ছিলেন একমাত্র অনুকরণযোগ্য মডেল। রাসূল সা. শুধুমাত্র আরবের নন, এশিয়ার নন, তিনি সমগ্র  বিশ্বের। শুধু মুসলমানের নন, মানুষের নন, তিনি সমগ্র  সৃষ্টির। আর এ জন্যই তার আগমনবার্তা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায়। তিনি শুধু আদর্শ মানবনন, আদর্শ পয়গাম্বর নন, তিনি হলেন আদর্শ সৃষ্টি। তিনি শুুধ মুসলমানদের পয়গাম্বর নন, রাহমাতুল্লিল আলামিন। অথার্ৎ সমগ্র সৃষ্টির জন্য পরিপূর্ণ কল্যাণ ও আশীর্বাদ। মুসলমানরা যেমন তাকে আপন ভাবতে পারে, হিন্দু-ফার্সি-ইহুদি- খ্রিস্টানও ঠিক তেমনি তাকে আপন ভাবতে পারে। সবার জন্যই তিনি পথপ্রদর্শক।  আমাদের সবাইকে রাসূলের সেই আদর্শ বাস্তবায়ন করার তৌফিক দিন আমিন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s